
সলিলদা! ডাকটা শুনেই অবাক হতে হয়েছিল। তার কারণ ডাকের মালয়ালি টান। কেরালার ভূমিপুত্র মুগ্ধ বাংলার সলিলে।
সলিল চৌধুরী। ২০২৫-এ শতক ছুঁলেন। ২০২৫-এ দাঁড়িয়ে আজও তিনি কেরালার তরুণ প্রজন্মের সলিলদা। বিস্মরণই যখন এই সময়ের অভ্যাস তখন কোন ম্যাজিকে তিনি এত সজীব? জবাব এলো- সলিল চৌধুরী বদলে দিয়েছিলেন মালায়ালাম ছবির গানের ধারা। উত্তরদাতা মধ্য ত্রিশের ভি এস শ্যাম। কোচির বাসিন্দা, পেশায় আইটি প্রফেশনাল, এবং মহাকাশচৰ্চার পরিচিত মুখ। সলিল চৌধুরী তাঁর কাছে সলিলদা। এই ডাক শৈশব কৈশোর পেরিয়ে হয়ে উঠেছে জীবনের সঙ্গী।
সলিল চৌধুরী আজও কেরালা ভূমির কালচারাল আইকন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দক্ষিণী রাজ্যটির আবেগ হয়ে আছেন ২৪ পরগনার মানুষটি। তাঁদের কাছে টাইমলেস তাঁর গান। একই সঙ্গে ভীষণ ভাবে আন্তর্জাতিক। সেখানে রয়েছে তাঁর একাধিক ফ্যানক্লাব।
কেরালার কালচারাল আইকন
সলিল চৌধুরী আজও কেরালা ভূমির কালচারাল আইকন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে দক্ষিণী রাজ্যটির আবেগ হয়ে আছেন ২৪ পরগনার মানুষটি। তাঁদের কাছে টাইমলেস তাঁর গান। একই সঙ্গে ভীষণ ভাবে আন্তর্জাতিক। সেখানে রয়েছে তাঁর একাধিক ফ্যানক্লাব। মাঠভরা ধান, গাঁয়ের বধূর সোনালি ফসলের উচ্ছ্বাস আর সুদিনের গান শোনাতে শোনাতে সলিল মিলিয়েছেন বাংলা-কেরালাকে।
ওনাম উৎসবের প্লে লিস্টে বাজে ‘পুভালি পুভালি পন্নমারি’। সলিলের আগমনী গান। ঠিক যেমন দুর্গাপুজোর গন্ধ আসে সলিলের গানে। আয়রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে… যে গান বলে ময়না পাড়ার মেয়ের কথা। পুভালি পুভালি-র গানের দৃশ্য মনে করিয়ে দেয় কৃষক আন্দোলনের যোদ্ধা সলিলকে।
আন্দোলনের সলিল
চল্লিশের দশকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় অপ্রতিরোধ্য টানে জড়িয়ে পড়েন প্রগতিশীল গণআন্দোলনে। ১৯৪৫-এ যুক্ত হন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে। তিনি ছিলেন মূলত ২৪ পরগনা জেলার মানুষ, কৃষক আন্দোলন থেকেই তাঁর সাংস্কৃতিক আন্দোলনে প্রবেশ। কলকাতা ও ২৪ পরগনা শাখায় কাজ করতে শুরু করলেন। গ্রামে গঞ্জে মানুষের দুঃখ কষ্ট বেদনার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন সলিল চৌধুরী। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভাব, যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা মিশে গিয়েছিল। প্রথমদিকে বাঁশি বাজাতেন। ১৯৪৬-এ তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিতে লেখেন ‘হেই সামালো’। সোনারপুরে বন্যা দুর্গতদের জন্য লিখেছিলেন ‘দেশ ভেসেছে বানের জলে’। ওই একই বছরে ২৯ জুলাই সারা ভারত ধর্মঘটের বিজয় ঘোষণায় তাঁর কলমে জন্ম নিল ‘ঢেউ উঠেছে, কারা টুটেছে’।
গান, কবিতা, গল্প
রেকর্ড-এ তাঁর প্রথম প্রকাশিত গান ‘নন্দিত নন্দিত দেশ আমার’। জনপ্রিয় হয়েছিল নবারুণ রাগে।
চল্লিশের দশকের কম্পোজিশনগুলোয় আইপিটিএ-এর সভার প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায়। অসম বাংলার কমিউনিস্ট কর্মীদের কাছে হয়ে ওঠেন জনপ্রিয় নাম। এই সময় কবিতা, গানের পাশাপাশি বেশ কিছু ছোটোগল্প লিখেছিলেন। ‘রিকশাওয়ালা’ গল্প আর ‘এই গাঁয়ের বধূ’ কবিতা। ভূমিহীন কৃষকের রিকশাওয়ালা হওয়ার কাহিনি পরে ‘দো-বিঘা জমিন’ সিনেমায় বদলে যায়। সলিল চৌধুরীর কথায়, দেশের প্রথম কৃষিজীবন এবং দিনমজুরের জীবনের ওপর ছবি। সেই ছবি দুনিয়া জোড়া খ্যাতি পেয়েছিল।
