গীতিকার ও পাঠক কবীর সুমন কীভাবে কবিতাকে দ্যাখেন?
এই কথোপকথনের মূল ভিত্তি কবিতা। গীতিকার কবীর সুমন, পাঠক কবীর সুমন কীভাবে কবিতাকে দ্যাখেন, নানা দিক দিয়ে তা-ই বুঝে নেওয়ার চেষ্টা। তাঁর অননুকরণীয় বাচনভঙ্গিকে লিখিত মাধ্যমে ধরা কঠিন। তারপরও, সম্পাদিত আকারে, যথাসম্ভব অবিকৃতভাবে তুলে ধরা হল। বঙ্গদর্শন.কম-এর পক্ষ থেকে কবীর সুমনের সাক্ষাৎকার-টি (Interview with Kabir Suman) নিয়েছেন তরুণ কবি ও স্বাধীন গবেষক তন্ময় ভট্টাচার্য।
________________
তন্ময়: আপনার ‘সুকুমার রায়’ নামে যে গানটি আছে, তা শুরু হওয়ার আগে পয়ারে আটটি লাইন বলেছিলেন—
“নমি আমি কবিগুরু তব পদাম্বুজে।
হে মধুসূদন, আমি সুকুমার বুঝি।।
প্রতিটি অক্ষর আর সুর মেপে চলি।
প্রতিনিঃশ্বাসে সুকুমার রায় বলি।।
দাঁড়াও পথিকবর, শোনো এ-শোলোক।
নিজের হাতেই লেখা সমাধি ফলক।।
আমার সমাধি হবে অমোঘ চিতায়।
তখন আগুন হয়ো সুকুমার রায়।।”
এরপরে গানটি শুরু হয়। এই অংশটা অনেকটা বন্দনার মতো। এই বন্দনা অংশের সূত্র ধরেই আমার প্রশ্ন যে, শৈশবে সুকুমার রায়ের সঙ্গে আপনার আলাপ বা পাঠ শুরু কার হাত ধরে? সেই বয়সে কীভাবে সুকুমার রায় একজন শিশুর মনে ছাপ ফেলেছিলেন এবং পরবর্তীতে কৈশোর বা যৌবনে কীভাবে সেটা প্রভাব ফেলেছে?
সুমন: খুব অল্প বয়স থেকেই আমার হাতে বই এসেছে। মূলত আমার বাবা-মা দুজনের কারণেই এটা হয়েছে। আমার ১৯৪৯ সালে জন্ম, কলকাতায় চলে আসি আমার পাঁচ বছর বয়সে, ১৯৫৪ সালে। ১৯৫৪-৫৫-৫৬ এরকম সময় থেকেই সুকুমার রায় আমার হাতে এসেছে এবং সুকুমার রায় বলতেই আমি চমৎকৃত হতাম, হয়েছিলাম তাঁর শব্দ প্রয়োগে— যেমন ‘ঐ চাঁদ ডুবে গেল গব্ গব্ গবাস" (i)। দুজনের লেখা কবিতা আমাকে প্রভাবিত করেছে, একজন সুকুমার রায় এবং অন্যজন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কিন্তু শুধু একটিমাত্র—‘দুন্দুভি বেজে ওঠে/ ডিম্-ডিম্ রবে,/ সাঁওতাল-পল্লীতে/ উৎসব হবে।’ তাতে একটা লাইন ছিল—‘দান করে কুসুমিত/ কিংশুকবন/ সাঁওতাল-কন্যার/ কর্ণভূষণ।’ এই যে শব্দের মধ্য দিয়ে বেরিয়ে আসে সুর, শব্দ, ধ্বনি— এই ধ্বনিটা আমার। সুকুমারের কবিতাতেও এই ধ্বনি এভাবেই থাকে। ‘দুন্দুভি বেজে ওঠে/ ডিম্-ডিম্ রবে’— তার যে-ধ্বনিটা, এই ধ্বনিটাই আমি নানাভাবে পাচ্ছি। আবার সবসময় যে গুরুগম্ভীর, তা কিন্তু নয়। খেলা। শব্দ নিয়ে খেলা। সুকুমার রায়কে যাঁরা শিশুসাহিত্যিক বলেন, তাঁদের সম্পর্কে আমার মনের মধ্যে কিচ্ছু নেই। সুকুমার রায় কেউ পড়ে না। কেন পড়েনি? কারণ সুকুমার রায় সবার যোগ্য নয়। সুধীন দত্ত পড়েনি। কেন? কারণ সুধীন দত্তের যোগ্য নয়। এই যে সুকুমারের—‘চট্ ক’রে মনে পড়ে মট্কার কাছে/ আধখানা মালপোয়া কাল থেকে আছে।’ (ii)— এটা যদি আমাকে প্রভাবিত না-করত, আমি একটি লাইনও লিখতে পারতাম না। একটি লাইনও ভাবতে পারতাম না।
