দেশে এই প্রথম, কলকাতা মেট্রোয় আসছে অত্যাধুনিক থার্ড রেল

দেশের প্রথম মেট্রো শুরু হয়েছিল কলকাতাতেই

লকাতা এবার ঢুকে পড়তে চলেছে মেট্রো রেলওয়ে-র এক নতুন মর্যাদাপূর্ণ তালিকায়, যে তালিকায় রয়েছে বিশ্বের পাঁচটি বিখ্যাত শহর- বার্লিন, লন্ডন, মিউনিখ, মস্কো এবং ইস্তাম্বুল। ভারতের প্রথম শহর হিসাবে কলকাতাতেই মেট্রো রেলের যাত্রা শুরু হয়েছিল, যার পরে দেশের অন্যান্য শহরেও মেট্রো রেল চালু হয়। এভাবেই কলকাতার নাম লেখা হয়ে গিয়েছিল ভারতের পরিবহণ ব্যবস্থার ইতিহাসে।

সেই ইতিহাসে কলকাতা আবার নতুন অধ্যায় যোগ করতে চলেছে। গঙ্গার তলা দিয়ে মেট্রোরেলের পরীক্ষামূলক যাত্রা ইতিমধ্যেই হয়েছে। এবার কলকাতার মেট্রো (Kolkata Metro) পেতে চলেছে অত্যাধুনিক থার্ড রেল লাইন। স্টিলের থার্ড রেল লাইনগুলিকে প্রতিস্থাপন করা হবে আধুনিক ও উন্নত মানের অ্যালুমুনিয়ামের থার্ড রেল দিয়ে। এই প্রতিস্থাপনই কলকাতাকে স্থান দেবে পূর্বোল্লিখিত তালিকায়। একটি সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “ইতিমধ্যেই কলকাতা মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের তরফে এই প্রকল্পের জন্য টেন্ডার ডাকা হয়েছে। কাজটি তিন দফায় সম্পন্ন করা হবে। প্রথম দফায় দমদম থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত, দ্বিতীয় দফায় শ্যামবাজার থেকে সেন্ট্রাল এবং যতীন দাস পার্ক স্টেশন থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত এই প্রতিস্থাপনের কাজ চলবে। শেষ দফায় কাজ হবে মহানায়ক উত্তমকুমার স্টেশন (টালিগঞ্জ) থেকে কবি সুভাষ স্টেশন (নিউ গড়িয়া) পর্যন্ত। এভাবে তিন দফায় ৩৫ কিমি দীর্ঘ মেইন লাইনের স্টিলের থার্ড রেলের প্রতিস্থাপন করা হবে।

কিন্তু থার্ড রেল মেট্রো চলাচলের জন্য কেন এতটা গুরুত্বপূর্ণ? ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দীপঙ্কর সাহা জানালেন, “থার্ড রেল হলো মেট্রোরেলের লাইফলাইন। কারণ থার্ড রেল ট্রেন, ট্রাম প্রভৃতিকে বৈদ্যুতিক শক্তি সরবরাহ করে। এটি একটি অতিরিক্ত লাইন, যা জমির কাছাকাছি অংশে, দুটো মেইন লাইনের পাশে বা মাঝখানে স্থাপন করা থাকে। এই থার্ড রেল ছাড়া মেট্রোরেল প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক শক্তি পাবে না।" বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যালুমুনিয়াম থার্ড রেল বৈদ্যুতিক ক্ষয় কম করে এবং লাইনের ভোল্টেজ লেভেলকে বাড়িয়ে দেয়। ফলে এর বৈদ্যুতিক প্রতিরোধ ক্ষমতা স্টিলের থার্ড রেলের থেকে অনেক বেশি। দেখা গেছে, ১০ কিমি করিডরে অ্যালুমুনিয়ামের থার্ড রেল ব্যবহার করলে ১টি কম ট্র্যাকশন সাবস্টেশন দরকার পড়ে। সেই হিসাবে, ৩৫ কিমি মেট্রো করিডরে অ্যালুমুনিয়ামের থার্ড রেল ব্যবহার করলে, প্রায় ২১০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে। ভোল্টেজ ড্রপও এর ফলে কমবে। কাজেই মেট্রোরেল হয়ে উঠবে আরও দ্রুতগামী এবং তার জন্য বিশেষ পরিকাঠামোরও দরকার পড়বে না।

এই প্রকল্পের খরচ এবং এর ফলে বাজেট বরাদ্দ কতটা বাড়াতে হবে, সে সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে, আধিকারিকেরা জানান, অ্যালুমুনিয়ামের থার্ড রেলের রক্ষণাবেক্ষণের খরচ অপেক্ষাকৃত কম। একে পাঁচ বছর পর পর সারাতে বা বদলাতে হয় না। ধুলোবালির কারণে জং ধরার সম্ভাবনাও কম থাকে। ট্রেনও অনেক বেশি দ্রুতগতিতে চলতে পারবে, ফলে যাত্রার সময় কমবে এবং সময়নিষ্ঠ যাত্রা সম্ভব হবে। এই উন্নত প্রযুক্তির কারণে কলকাতা মেট্রোর স্থায়িত্ব অনিবার্য ভাবেই বাড়বে। অ্যালুমুনিয়ামের থার্ড রেলের ফলে শক্তির সাশ্রয় হবে, ফলে কমবে কার্বন নির্গমনের পরিমাণ। এর ফলে সারাবছরে মোট ৬.৭ মিলিয়ন পরিমাণ শক্তির সাশ্রয় হতে পারে।