১৯৪৯-এ সদ্য স্বাধীন দেশে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে গান হয়ে ওঠে ‘কোনও এক গাঁয়ের বধূ’। যে গানের বাণিজ্যিক সাফল্যই বাংলা আধুনিক গানের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল সেই সময়। গ্রামোফোন কোম্পানি আর বছর কুড়ির সলিল চৌধুরী- দুজনেই সফল। রবীন্দ্রনাথের ‘কৃষ্ণকলি’কে দুর্ভিক্ষের প্রেক্ষাপটে রূপান্তরিত করেছিলেন ‘সেই মেয়ে’ গানে। বিচারপতি, রানার, এমন আরও কত গান…
বঙ্গ-দ্রাবিড়-মারাঠা ভেসে গিয়েছিল সলিলের সুরের স্রোতে। কিন্তু চিরকাল তাঁর গানের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তাদের সুখ, দুঃখ, ভালবাসা, শ্রম, ঘাম আর রক্তে গান বেঁধেছিলেন। সেই কাজে রক্তাক্ত হয়েছেন, ছুরি খেয়েছেন কিন্তু গান আর এক নদী থেকে আর নদীতে বয়ে যাওয়া ছাড়া আর বোধহয় কোনও কিছুকেই বিশেষ পাত্তা দেননি।
নেপথ্যে বাবা
কিন্তু এই সবের নেপথ্যে জড়িয়ে তাঁর বাবা। ডাঃ জ্ঞানেন্দ্র চৌধুরী। অসমের লতা বাড়ি চা বাগানের ডাকাবুকো ডাক্তার। পাশ্চাত্য সংগীতের তুমুল ভক্ত। দুর্গাপুজোয় অসমের চা বাগানের মজদুরদের নিয়ে নাটক করতেন। বাবার বিদেশি রেকর্ড-এর দুর্লভ সংগ্রহ, বাখ, মোৎজার্ট, বেটোফেনে বাড়ির গানের আবহ কান তৈরি করে দিয়েছিল সলিলের। বাবার সহযোগী হয়েই তাঁর প্রথম সংগীত পরিচালনা। অসমে ছুটির সন্ধেগুলোয় ডাক্তারবাবুর বাড়িতে বসত গানের আসর। সেই আসরের প্রধান উদ্যোক্তা ছিলেন তাঁর সিনিয়র কম্পাউন্ডার সুকুমারবাবু। সেখানে বাংলা সিনেমার গান, রেকর্ড-এর মৃণালকান্তি ঘোষ, কৃষ্ণচন্দ্র দে, কমলা ঝরিয়া ইত্যাদির গান হুবহু নকল করে হারমোনিয়ামে বাজিয়ে গাইতেন সলিল চৌধুরী। গণনাট্য আন্দোলনে শামিল হওয়ার এবং সংগীতকার হওয়ার বীজ তাঁর বাবাই তাঁর মধ্যে অজান্তে বপন করেছিলেন।
সুরের বিশ্ববিদ্যালয়
দেশের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে যে বিচিত্র সংস্কৃতির ভাণ্ডার যুগ যুগ ধরে জিইয়ে রেখেছে মানুষ তার খোঁজ পেয়েছিলেন তিনি। কত সুর, কত ছন্দ, কত রকম প্রকাশভঙ্গি এগুলোই ছিল তাঁর সংগীতের বিশ্ববিদ্যালয়। বঙ্গ-দ্রাবিড়-মারাঠা ভেসে গিয়েছিল সলিলের সুরের স্রোতে। কিন্তু চিরকাল তাঁর গানের কেন্দ্রে ছিল মানুষ। তাদের সুখ, দুঃখ, ভালবাসা, শ্রম, ঘাম আর রক্তে গান বেঁধেছিলেন। সেই কাজে রক্তাক্ত হয়েছেন, ছুরি খেয়েছেন কিন্তু গান আর এক নদী থেকে আর নদীতে বয়ে যাওয়া ছাড়া আর বোধহয় কোনও কিছুকেই বিশেষ পাত্তা দেননি। অপরিসীম যন্ত্রণা পেয়েছেন ছোটো থেকে বড়ো হওয়ার পথে দেশভাগ, জাতিদাঙ্গা, যুদ্ধ, মন্বন্তর কী নেই সেখানে! তাই গান, কবিতা, লেখনী, সুরের মানে তাঁর কাছে ছিল আলাদা। যা কখনোই শুধুমাত্র বিনোদন নয়। ভারতের ১৪টি ভাষায় গান বেঁধেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত গণসংগীতগুলি ‘ঘুম ভাঙার গান’ নামে সংকলিত হয়েছিল আশির দশকে। ঘুম ভাঙার গান-এর রেকর্ড কভারে সলিল চৌধুরী লিখেছিলেন, “বিভিন্ন সামাজিক অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পটভূমিতে রচিত হলেও এই গানগুলির মূল উৎস এবং প্রেরণা হল সব রকম দাসত্ব, বন্ধন, পীড়ন এবং শোষণ থেকে মুক্তির জন্য মানুষের সেই চিরন্তন প্রয়াস যা যুগযুগান্ত ধরে তাকে বুলেট ও ফাঁসির মুখোমুখি হতে সাহস জুগিয়েছে…”
চিরন্তন সলিল
সলিল চৌধুরী-সলিল চৌধুরী-ই। তাঁর গান তাঁর পরিচয়, তাই তাঁর নামের আগে সব বিশেষণ ভার মনে হয়। তিনি লিখেছেন, ‘এই সারাটা দেশ জুড়ে আমার ঘরবাড়ি…’। সেই ঘরবাড়িতে আজও তাঁর-ই বসত। সময় বদলালেও শ্রোতাদের হৃদয় দফতর পালটাতে পারে না।