এটা কোত্থেকে এল, আমি বলতে পারব না। আমার বাড়িতে আমার বাবা-মা কেউই লেখালিখি করেননি কস্মিনকালে; আমার বড়ো ভাই করেননি— আমার থেকে চার বছরের বড়ো, মারা গেছেন অকালে; আমিও লেখাপড়ায় ভালো ছিলাম না। ফেল করতাম। এমনও হয়েছে যে, আমি হাফ ইয়ার্লি পরীক্ষায় প্রায় সব কটা সাবজেক্টে ফেল করেছি। স্কুলে রাখতে চাইত না আমাকে, বের করে দিত। ফলে আমার ভেতরে যে কোনও পাণ্ডিত্য বা স্কলাস্টিক পারসুইট রয়েছে তা কিন্তু নয়। আনন্দ— ধ্বনি খোঁজার আনন্দ। ‘শুয়ে কেরে? ঠ্যাং–ভাঙা? ধ’রে আন এখেনে,/ স্ক্রুপ দিয়ে এঁটে দেব কি রকম দেখেনে।’ তারপর, ‘গেঁটেবাতে ভুগে মরে ও পাড়ার নন্দী,/ কিছুতেই সারাবে না এই তার ফন্দি—’। আমার প্রাত্যহিক জীবনের যে হাসিঠাট্টা, তার সবকিছুর সঙ্গে মিলে থেকেছেন সুকুমার রায়। এগুলোকে কেউ বলুক কবিতা, কেউ বলুক পদ্য— কিছু যায়-আসে না। সুকুমার রায়ের তৈরি ভাষা। কাজেই ‘আমাকে ভাবায় সুকুমার রায়।’ আর কেউ ভাবায় না। কেউ-কেউ মনে করতে পারেন যে রবীন্দ্রনাথ নয় কেন? কারণ রবীন্দ্রনাথ নন! ‘ঐ চাঁদ ডুবে গেল গব্ গব্ গবাস’— রবীন্দ্রনাথ এটা করেননি, ওই জন্য! ‘পদ্য ছোটে নিজের ছন্দে/হালকা কল্কে ফুলের গন্ধে।’ (iii) এই যে আমি লিখতে পারলাম, এটা সুকুমার রায় ছিলেন বলে— ‘অক্ষর ছুটে অক্ষরে যায়’।
তন্ময়: আপনি বিভিন্ন জায়গায় বলেছেন ১৯৬১ সালের কথা, যখন রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষ ছিল। সেই সময় রবীন্দ্রনাথের গান আরও বেশি মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিলেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও রেকর্ডের মধ্য দিয়ে। আপনার তখন কিশোর বয়স। আমি আপনার স্মৃতি থেকে জানতে চাইব যে, রবীন্দ্র-কবিতাও কি শতবর্ষ উপলক্ষে সেভাবে আলাদা করে ছড়িয়ে ছিল?
সুমন: নাহ্। মানে ছড়িয়েছিল, যে ধরনের কবিতা আবৃত্তির। সভ্য দুনিয়া আবৃত্তি উঠিয়ে দিয়েছে। একমাত্র আমরা এখনও গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে ‘মাসি… মাসি…’, ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই হো হো’— এসব উন্মত্ততা এবং তারল্য… ভাবনার তারল্য বাঙালি নিজের করে রেখে দিয়েছে। সভ্য দুনিয়া, যেমন সিলভিয়া প্লাথ— তিনি কবিতা পড়ছেন, রিচার্ড বাটন কবিতা পড়ছেন, শেক্সপিয়রের সনেট পড়ছেন। তেমনি আমাদের সলিল চৌধুরী ‘চাবি’ কবিতাটা বলছেন বা ‘শপথ’ কবিতাটা বলছেন। আমরা কবিতাটা আরবলি না, আমরা গলা কাঁপিয়ে আবৃত্তি করি। এবং সেই আবৃত্তি করার উপযোগী যে-কবিতাগুলো…যেমন ‘পুনশ্চ’ কেউ পড়ছে বলে আমি শুনিনি অথবা ‘পত্রপুট’ এর দুটো কবিতা কেউ পড়ল বা ‘ক্যামেলিয়া’ কবিতাটা আমি কাউকে পড়তে শুনিনি। সবসময়ই ‘আজি এ প্রভাতে রবির কর’। রবীন্দ্রনাথ কবিতা বিন্দুমাত্র কবিতা ছড়ায়নি।

তন্ময়: রবীন্দ্রনাথের কবিতা তো একদিক দিয়ে আছে, পাশাপাশি জনপ্রিয় ছিলেন নজরুলও। আপনি যে ধ্বনির কথা বলছেন সুকুমার রায়ের, সেই ধ্বনি কি নজরুলের কবিতাতেও পেয়েছেন?