কলকাতা মেট্রোর প্রথম পরিকল্পনা হয়েছিল ১৯২০ সালে। তবে কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৭০ সালে। মাটির তলা দিয়ে কলকাতা মেট্রোর যাত্রা প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৮৪ সালে, ভবানীপুর (বর্তমানে নেতাজি ভবন) থেকে এসপ্ল্যানেড পর্যন্ত। দ্বিতীয় দফায়, ২০২০ সালে শুরু হয়েছিল মেট্রোর ইস্ট ওয়েস্ট করিডর, যা সল্টলেক সেক্টর ৫ থেকে ফুলবাগান পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০২২ সালে শুরু হয়েছে তৃতীয় অর্থাৎ এসপ্ল্যানেড জোকা মেট্রো করিডর (বর্তমানে যা তারাতলা পর্যন্ত চলছে)। কলকাতা মেট্রো হলো দেশের পঞ্চম বৃহত্তম মেট্রোরেল নেটওয়ার্ক- দিল্লি মেট্রো, নাম্মা মেট্রো (বেঙ্গালুরু), হায়দ্রাবাদ মেট্রো এবং চেন্নাই মেট্রোর পরেই।

ব্রিটিশ শাসনের সময়, ১৯১৯ সালে সিমলায় অনুষ্ঠিত ইম্পেরিয়াল লেজিসলেটিভ কাউন্সিলের (Imperial Legislative Council) একটি সেশনে, ডব্লুউ.ই. ক্রাম (W.E. Crum) একটি কমিটি তৈরি করেছিলেন। তারা তৎকালীন কলকাতায় মেট্রো রেল চালু করার প্রস্তাব দেন। ঠিক হয়েছিল, মেট্রো রেলের লাইনটি যাবে পূর্বে হাওড়ার বাগমারি থেকে পশ্চিমে সালকিয়ার বেনারস রোড পর্যন্ত, আর লাইনটি যাবে হুগলি নদীর নিচে একটি টানেলের ভিতর দিয়ে। প্রকল্পটির আনুমানিক নির্মাণ খরচ ধরা হয়েছিল ৩,৫২৬,১৫৪ ইউরো বা বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী ৩৬.৪ কোটি ভারতীয় টাকা (যা ২০২৩ সালে ৭০ বিলিয়ন ভারতীয় টাকা বা ৮৮০ মিলিয়ন ইউএস ডলারের সমতুল্য)। কাজ সম্পন্ন করার মেয়াদ ধরা হয়েছিল ১৯২৫-১৯২৬ সাল। প্রস্তাবিত মেট্রো লাইনের দৈর্ঘ্য ছিল ১০.৪ কিমি, যা বর্তমান ইস্ট-ওয়েস্ট করিডরের থেকে ৪ কিমি কম। একটি সম্পূর্ণ যাত্রার জন্য টিকিটের দাম ধার্য করা হয়েছিল ৩ আনা (০.১৮৭৫ টাকা)। ক্রাম সেইসময় একটি নর্থ-সাউথ মেট্রো করিডরেরও প্রস্তাব করেছিলেন। ১৯২১ সালে হার্লে ডালরাইম্পল-হে (Harley Dalrymple-Hay), কলকাতায় একটি ইস্ট-ওয়েস্ট টিউব রেলওয়ের প্রস্তাব করেন। এই প্রতিটি রিপোর্ট পাওয়া যাবে তাঁর ১৯২১ সালের বই ক্যালকাটা টিউব রেলওয়ে-তে। কিন্তু বাজেটের অভাবে, ১৯২৩ সালে এই প্রস্তাবটি থেকে পিছিয়ে আসা হয়।

এরপর বাংলার পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় ১৯৪৯ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে কলকাতার মেট্রো রেলের পরিকল্পনাকে পুনর্জাগরিত করেন। ফরাসি বিশেষজ্ঞ দলকে দিয়ে জরিপ করানো হয়, কিন্তু কাজের কাজ হয়নি। কলকাতার রাস্তাঘাটের অপ্রতুলতা এবং যানজটের কারণে এই প্রকল্পে বাধা সৃষ্টি হয়েছিল (কলকাতার জমি এলাকার ৪.২ শতাংশ হলো রাস্তা, যেখানে দিল্লিতে ২৫ শতাংশ এবং অন্যান্য শহরে ৩০ শতাংশ)। বিকল্প ব্যবস্থা খোঁজার জন্য ১৯৬৯ সালে মেট্রোপলিটান ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম (MTP) প্রতিষ্ঠিত হয়। সোভিয়েতের বিশেষজ্ঞ দল, লেনমেট্রোপ্রোকেট এবং ইস্ট জার্মানির ইঞ্জিনিয়ারদের সহায়তায় এই সংস্থা একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করে। যে মাস্টার প্ল্যানে কলকাতা শহরে, ১৯৭১ সালে ৫টি মেট্রো লাইন চালু করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়, যার মোট দৈর্ঘ্য ৯৭.৫ কিমি (৬০.৬ মাইল)। তিনটি করিডরকে বেছে নেওয়া হয়- দমদম থেকে টালিগঞ্জ, বিধাননগর থেকে রামরাজাতলা, দক্ষিণেশ্বর থেকে ঠাকুরপুকুর।

উত্তরের করিডর অর্থাৎ দমদম থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত ১৬.৪৫ কিমি (১০.২২ মাইল) এলাকাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই প্রকল্পটিকে ছাড়পত্র দেওয়া হয় ১৯৭২ সালের ১ জুন। ১৯৯১ সালের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছিল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে এই মেট্রো করিডর আর প্রস্তাব বা স্বপ্ন নয়, বরং হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন বাস্তবের অংশ।

Post Tags
Developed by DXDasia