ব্যক্তিগত কথালাপ – লিখছেন স্বাগতা দাশগুপ্ত
১৬ মার্চ, ২০২৪ পঁচাত্তর পূর্ণ করলেন জীবন্ত কিংবদন্তি কবীর সুমন (75 Years of Kabir Suman)। ২৩ এপ্রিল, ১৯৯২ সালে প্রকাশ পায় তাঁর প্রথম আধুনিক গানের অ্যালবাম ‘তোমাকে চাই’। এই অ্যালবাম প্রকাশের কিছুদিনের মধ্যে আমার ছোটোকাকু বাড়িতে নিয়ে আসেন অরিজিনাল ক্যাসেট থেকে রেকর্ড করা একটা ক্যাসেট। বাসায়, বলা ভালো আমাদের ভাড়াবাড়িতে। তখন আমি ক্লাস টু-তে পড়ি। স্কুলের আরও অনেকটা উঁচু ক্লাসে উঠে আমার কবীর সুমন শোনা শুরু হয়। ক্লাস ইলেভেনে যখন পড়ি তখন প্রকাশ পায় ‘আদাব’। আমি আর আমার এক বন্ধু সপ্তাহে তিন থেকে চারদিন সন্ধেবেলা একসাথে সুমন শুনতাম। ওঁর, নয়তো আমার বাড়িতে। বেশিরভাগই ওঁর। কোন গানের পরে কোনটা শুনব প্রতিবার আমরা প্লে-লিস্ট তৈরি করতাম। সেই অনুযায়ী শোনা শুরু হত। সাথে চলত খুটখাট মন্তব্য। ‘উফ, লোকটা এরম কেন?’ কোনো একটা গানে একটা বিশেষ জায়গা যখন আসবে আসবে করছে—‘এই রে! এইবার বাণটা মারবে!’ যেসব গান আমাদের কাছে সবচেয়ে অমোঘ এবং মোক্ষম সেগুলো সাধারণত থাকত প্লে-লিস্টের শেষের দিকে। ঘড়ির কাঁটা দশটার দিকে এগোতে থাকলে কিছু গান ছাঁটাই করতে হত। বাড়ি ফেরার তাড়া। তখন কোনটা কোনটা বাদ দেব তা নিয়ে আমাদের মধ্যে রফা চলত। ‘ক্যাকটাস’ বাদ দেওয়া অধর্ম! আর ‘নিষিদ্ধ ইস্তেহার’? এরকম চলেছে স্কুল শেষ করে কলেজ, ইউনিভার্সিটি পার করে চাকরির দোরগোড়া পর্যন্ত। প্রায় সাত বছর। আমার সেই বন্ধুর সাথে ঘটনাচক্রে আজ আর কোনো যোগাযোগ নেই। সেই সময়টা আজ যে খুব মনে পড়ে তা-ও নয়। তবে আমার বন্ধুর করা একটা মজার মন্তব্য মনে পড়ছে। ‘পাগলা সানাই’ শুনতে শুনতে ‘স্বপ্নে এখনও যৌথ খামার’ এলে, ‘দেখ, লোকটাকে এই লাইনটা লিখতেই হবে!’

কবীর সুমনের সঙ্গে স্বাগতা দাশগুপ্ত
জীবন পালটাতে থাকে। আসে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা। চাকরিসূত্রে আমি ব্যাঙ্গালোরবাসী হয়েছিলাম ২০১১ সাল থেকে। ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর কলকাতায় কবীরের অনুষ্ঠান ছিল। কলকাতার বন্ধুদের থেকে খবর পাচ্ছিলাম সেই অনুষ্ঠান কেমন হয়েছে। আফশোস আর মনখারাপ হচ্ছিল। কী মরতে ব্যাঙ্গালোরে চাকরি করছি! রাত্রিবেলা সাহস করে একটা চিঠি লিখতে বসি। কবীর সুমনের অনুষ্ঠান থাকলে সেদিন কলকাতার চেহারাটা কেমন হয় আর আমি সেটা কীভাবে মিস করছি এই মর্মে। সম্ভবত পরেরদিন, তেরো সালের পয়লা তারিখ সেটা কবীরের ঠিকানায় পোস্ট করি। ১৬ জানুয়ারি সন্ধেবেলা হেডফোনে ওঁর গান শুনতে শুনতে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছি। বাস থেকে নেমে বাসার দিকে হাঁটা লাগিয়েছি। এমন সময় ফোনটা এলো। ‘আমি কি শ্রীমতি স্বাগতা দাশগুপ্ত-র সাথে কথা বলছি? আমার নাম কবীর সুমন।’ হয়ে গেল! আমি এমনিতেই কম কথা বলি। তার মধ্যে সেদিন তো কথা বলার মতো কোনো অবস্থাতেই নেই। একবার বললাম, ‘আমি ভাবতেই পারছি না আপনি ফোন করেছেন।’ যাইহোক, উনিই কথা বললেন। আমি শেষের দিকে বললাম, ‘আপনি আমায় অমুক অমুক অমুক অমুক… গান শোনাবেন?’
কেন উনি গাইলে গানটাই আলাদা হয়ে যায় তার একটা অন্যতম কারণ গানটার লয় আর ছন্দ। আমার মনে হয় প্রত্যেকটা গানের একটা উপযুক্ত লয় আছে, আর নিজস্ব ছন্দ। যে ছন্দে-লয়ে গাইলে গানটার চলন সবচাইতে সুন্দর হয়।
উত্তরে কবীর (প্রায় বিধান দেওয়ার মতো করে) বললেন, ‘যা জানি, সমস্ত শোনাব।’
ফোনটা রেখে অনেকক্ষণ ছাদে পায়চারি করলাম। যিনি আমাকে কবীরের ঠিকানা জোগাড় করে দিয়েছিলেন চিঠি পাঠাবার জন্য, সেই সুরপাগল অগ্রজ কবির সাথে রাতে ফোনে কথা হওয়ায় বললাম, ‘কবীর সুমনের কাছে গেলে যা যা গান শুনতে পাব, তা কি আমার জীবনে আর কোনোদিন কক্ষনো শুনতে পাব আমি?’ উত্তরে উনি বললেন, ‘নাআআ।’ তেরো সালের মে মাসে আমি ব্যাঙ্গালোরে চাকরির ইতি টেনে কলকাতায় ফিরে এলাম।
সেই থেকে শুরু হল আমার জীবনে সুমন শোনার দ্বিতীয় পর্ব। এক্কেবারে সামনে থেকে। এর আগে যখন কবীর সুমনের একাকী অনুষ্ঠানের টিকিট কাটতাম ‘শ্যামবাজার হোসিয়ারি’ থেকে আমার ভাগ্যে সবসময় পেছনের দিকের রো পড়ত। সব টিকিটেরই দাম ছিল চল্লিশ টাকা কিন্তু ওই দোকানটায় সম্ভবত পেছনের দিকের রোয়ের টিকিটই আসত। যাইহোক, ১৯ জি বৈষ্ণবঘাটা বাইলেনে কবীরের পৈতৃক-মাতৃক বাড়িতে আমার আনাগোনা শুরু হল। একের পর এক গান শুনছি। আর বাজনা। তার লিস্ট এখানে উল্লেখ করা সম্ভব নয়। সেইসাথে আমার জীবনে প্রথমবার গান শুনতে শিখছি। তারিফ করতে শিখছি। উনি পরপর গেয়ে যান। আর বাজান। সেসব গান আলাদা। বাংলা, হিন্দি, ইংরেজি, বা কখনও অন্য ভাষারও গান। ওইসব গানের বেশিরভাগই আমি ছোট্টবেলা থেকে কক্ষনো কোত্থাও শুনিনি। কেউ আমাকে শ্রোতা হিসেবে এত সিরিয়াসলি নেনইনি কক্ষনো। একের পর এক গান। আর বাজনা। গানের প্রিলিউড আর ইন্টারলিউড যে গানটার মতোই গুরুত্বপূর্ণ বা কখনও তার চেয়েও বেশি আমি জানিনি আগে। আমি এতই অশিক্ষিত যে আগে সেটা মাথাতেও আসেনি। বা কানে। বিশেষ কোনো জায়গায় গানের সুরগুলো এমন যে বুকের ভেতরটা একদম মোচড় দিয়ে ওঠে। এক্কেবারে শেষ করে দেয়। ছারখার। একটা বিশেষ স্বরের পরে একটা বিশেষ স্বর এসে লাগলে ওরকমটা যে হতে পারে আমার ধারণা ছিল না কখনও। আমি ওসব স্বরের নাম জানি না। কিন্তু কানে এসে ঢুকলে কী হয় সেটা টের পেতে শুরু করেছি। হাড়ে হাড়ে। একটা গানের অন্তরায় গানের মুখ বা স্থায়ীর সুর থেকে অনেকটা সরে এসেও একজন বড়ো সুরকার কত সহজভাবে, কত অবলীলায় আবার গানের মুখে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে পারেন সুর, উনি প্রথম দেখালেন।
নতুন নতুন গান শুনছি। নতুন অর্থে আগে না শোনা। সিনেমার গান। রম্যগীতির গান। অন্যান্য গান। ওঁর নিজের বানানো রাশি রাশি রেকর্ড-না-হওয়া গান। ওঁর মহাবিশ্বস্বরূপ স্মৃতিতে থাকা অজস্র গান। সিনেমার অবিখ্যাত গান। নায়ক-নায়িকাদের লিপে নয় সেসব। সেসব গায়ক-গায়িকা-সুরকার-বাদক-গীতিকারদের লিস্ট এখানে দেওয়া সম্ভব নয়। ওঁর কাছ থেকে শুনে এসে সেসব গান ইউটিউবে খুঁজি। পাই। বা পাই না। কিন্তু কিছু গান বাদ দিয়ে দেখেছি বাকি কোনোটাই কবীর গাইলে যেমন শোনায় তেমন শোনাচ্ছে না। কারণ কী? উচ্চারণ? গায়কি? স্বরপ্রক্ষেপ? বাজনা? গলার ওজন কোথায় কতটা দিচ্ছেন? সামনে থেকে শোনা? হয়তো এর সবকটাই। এ এক রহস্য! আরে বাবা, গানের ধরতাইটাই তো আলাদা ওঁর। আরে, ছোট্টবেলা থেকে এতবার শোনা ওই ঘ্যানঘ্যানে গানটা এইইইইইই রকম! কে জানত! বাপের জম্মে কে জানত! তবে একটা জিনিস আমি লক্ষ করেছি। কেন উনি গাইলে গানটাই আলাদা হয়ে যায় তার একটা অন্যতম কারণ গানটার লয় আর ছন্দ। আমার মনে হয় প্রত্যেকটা গানের একটা উপযুক্ত লয় আছে, আর নিজস্ব ছন্দ। যে ছন্দে-লয়ে গাইলে গানটার চলন সবচাইতে সুন্দর হয়। কবীর সেটা ধরতে পারেন। বা লয় আর ছন্দের মিলিত দেবতা ওঁর কাছে এসে স্ট্রেট ধরা দেন। আর উচ্চারণের দেবতা? গায়কির? স্বরপ্রক্ষেপের? বাজনার? গলার ওজনের? জীবনের অভিজ্ঞতার? সব্বাই? আর কে কে? (একথা কবীরকে বললে উনি বলবেন আমি পক্ষপাতিত্ব করছি।)
কোনোদিন মনটা বিষণ্ণ থাকলেই রাত্রে মেসেজ করে পরেরদিন হাজির হই। কারণ, আমি জানি ওঁর কাছে গেলে আমার মনটা যে-উচ্চতায় উঠবে, জগতে আর কোনো কিছুতেই তা হবে না।
কাছ থেকে ওঁর গান শোনার একটা বড়ো অংশ জুড়ে আছে রবীন্দ্রনাথের গান। হীরে কাটার সময়ে যেমন একটা বিশেষ অ্যাঙ্গেলে কাটা হয় যাতে (আলোর টোটাল ইন্টারনাল রিফ্লেকশনের ফলে) তা সবচেয়ে বেশি চকচক করে, উনি ঠিক সেইভাবে গানটাকে নেন। যাতে তার সবচেয়ে উৎকৃষ্ট রূপটা ধরা পড়ে। রবীন্দ্রনাথের গান কীরকম ওঁর কাছে না শুনলে কোনো আন্দাজই হত না আমার।
গত এক দশকের বেশি সময় ধরে আমার কবীর সুমনের গান শোনার পর্ব চলছে। সেইসাথে গান নিয়ে হাজারো কথা। গানের ইতিহাস-ভূগোল-ইভোলিউশন-মাইগ্রেশন। আজও যখন যাই কান-মন পবিত্র করে বাড়ি ফিরি। কোনোদিন মনটা বিষণ্ণ থাকলেই রাত্রে মেসেজ করে পরেরদিন হাজির হই। কারণ, আমি জানি ওঁর কাছে গেলে আমার মনটা যে-উচ্চতায় উঠবে, জগতে আর কোনো কিছুতেই তা হবে না।
লেখালেখি আমার কাজ হলেও আমার জীবনের অন্যতম আকর্ষণ সুর। যেসব সুরে আমাদের এই উপমহাদেশের সবটা ধরা আছে। পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস আর না জানি কত কত বছরের প্রাগিতিহাস। আর্কিওলজি বলছে, নিদেনপক্ষে ৬৫,০০০ বছর আগে হোমো সেপিয়েন্স ভারত উপমহাদেশে আসেন। এই সময়ে তার আগের মানুষেরা, আর্কেইক হিউম্যান বা হোমো স্পিসিসের অন্যান্য মানুষেরা এখানে রীতিমতো ছিলেন। যাঁরা আমাদের ইভোলিউশনারি কাজিন। চেন্নাইয়ের কাছে ১৫ লক্ষ বছর আগের স্টোন টুল পাওয়া গেছে বই কী! হোমো সেপিয়েন্সরা কোনোভাবেই আগের মানুষদের থেকে বিরাট এগিয়ে ছিলেন না। বরং আগের কোনো কোনো মানুষের ব্রেন তুলনায় বড়ো ছিল। উপমহাদেশে আধুনিক মানুষের প্রাচীনতম ফসিলটা মেলে শ্রীলঙ্কায়। ৩৫,০০০ বছর আগের। মোটামুটি এই সময় নাগাদই সম্ভবত মাইক্রোলিথ বা ছোটো স্টোন টুলকে ভরসা করে উপমহাদেশে হোমো সেপিয়েন্সরা ওপরে উঠে আসেন। আগের মানুষেরা হারিয়ে যান। তারপরেও কত কত মানুষ (হোমো সেপিয়েন্স) এই উপমহাদেশে এসেছেন। আছেন অন্যান্য প্রাণীরা। এদেশের গাছগাছালি। জলবায়ু। মাটি। বাতাস। জল। এঁদের সব্বার সব্বার কথা হয়তো ইতিহাসে লেখা নেই। উপমহাদেশে ইতিহাস (ইউরোপীয় মতে) লেখার চল অনেক পরে এসেছে। কিন্তু এঁদের সব্বার চলন, বলন, খাদ্যসংগ্রহ, শিকার, চাষবাস, বসতি তৈরি, ঘর বাঁধা, যুদ্ধ-মারামারি, রক্তপাত, রক্তচলাচল, ঝড়, বৃষ্টি, বন্যা, ক্ষরা, মহামারী, আবিষ্কার, প্রযুক্তি, ঘর-গেরস্থালি, মেজাজ, আধুনিকতা, হাসি-ঠাট্টা-তামাশা-কান্না-প্রেম-কাম-পেচ্ছাপ-পায়খানা-বিবাহ-বিচ্ছেদ-বিরহ-বন্ধুতা-শত্রুতা-রাগ-অভিমান-মনখারাপ-ঝগড়া-আপোস সব লেখা আছে উপমহাদেশের বিচিত্র সুর-তাল-ছন্দ-লয়ে। আমার কাছে উপমহাদেশের এই সুর-তাল-ছন্দ-লয়ের যদি কোনো ঈশ্বর বা খোদা থেকে থাকেন, তিনি বর্তমানে ১৯ জি, বৈষ্ণবঘাটা বাইলেন-এই বসত করেন। তাই ওটাই আমার তীর্থস্থান। ধম্মকম্ম। আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস।
আমার জীবনের শিল্প-অভিজ্ঞতার সর্বশ্রেষ্ঠ উৎসকে জন্মদিনে অনন্ত প্রণাম আর ভালোবাসা জানাই। আমার সুমন-অভিজ্ঞতার একটা অংশ সংক্ষেপে এখানে লিখলাম। ওঁর কাছ থেকে যা যা পেয়েছি, পাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও পাব—সেই সব নিয়ে একটা বই লেখার সুযোগ আশা করি আমার জীবন আমাকে দেবে।
(পুনশ্চ: ছোট্টবেলা থেকে সুমন-সুমন এই নাম জপ করেছি। যখন দেখা হল কী ডাকব কী ডাকব এই ভেবে আমি ডাকলাম ‘অ্যাই বুড়ো’। উত্তরে উনি বললেন ‘অ্যাই ছুঁড়ি’। এই এক দশকে বুড়ো আরও বুড়ো হয়েছেন। কিন্তু ছুঁড়ি যে আর ছুঁড়ি নেই। মধ্যবয়স তাকে আলিঙ্গন করেছে। বুড়ো এবার নতুন কোনো নামে ডাকবেন না কি?)