সুমন: হ্যাঁ, হ্যাঁ। কিন্তু আমি নজরুল পড়ছি অনেক পরে। মানে ‘অগ্নিবীণা’ বা ওগুলো… অনেক পরে। কিন্তু আমরা যদি জীবনানন্দ দাশের ‘ঝরা পালক’ পড়ি, তবে অনেক আগের— আর্লি জীবনানন্দ দাশ, তার মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের প্রভাব ওতপ্রোতভাবে ছিল। যেমন নজরুল পেরেছিলেন বাংলা গানে গদ্যশৈলী আনতে। যেমন ‘শাওন আসিল ফিরে সে ফিরে এলো না’ গানটি। এই গানে নজরুল লিখছেন সঞ্চারীতে— ‘আমার বিদেশিরে খুঁজিতে অনুক্ষণ/ বুনো হাঁসের পাখার মত উড়ু উড়ু করে মন।’
এসব আর প্রকাশ-টকাশ কোরো না, কোনও লাভ নেই। যে-দেশে বিজেপি এসে পড়ে, সেদেশের আর কিছু হবে না। তবে তোমরা… তোমাদের লড়াই করে ধ্বনিটা দখল করে রাখতে হবে। এটুকু বলতে পারি যে আমি আমার জীবনে কোনোদিন কাউকে পাতি কিছু কথা ছাড়া কিছু বলতে শুনিনি। বাংলা সাহিত্য বলতে যদি জীবনানন্দ দাশ হয় তার সঙ্গে সঙ্গে ‘বনলতা সেন’ বা ওই ধরনের কিছু। বিরক্তিকর। কাজী নজরুল ইসলাম যে ধ্বনিগুলো এনেছেন, যেমন ধরা যাক ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটিতে—‘আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা,/করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পঞ্জা’। আমি ওই জায়গাটাও ভাবছি— ‘আমি বন্ধন-হারা কুমারীর বেণী, তন্বী-নয়নে বহ্নি’। এই যে ছন্দটা, এই ছন্দটা যাচ্ছে কিন্তু আমার হৃদয়ে। ‘কামাল পাশা’কিন্তু আমার হৃদয়ে নেই। তাতে আমার কান আছে, কাজী সব্যসাচী পড়তেন, ভালো লাগে। কিন্তু এনিওয়ে, পয়েন্ট হচ্ছে যে লোকে নজরুলের কবিতাও পড়ে না।
লোক— লোক কে? ‘লোক’ শব্দটা মানে একজন আমাদের দেশের চাষি বা নাপিত বা তেলি বা কামার-কুমোর জেলে বা যারা তাঁত বোনেন— তাঁদের থেকে তো আমরা কিছু এক্সপেক্ট করি না— করলে মন্দ হত না কিন্তু। করি যাঁদের থেকে, তাঁদের জীবনে কবিতার কোনও প্রভাব আছে বলে মনে হয় না। ধরা যাক, একজনও নেতার বক্তৃতা শুনেছ এই দেশে, যেখানে কবিতা আসছে? আমি নিজে পলিটিক্স করি না, মানে পলিটিক্যাল লোক ঠিকই তবে পলিটিক্যাল পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। তৃণমূল কংগ্রেসের টিকিটে দাঁড়িয়েছি সাংসদ হয়ে। আমি বক্তৃতা শুনতাম নেতাদের। কিন্তু আমি পড়েছি যে জওহরলাল নেহেরু— আমাদের ভারতের যিনি প্রথম প্রধানমন্ত্রী, তাঁর টেবিলে কাঁচের তলায় রবার্ট ফ্রস্টের একটা কবিতার লাইন ছিল— ‘The woods are lovely, dark and deep,/ But I have promises to keep,/ And miles to go before I sleep,/ And miles to go before I sleep.’ অন্য কারোর ব্যাপারে এরকম কিছু পড়িনি বা জানি না।
তন্ময়: আপনি যখন কৈশোরে বা প্রথম যৌবনে কবিতা পড়ছেন, ধরছি ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত, স্কুলপাঠ্যের বাইরেকাদের কাদের কবিতার সংস্পর্শে এসেছেন?
সুমন: আমার বন্ধু ছিলেন সুভাষ ঘোষাল নামে একজন। তিনি অর্থনীতি পড়তেন, আমি ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হয়েছিলাম, একই ক্লাসে ১৯৬৬ সালে হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করে। সুভাষ আমাকে এগিয়ে দিয়েছিলেন কবিতার দিকে। উনি আমাকে অমিয় চক্রবর্তী পড়িয়েছিলেন, সমর সেন পড়িয়েছিলেন। সমর সেনের কবিতার বইটি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। বুদ্ধদেব বসু কিছুটা— এরকম। ওতে-আমাতে কবিতা দেওয়া-নেওয়া লেনদেন চলত। এছাড়া কবিতা পড়া সেরকম কিছু না।
তন্ময়: আপনার সমকালের কবিতার সঙ্গে আপনার আলাপ কীভাবে? পত্রিকার মাধ্যমে? আপনি লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক ছিলেন?
সুমন: পত্রিকার মাধ্যমে। লিটল ম্যাগাজিনের পাঠক ছিলাম। তবে নাম মনে নেই। আমাদের সময় খুব লিটল ম্যাগাজিন বের হত। আমি ১৯৬৯ সালে বিএ পাস করেছি। তার সেই দশক যদি ধরো তার মধ্যে নকশালবাড়ির অভ্যুত্থান, ফাঁসিদেওয়ার অভ্যুত্থান হয়ে গিয়েছিল। ফলে ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়ছি, ইউনিভার্সিটির দেয়ালে লেখা—‘তোমাকে আমাকে দিচ্ছে নাড়া/ মাও-সে-তুঙের চিন্তাধারা’। এর মধ্যেও তো একটা কবিতা! এইভাবে কবিতা এসে দরজায় কড়া নাড়ত। তো সেই সময়ে অনেক কবিতা পড়েছি। বাংলা তো পড়েইছি, ইউরোপীয় সাহিত্যও পড়েছি। আমাদের সময় থ্রি শিলিং সিক্স পেন্স-এর পেঙ্গুইন বইগুলো সাড়ে তিন টাকায় পাওয়া যেত তারপর সাড়ে পাঁচ টাকা ৫০ পয়সায়। এত কম দাম। এখন ৪০০-৫০০ টাকা বা হাজার টাকা নেয়। তখন কলেজে উঠেই আমি টিউশনি করতাম। বাড়ি থেকে কোনো পয়সা নিতাম না। যদিও বাড়ি থেকে কলেজের ফি-টা দিত, ১২ টাকা। ওই ১২ টাকাও আমার বই কেনাতেই যেত। টিউশনি করেপেতাম ছাত্রপিছু ৩০ টাকা। ৩০ টাকার মধ্যে… সিগারেট খাওয়া ধরেছি তখন, সিগারেটের খরচ আর কলেজের চা খাওয়া। এগুলো বাদ দিয়ে খান দুই বই প্রত্যেক মাসেই কেনা যেত। ফলে সেই সময় খুব বিস্তৃতভাবে পড়েছি কবিতা। তবে কবিতার চেয়েও বেশি আমাকে আকর্ষণ করত ফিকশন।
সভ্য দুনিয়া আবৃত্তি উঠিয়ে দিয়েছে। একমাত্র আমরা এখনও গলা কাঁপিয়ে কাঁপিয়ে ‘মাসি… মাসি…’, ‘কামাল তুনে কামাল কিয়া ভাই হো হো’— এসব উন্মত্ততা এবং তারল্য… ভাবনার তারল্য বাঙালি নিজের করে রেখে দিয়েছে।
তন্ময়: ষাটের দশক, তখন আপনার কৈশোর। আপনি নিশ্চয়ই জানেন যে হাংরি আন্দোলন বলে একটি চেষ্টা বাংলা সাহিত্যকে বিভিন্নভাবে একটু বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। আপনার কৈশোর বা প্রথম যৌবনের পড়ুয়া-মনে কি সেগুলো কোনও ছাপ ফেলেছিল, বা সেই সব টেক্সট কি আপনার কাছে এসে পৌঁছেছিল কোনোভাবে?
সুমন: নাহ্। তবে আমি যখন কলেজে পড়ছি, ‘ফিরে এসো চাকা’… বিনয় মজুমদারের কবিতা তখন খুব ‘ইন’। কিন্তু আমি কোনও কবিতা লিখতাম না। কবিতা লেখার অভ্যেস আমার ছিল না। ওইরকম কোনও প্রেরণাও ছিল না, তাগিদও ছিল না। ফলে আমি কবিতামুখী ছিলাম না কিন্তু।
তন্ময়: অনেক বাঙালি যে প্রথম প্রেমে পড়লে কবিতা লেখে, ইত্যাদি আপনার যৌবন বা কৈশোরে ঘটেনি?
সুমন: হ্যাঁ হ্যাঁ, দিব্যি ঘটেছে। দিব্যি লেখার চেষ্টা করেছি। সবাই করে, আমিও করেছি। সুবিধা হয়নি। টের পেলাম, হচ্ছে না।

তন্ময়: কবি শহীদ কাদরীর সঙ্গে আপনার জার্মানিতে আলাপ এবং তাঁর কবিতার বিনির্মাণ করে আপনি ‘তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’ গানটি তৈরি করেছেন। পাশাপাশি, বিভিন্ন জায়গায় শহীদ কাদরীর কবিতা সম্পর্কেও বলেছেন। সেই বিষয়ে আমি পুনরাবৃত্তি করছি না, কিন্তু বাংলাদেশের অন্যান্য কবিদের সঙ্গে আপনার আলাপ কি শহীদ কাদরীর সূত্রেই, না অন্য সূত্রে?
সুমন: ২৫ বছর বয়সে আমি ‘ভয়েস অফ জার্মানি’-তে খেপ মারা শুরু করি। খুচরো কাজ শুরু করি, অনুবাদশুরু করি, পাঠ করা শুরু করি। ফলে সেই সময় বাংলাদেশের সহকর্মীদের সঙ্গে আলাপ হল। এই প্রথম আমি বাংলাদেশের মানুষের সান্নিধ্যে এলাম। এবং এঁদেরই মাধ্যমে আমি বাংলাদেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানতে পারলাম। আল মাহমুদের কবিতা, শামসুর রাহমানের কবিতা, তেমনি আরও অনেকে… এই মুহূর্তে নাম মনে পড়ছে না… হাসান আজিজুল হকের লেখা… আবুল হাসান, কবি, অল্প বয়সে মারা গেলেন, চমৎকার কবি।
বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে বোধহয় ভাষার সম্পর্কটা আরও বেশি নিবিড়। আমাদের এখানে কিছুই নেই।মায়া হয়। এক জাতি এখনও হিন্দু আর মুসলমান করে ভাবে এই পশ্চিমবঙ্গে।করুণাও হয়। ভাষাচর্চাটা এখানে হয় না, তা কিন্তু নয়। হয়তো সমান চর্চা হয়। কিন্তু কোথায় যেন সেই চর্চার আনন্দটা নেই। আজকের যে যুবসমাজ, তারা কিন্তু মোটেও পিছিয়ে নেই। অনেকের ধারণা যুবক-যুবতীরা লেখাপড়া করে না— সম্পূর্ণ বাজে কথা। বরং বুড়োরাই পড়ে না। আমি দেখেছি, বেশিরভাগ বুড়ো শেষ হয়ে গেছে। জীবনে কোনও আনন্দ নেই। এটা কিন্তু দুই বাংলাতে এক না। বাংলাদেশের বার্ধক্য আর এখানের বার্ধক্যটা আলাদা।
এই যে বাংলাদেশে একটা অভ্যুত্থান হয়ে গেল, ছুঁড়ে ফেলে দিল কিন্তু। আরেকটা জিনিস খেয়াল করবেন, বাংলাদেশে যখন শেখ হাসিনা বিতাড়িত হলেন, একটা নতুন সরকার গঠন হচ্ছে, অনেকেই… এমনকি বাংলাদেশের লোকেরাও… আমরাও অনেকে ভেবেছিলাম, এই রে, এই বোধহয় ধর্মীয় ষাঁড়গুলোর হাতে গেল। ভোটে কিন্তু হেরে গেল। এখানে দ্যাখো, ভারতে…। এরকম একটা অকাব্যিক দেশ পৃথিবীতে নেই। এবং পশ্চিমবঙ্গও— একটা অকাব্যিক জায়গা।

তন্ময়: বাংলাদেশের কবিতা যদি আমরা একটা সময় পর্যন্ত দেখি, পশ্চিমবঙ্গের সমসাময়িক কবিতার তুলনায়, আপনার কি মনে হয় না, বাংলাদেশের কবিতায় আবেগ বিষয়টির প্রাবল্য বেশি?
সুমন: না এটা আমি মনে করি না। প্রথম কথাটা হচ্ছে ভাষা। আর আবেগ প্রকাশ করার ভাষাটাও তো ধরতে হবে। আমি হ্যা-হ্যা করে চেঁচাতে লাগলাম, তাহলে তো হবে না। ‘গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল কবুল’— এটা জানা চাই তো! ‘তোমার চেয়েও বড়হে শ্যামাঙ্গী শস্যের বিপদ’— একজন পশ্চিমবঙ্গের লেখক দেখাও, যে এটা লিখতে পারে। আমার যে ভাষা, সেই ভাষাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে রেখেছে বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ নয়। কিন্তু ভাষাকে সমপরিমাণ ভালোবাসতে পারে পশ্চিমবঙ্গও— আমার গান নিয়ে যেটুকু চর্চা হয়, মানুষ গান শুনতে এখনও আসে, অনেক টাকা দিয়ে টিকিট কেটে— তারা তো ভাষাটার কাছেও আসে, তাই না? এ থেকেই তো বোঝা যাচ্ছে ভাষাটা কত জরুরি। তাই না?
আমার মনে হয় নানান কারণে, আমরা বাঙালিরা কিন্তু জড়বাদী, ভাববাদী না। আমরা ভাবি আমরা ভাববাদী, কিন্তু আসলে জড়বাদী। আমরা হাতে কিছু চাই। যেমন ধরো কোথাও একটা হরিনাম সংকীর্তন হচ্ছে বা সীতার দুঃখের কাহিনি বলছেন কেউ, লোকে কাঁদছে বসে-বসে, উঠে যাবে না কিন্তু। ফেরার পথে তাকে শালপাতায় মুড়ে বা ভাঁড়ে করে একটু খিচুড়ি দেবে তবে সে যাবে। ওইটা না হলে… অর্থাৎ আমরা যতটা ভাববাদী, প্রায় ততটাই জড়বাদী।
বাংলাদেশ মাঝেমধ্যেই দেখাতে পেরেছে, তার ভাষার জন্য সে জান দিতে তৈরি। আজকে এই মুহূর্তে আমরা সেই জায়গায় পশ্চিমবঙ্গে রয়েছি। আজ, এপ্রিল মাসের গোড়ায়, ২০২৬ সালে, আমাদের দেখানোর সময় এসেছে যে আমাদের ভাষাটা আমাদের কাছে জরুরি। এই ভাষার বিরুদ্ধে যারা, তাদের আমরা সর্বনাশ করব। তাদের মূলোচ্ছেদ করব— এই অঙ্গীকার যদি পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি দেখাতে পারেন, তাহলেই তাঁরা বোঝাতে পারবেন যে বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁরা সমমাত্রায় রয়েছেন।
আরও পড়ুন: পঁচাত্তরে কবীর সুমন : সংগীতের মহাসমুদ্র
তন্ময়: ব্যক্তি কবীর সুমন ও শিল্পী কবীর সুমনকে বাংলা কবিতা এবং বিশ্ব কবিতা কীভাবে গড়ে তুলেছে?
সুমন: বাংলা কবিতা তো বটেই। সমর সেন আমার যৌবনের কাব্যগুরু। পরে ওঁর খুব কাছাকাছি আসার সুযোগ পেয়েছিলাম। ওঁর পত্রিকায় লিখতামও—‘ফ্রন্টিয়ার’-এ। ওঁকে একদিন আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আপনি আর কবিতা লেখেন না কেন? উনি বললেন— আসে না।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে, কবিতা— বিশেষ করে রিলকে। রিলকে কবিতা পড়েছি, তেমনি হাইনে। হাইনে-র চেয়েও বেশি রিলকে। হাইনের লিরিক লিরিকাল কোয়ালিটি উল্লেখযোগ্য নিশ্চয়ই। কিন্তু অন্যদিকে ওয়াল্ট হুইটম্যানের কবিতা— আবিশ্ব। বিশ্বকবি যদি কাউকে বলা যায়,তবে ওয়াল্ট হুইটম্যানকেই। ‘I celebrate myself, and sing myself’।এটা আমরা বলতেই পারি না, ভাবতেও পারি না। ‘What I assume you shall assume,/ For every atom belonging to me as good belongs to you.’ এই যে আত্মমর্যাদাবোধ, তা আমাদের নেই। আমরা কান্নাকাটি শুরু করি। ‘I celebrate myself, and sing myself’। তার পাশাপাশি আর একটা লাইন রাখা যায়,পল এলুয়ার লিখছেন— ‘I sing the great joy of singing you.’ এভাবে আমরা প্রেমকে দেখতেই শিখিনি। যাঁকে আমি ভালোবাসি, এই ৭৮ বছর বয়সে, তাঁকে আমি বারে বারে এটা বলতে চাই। সুধীন দত্তের একটা কবিতা আছে, ‘তোমার যোগ্য গান বিরচিব ব’লে’। একটু আগেও তাঁকে আমি বলেছি যে, এখনও পারলাম না তোমার যোগ্য কোনও গান রচনা করতে। একদিন ইনশাল্লাহ আমি পারব। সেদিন আমি বলতে পারব— ‘I sing the great joy of singing you.’ তুমি আজকের যুবক, আমিও আজকের বুড়ো। এই ‘আজকের’-টা কমন ফ্যাক্টর। কিন্তু ‘I sing the great joy of singing you’ শুনলে মনে হয় বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়, রোদ্দুরের মধ্যে। তাই না? এই জায়গাটা নিশ্চয়ই হয়, একাধিক মানুষের অসামান্য লেখাতে। যেমন স্বাগতা দাশগুপ্ত। স্বাগতা আমার বন্ধু, আমার ছাত্রী। কিন্তু ওঁর প্রতিভার সামনে আমি কেঁপে উঠি। ‘আপনার, আপনার’ বলে একটা ছোট্ট কাব্যগ্রন্থ আছে। বাপরে বাপ!
ইউনিভার্সিটিতে যখন পড়ছি, ইউনিভার্সিটির দেয়ালে লেখা—‘তোমাকে আমাকে দিচ্ছে নাড়া/ মাও-সে-তুঙের চিন্তাধারা’। এর মধ্যেও তো একটা কবিতা! …বাংলা তো পড়েইছি, ইউরোপীয় সাহিত্যও পড়েছি। আমাদের সময় থ্রি শিলিং সিক্স পেন্স-এর পেঙ্গুইন বইগুলো সাড়ে তিন টাকায় পাওয়া যেত তারপর সাড়ে পাঁচ টাকা ৫০ পয়সায়।
তন্ময়: বিভিন্ন জায়গায় আপনি স্বাগতা দাশগুপ্তের কথা একাধিকবার বলেছেন, আপনার প্রিয় কবি হিসেবে। নব্বইয়ের দশক বা তার পরবর্তী সময়ে স্বাগতা দাশগুপ্ত ছাড়া ছাড়া আর কোন কবি আপনাকে ভাবিয়েছে?
সুমন: আমি নাম ভীষণ ভুলে যাই, আমাকে ক্ষমা করো। একজন আছেন, পদবি মুখোপাধ্যায়। নামটা মনে পড়ছে না। আই অ্যাম সরি, ওঁর নামটা মনে রাখা উচিত ছিল। অসামান্য কবি। আমার মনে আছে, তখন কলেজে পড়ি, এক দিদি ছিলেন আমাদের, নামটা ভুলে গেছি। ধরো ওঁর নাম অতসী। আমরা সেই দিদির ফ্যান ছিলাম। আমি তখন ফার্স্ট ইয়ারে ইংরেজি পড়ছিলাম,আর সেই দিদি বাংলা পড়তেন, এমএ। দিদির লেখা লিটল ম্যাগাজিনে বেরোত, আমি সেগুলো পড়তাম। দস্তুরমতো সিঁড়ির ধারে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পড়তাম। এক জায়গায় দিদির একটা কবিতায় ছিল— ‘অতীন, তুমিরাজি, বলো রাজি।’ হে ভগবান! এই একটা কথা, নিশানের মতো উঠে গেল। ‘অতীন, তুমি রাজি, বলো রাজি।’ সেই দিদি এখন কোথায় আমি জানি না, তিনি কি কোনোদিন জানতে পারবেন, তাঁর ভাইটা বুড়ো হয়ে গেছে, তার এটা স্মরণে রয়েছে। কাজেই অনেক সময় একেকটা উচ্চারণ বেরিয়ে আসে। কোথায় বেরোচ্ছে টের পাই না, হঠাৎ সেটা নজরে আসে।
তন্ময়: আপনি যাদের কথা বললেন, বাংলা বা পাশ্চাত্যের, তাঁদের বাইরে হাফিজ, রুমি, গালিব এঁরা কি আপনাকে প্রভাবিত করেছিল?
সুমন: রুমি, রুমি। গালিব। হাফিজ খুব বেশি। রুমি আর হাফিজ। সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের একটা বই ছিল, ‘হাফিজের কবিতা’। আমার ভীষণ প্রিয়। আমার একটা গান আছে— ‘তুমি ছিলে হাফিজের প্রথম প্রেমিকা/ তুমি ছিলে পুরুষের বুদ্ধি হারানো’। এই যে জিনিসটা, এই পুরুষের বুদ্ধি হারানো, এটা কিন্তু খুব হাফিজ গালিবের জায়গা। ‘কাব্য সংকলন বৃথা চয়নিকা/ কবিতা অসার কত তুমিই তো জানো’। ভাবনার এই ভঙ্গিটা খুব পারসিক।
তন্ময়: এই কথার সূত্র ধরেই আমার পরের প্রশ্ন, আপনি তো সুকুমার রায়কে নিয়ে লিখেইছেন, অরুণ মিত্রকে নিয়েও গান আছে আপনার। শক্তি চট্টোপাধ্যায়, জয় গোস্বামীকে নিয়ে আছে, এমনকি ‘ফুলমণি ইসরাত’ গানে সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের প্রসঙ্গ এল— ‘তুমি কি পড়েছ সুভাষ কবিতা মেয়ে কবে গেলে বনে’। এই কবিরা আপনাকে কীভাবে প্রভাবিত করেছিলেন বা আপনার পাঠকসত্তাকে কোন তাগিদ দিয়েছিলেন যে এঁরা গানের বিষয় হয়ে উঠলেন?
সুমন: দেখছি, তুমি শুনেছ আমার গান। এবার, ওঁরা কীভাবে গানের বিষয় হয়ে উঠলেন? একটা মুহূর্ত তো জন্ম দেয়। সেই মুহূর্তটা তৈরি হয় আরও কিছু মুহূর্ত থেকে। সেই আরও কিছু মুহূর্তগুলো কবিতার মুহূর্ত। পাঠ চলাকালীন অথবা স্মৃতি রোমন্থনে উঠে আসা। অনেকসময় একটা ধ্বনি… সেই ধ্বনিটা… যেমন ‘ফুল ফুটুক না ফুটুক আজ বসন্ত’। এই ধ্বনিটাই তো মাতোয়ারা, মাতিয়ে দিল। তাই না? আমার জীবনে ধ্বনির খুব বড়ো জায়গা।

তন্ময়: আপনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিভিন্ন কবির কবিতা উদ্ধৃত করেছেন। কখনও আল মাহমুদ—‘আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন’, কখনও আবার অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত— ‘আমি যত গ্রাম দেখি মনে হয় মায়ের শৈশব’। এই পঙক্তিগুলো আপনি যখন অনুষ্ঠানে বলেন, তার সূত্র ধরে পরবর্তী গান আসে। কোথাও গিয়ে মনে হয়, কবিতা আর গানের মধ্যে আপনি সেতু সংযোগ করছেন। এই সেতু সংযোগকারী ভূমিকা হিসেবে কবিতাগুলো কি আপনার মুহূর্তের মনে হওয়া? নাকি প্রস্তুতির ফসল?
