
গোটা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে লন্ডনের পর এটিই ছিল দ্বিতীয় ব্যস্ততম বন্দর
ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এখানে বন্দর গড়ে তুলবার আগে জায়গটাকে স্থানীয় তাঁতি এবং কারিগরেরা নদীবন্দর হিসেবে ব্যবহার করত। বাংলায় তখন একে একে ইউরোপীয় বণিকেরা পা রাখছে। তাদের উদ্দেশ্য সাম্রাজ্য বিস্তার। পশ্চিম ভারতে মুঘল আমলের গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সুরাটের পতন ঘটেছে ইতিমধ্যেই। ভাগীরথী এবং সরস্বতী নদীর সংগমস্থলে পর্তুগিজরা ব্যবহার করত সাতগাঁও বন্দরটি। ধীরে ধীরে ভাগীরথীর নাব্যতা কমতে থাকে। ১৬ শতকের শেষে পর্তুগিজ জাহাজগুলো সমুদ্র থেকে কলকাতার কাছাকাছি বেতর নামক জায়গায় এসে থেমে যেত। সাতগাঁও থেকে ছোটো ছোটো নৌকোয় পণ্য বোঝাই করে বেতরে এনে সেগুলোকে বড়ো জাহাজে তোলা হত। ১৫৭০ সালে পর্তুগিজরা সাতগাঁও থেকে মোহনার দিকে এগিয়ে তাদের বাণিজ্যকুঠি গড়ে তোলে হুগলিতে। ১৬৩২ সালে মুঘলরা হুগলি থেকে পর্তুগিজদের বিতাড়িত করে। যদিও পর্তুগিজরা আবার হুগলিতে ফিরে এসেছিল, কিন্তু ততদিনে বাংলায় তাদের শক্তি কমতে শুরু করেছে। ওদিকে তখন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সওদাগরি জমিয়ে ফেলছে বাংলার জমিতে।

ইংরেজদের কুঠি ছিল মোহনার আরেকটু কাছে। ১৭০২ সালে তারা ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ গড়ে তোলে গোবিন্দপুরে। ফরাসি বাহিনীর সঙ্গে তখন ব্রিটিশ কোম্পানির সংঘর্ষ লেগে থাকত। ইংরেজরা জানত, গোবিন্দপুর থেকে গার্ডেন রিচ পর্যন্ত অঞ্চলে হুগলি নদীর পূর্ব তীর বরাবর জলরাশি এতটা গভীর যে খুব সহজেই সমুদ্রগামী বড়ো জাহাজ এখানে প্রবেশ করতে পারে।
আরও পড়ুন
বঙ্গদর্শন পুজোসংখ্যা ১৪২৬
বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশের সমুদ্রবাণিজ্যের ধরনও তখন পাল্টাচ্ছিল। একদিকে ইউরোপের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে, ইংরেজরা সমুদ্রপথে চিনের সঙ্গেও বাণিজ্য করত। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে আধুনিক কলকাতা বন্দর। বাংলা থেকে যে সমস্ত পণ্য জাহাজে করে সমুদ্রে পাড়ি দিত, তার পরিমাণ ছিল মাদ্রাজ এবং বোম্বের থেকে অনেক বেশি। ইতিমধ্যে বাংলার মসনদও চলে গিয়েছিল ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দখলে। কলকাতা বন্দরের গুরুত্ব তাই ক্রমশ বাড়তে থাকে। তখনও কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো বন্দর কর্তৃপক্ষ ছিল না। ১৮৭০ সালের অক্টোবর মাসে তৈরি হয় কলকাতা বন্দর কমিশন। ওই বছরটিকেই কলকাতা বন্দরের জন্মসাল ধরা হয়।

এরপর কলকাতা বন্দর ক্রমেই উন্নত হতে থাকে। ১৮৮৬ সালে বজবজ পেট্রোলিয়াম ঘাট চালু হয়। ১৮৯২ সালে গড়ে ওঠে খিদিরপুর ডক। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে এই বন্দরের আমদানি-রপ্তানি দ্রুত গতিতে বেড়ে যায়। চট্টগ্রামে বন্দর তৈরি হলেও সেটি কলকাতা বন্দরের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারেনি। গার্ডেন রিচ-এর কিং জর্জ ডক চালু হয়েছিল ১৯২৯ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কলকাতা বন্দরের ওপর বোমাবর্ষণ করেছিল জাপানি সেনা। নানা বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও ব্রিটিশ শাসনে এই বন্দর হয়ে উঠেছিল পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার। ভারত স্বাধীন হওয়ার পরও কলকাতা বন্দরের দায়িত্বে ছিল পুরোনো বন্দর কর্তৃপক্ষ। ১৯৬৩ সালের প্রধান বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন কার্যকর হলে ১৯৭৫ সালে কলকাতা বন্দরের দায়িত্বভার গ্রহণ করে এখনকার পোর্ট ট্রাস্ট।
ছবিসূত্র- কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট
