‘জগুবাবু’ নাকি ‘যদুবাবু’? বাজারের নাম ঘিরে আজও রহস্য

এই বাজারের ইতিহাসে জড়িয়ে আছে রানি রাসমনির নাম

আপনি কি ন্যায্য মূল্যে টাটকা মাছ খুঁজছেন? অথবা, ধরুন তুলনামূলক সস্তা দামে তরতাজা সবজি? নাকি ভালো মানের মুদি কিংবা কোনোও দশকর্মা দোকানের খোঁজ করছেন? আপনি যদি দক্ষিণ কলকাতার বাসিন্দা হয়ে থাকেন, আর কোনো চিন্তাই নেই! আপনার সমস্তু প্রয়োজনের হদিশ মিলতে পারে এই জায়গায়। কি নাম সেই জায়গার? ‘যাদুবাবুর বাজার’ (Jadubabu Bazar), যা অনেকে আবার ‘জগুবাবুর বাজার’ (Jagubabur Bazar) নামেও চেনে। পুরোনো, অতি পরিচিত এই বাজারটি শুধুমাত্র স্থানীয়দের কাছেই নয়, কলকাতা শহরের আনাচে কানাচে বহু বাসিন্দার কাছেই এই বাজারের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। কলকাতাবাসীর কাছে এই বাজারটি পছন্দের একটি আড্ডাখানাও বটে।

কিন্তু এই বাজারের নাম ‘যদুবাবুর বাজার’ কেন রাখা হলো? কে ছিলেন এই যদুবাবু? এর পটভূমি সম্বন্ধে তলিয়ে জানতে, আমাদের ফিরে যেতে হবে ঔপনিবেশিক সময়ে। সময়টা ১৭১৭ সাল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মুঘল সম্রাট ফারুখসিয়ারের (Mughal Emperor Farrukhsiyar) কাছ থেকে তাদের বসতির আশেপাশের ৩৮টি গ্রাম থেকে রাজস্ব আদায়ের অধিকার লাভ করে। এর মধ্যে পাঁচটি গ্রাম ছিল তৎকালীন হুগলি (Hooghly) জেলার, যা বর্তমানে হাওড়া (Howrah) জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এবং বাকি ৩৩টি গ্রাম কলকাতার (Kolkata) পার্শ্ববর্তী। বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার (Siraj-ud-daulah) পতনের পর, ব্রিটিশ কোম্পানি ১৭৫৮ সালে মীরজাফরের (Mir Jafar) কাছ থেকে এই গ্রামগুলি কিনে নেয় এবং তাদের পুনর্গঠন করে। এই গ্রামগুলি ‘ডিহি পঞ্চান্নগ্রাম’ (Dihi Panchannagram) নামে পরিচিত ছিল এবং ভবানীপুর (Bhowanipore) ছিল তাদের মধ্যেই একটি। এটি তখন মারাঠা ডিচের (Maratha Ditch) সীমানার বাইরে একটি উপশহর হিসেবে বিবেচিত হতো।

রানি রাসমণি এই প্রাসাদটি এবং তৎসংলগ্ন এলাকাটি ক্রয় করে সমগ্র সম্পত্তি তার প্রিয় নাতি যদুনাথ চৌধুরীকে উপহার দেন। এইভাবে যদুনাথ চৌধুরীর নাম থেকে বাজারটি ‘যদুবাবুর বাজার’ নামে পরিচিত হয়।

১৭৬৫ সালে ভবানীপুর ছিল ‘পঞ্চান্ন ডিহি’র একটি (একটি উপশহর) যেটিতে তখন ডিহি চক্রবেরিয়ার একটি বড় অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৭৩ সাল নাগাদ, প্রধানত বাংলায় ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ভারতীয় অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্ট (British Parliament) দ্বারা ‘রেগুলেটিং অ্যাক্ট’ আইন পাস করা হয়। এই আইনের প্রধান বিধান ছিল বাংলায় ফোর্ট উইলিয়ামের একজন গভর্নর-জেনারেল নিয়োগ এবং ১৭৭৪ সালে বিচার বিভাগের আওতায় ‘সুপ্রিম কোর্ট’ প্রতিষ্ঠা করা। চারজন ইংরেজ বিচারক, যথা – স্যার এলিজা ইম্পে (Chief justice), স্টিফেন সিজার লে মায়েস্ত্রে (Puisne judge), জন হাইড (Puisne judge) এবং রবার্ট চেম্বারস (১৭৭৪ থেকে ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত পুইসনে বিচারক, ১৭৮৩ থেকে ১৭৯১ সাল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি এবং ১৭৯১ থেকে ১৭৯৮ সাল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতি) নিযুক্ত হন। ভবানীপুরে তখন একটি বিস্তীর্ণ বাগানবাড়ি ছিল এবং বিচারপতি রবার্ট চেম্বার্স সুপ্রিম কোর্টে থাকাকালীন এই বিশাল প্রাসাদে থাকতেন। যদিও কে এই প্রাসাদটির প্রকৃত মালিক, কেই বা এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেছেন সে সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে জনৈক যোগেশ্বর লাহা (Joggeswar Laha) এই সম্পত্তি কিনে সেখানে একটি বাজার স্থাপন করেন। তার বেশ কিছু সময় পরে রানি রাসমণি (Rani Rashmoni) এই প্রাসাদটি এবং তৎসংলগ্ন এলাকাটি কিনে নিয়ে সব সম্পত্তি তার প্রিয় নাতি যদুনাথ চৌধুরীকে উপহার দেন। এইভাবে যদুনাথ চৌধুরীর নাম থেকে বাজারটি ‘যদুবাবুর বাজার’ নামে পরিচিত হয়।

রাসমণির দ্বিতীয় কন্যা কুমারী দাসী এবং প্যারিমোহন চৌধুরীর ছেলে ছিলেন যদুনাথ চৌধুরী (Jadunath Chaudhuri) । বাবু যদুনাথ চৌধুরী উত্তরাধিকার সূত্রে যে বাজারটি পেয়েছিলেন। এই বাজার পত্তনের শুরুর দিকে, পশ্চিমাঞ্চল থেকে গ্রামবাসীরা এসে আদিগঙ্গার ধারে বসতি স্থাপন করেছিল, যার প্রধান কারণ ছিল পরিবহন ও বাণিজ্যের সহজতা। প্রথম বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে উল্লেখ্য ছিলেন কংস বনিক বা পিতল-কাঁসা ব্যবসায়ী, শঙ্খ বনিক বা শঙ্খ অর্থাৎ শাঁখা ব্যবসায়ী, তেলি বা তেল ব্যবসায়ী এবং পাটা বা শিল্পী। ১৮৩৩ সালের শহরের মানচিত্রগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় সেখানে কাঁসারীপাড়া (Kasaripara), তেলিপাড়া (Teliapara), শাঁখারিপাড়া (Sankharipara), পটুয়াপাড়া (Patuapara) নামক এলাকাগুলির উপস্থিতি। কারিগর, ব্যবসায়ীদের সহজ সংযোগ এবং  এই বাজারের চাহিদা তৈরি হয় ভবানীপুর সংলগ্ন এলাকায় প্রচুর পরিমাণে বসতি স্থাপনের জন্য। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকের কোনো মানচিত্র ঘাঁটলে দেখা যায়, এই অঞ্চলের পাশ দিয়েই রয়েছে – বাবু মাধবের ঘাট, মদন মোহন পালের ঘাট, রাণী রাসমনির ঘাট। ফলে জলপথে যাতায়াতের সুবিধার জন্য ১৮২৫ সালের মধ্যেই, ভবানীপুর এলাকায় পর পর সেতারাম ঘোষ বাজার (Setaram Ghose Bazar), গঙ্গারাম সরকার বাজার (Gangaram Sircar Bazar), সুলতান মিস্ত্রির বাজার (Sultan Mistry’s Bazar) এবং যাদুবাবুর বাজার সহ বেশ কয়েকটি বাজার তৈরি হতে থাকে।

সঠিক দামে বিভিন্ন ধরনের তরতাজা মাছ, মাংস থেকে শুরু করে মরশুমের শাকসবজি এবং ফল, সবকিছুর জন্যই বিখ্যাত ‘যদুবাবুর বাজার’। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় রোড (Ashutosh Mukherjee Road) সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে আজও স্বমহিমায় হয়েছে বাজারটি। স্থায়ী কিছু দোকানের পাশাপাশি এখনও প্রতিদিন প্রচুর অস্থায়ী দোকান বসে এখানে। কোনো কোনো বিক্রেতা এই বাজারের পাশে ফুটপাথে বসেই পসরা সাজান রোজ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত একনাগাড়ে চলে বিকিকিনি। শপিং মলের যুগে এসে আজও যেন সেকেলে প্রাচীন বাজারটি শহরের প্রাণভোমরা হয়ে টিকে থেকেছে স্বমহিমায়। প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে পাল্লা দিয়ে এই বাজারের বিক্রেতারা গ্রাহকদের চাহিদা পূরণে ত্রুটি রাখছেন না। ব্যবসায়ী হলেও পুরোনো ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার কর্মকাণ্ডের তাঁরা অন্যতম শরিক।

 

প্রতিবেদনটি ইংরেজিতে পড়তে

Post Tags
Written by
Developed by DXDasia