সুমন: মুহূর্ত। আমি বেঁচেই যাচ্ছি মুহূর্ত নিয়ে। আমার মাথায় আগে থেকে কোনো প্ল্যানিং থাকে না।
তন্ময়: আমরা কবিতার ক্ষেত্রে যেটুকু শিখেছি বা বুঝেছি, বাক্য ও শব্দের ওপর দখল এবং দিনের শেষে নিয়ন্ত্রণবোধ এই ব্যাপারটা কবিতার ক্ষেত্রে প্রচণ্ড গুরুত্বপূর্ণ। আপনার গানের কথার ক্ষেত্রেও দেখি যে, শব্দব্যবহার খুব লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। দুটো উদাহরণ দিচ্ছি। একটা হচ্ছে ‘ক্যাকটাস তুমি কেঁদো না’-র পঙক্তি— তাঁর ধ্যানস্থ রক্তে চরাচর নতজানু’— এখানে ‘ধ্যানস্থ’ শব্দটার উপস্থিতি। আরেকটা গান ‘পাড়ার ছোট্ট পার্ক’, যেখানেপ্রথমে বলছেন— ‘মহাকালে এসে বসেছে সেখানে আহত প্রেমিক সেজে’, পরের বাক্যেই তা হয়ে যাচ্ছে ‘একা চ্যাপলিন সেজে’। এমন বহু উদাহরণ তুলে ধরা যায়। এই শব্দব্যবহার বা বাক্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ অতুলনীয়। আমার বলাটা ধৃষ্টতা, কিন্তু অনেক গীতিকারের ক্ষেত্রেই দেখেছি বাক্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না, রাশ আলগা হয়ে যায়। সেখানে আপনি একের পর এক গানে দীর্ঘদিন ধরে যে নিয়ন্ত্রণবোধটা কায়েম রাখতে পেরেছেন, ছন্দ ও শব্দের যুগল ব্যবহার করে, এর উৎস কি কবিতাপাঠ?
সুমন: বোধ। এর উৎস হচ্ছে বোধ এবং সেখানেই সুকুমার রায়ের ভূমিকা। ‘আদিম কালের চাঁদিম হিম,/ তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম।’ আমি যখন এটা পড়ছি ছোটবেলায়, আসন্ন মৃত্যুকে ভাবতে পারছি নাকি! আজ আমি মৃত্যুকে কাছে পাই। আমার সমস্ত বন্ধুরা কিন্তু নবীন। নবীন মানে আমার চেয়ে বয়সে অনেক ছোট। এঁরা প্রচণ্ড রেগে যান যখন আমি মৃত্যুর কথা বলি। এঁদের বোঝাতে পারি না, মৃত্যু হচ্ছে আমার খুব কাছের। তাকে আমি দেখতে পাই, তার গন্ধ পাই। তেমনি আমি ছন্দের গন্ধ পাই। ছন্দ যে বোঝে না… বিষয়টা হল মিটার। আমায় সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় একটা অপূর্ব কথা বলেছিলেন যে, ‘সুমন, তোমার গানের মিটার…’। এই মিটার কথাটা আমি কার কাছে শুনছি? খোদ সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের কাছে। যদিও রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় বলছেন, ‘গানের কথা আর কবিতার কথা এক তুলাদণ্ডে বিচার করা উচিত নহে। কবিতার কথা পড়িবার জন্য, গানের কথা শুনিবার জন্য।’(iv) কিন্তু আমার কথা হচ্ছে, দুটোরই কথা ভাবিবার জন্য। ধরো ওই গানটা, ‘মুক্তির মন্দির সোপানতলে’, কার লেখা বলো তো, বুড়ো বয়সে ভুলে যাচ্ছি। কী চৌধুরী…
তন্ময়: মোহিনী চৌধুরী?
সুমন: ঠিক। মোহিনী চৌধুরী। ওই মোহিনী চৌধুরীর গানে গুরুচণ্ডালী ছিল না। সলিল চৌধুরীর ভর্তি গুরুচণ্ডালী। ‘মোর মানসী কলসী কাঁখেতে লইয়া’— ধ্যাৎ। তারপর অমিয় দাশগুপ্ত নামে একজন আর একজন হচ্ছেন মুকুল দত্ত। ‘এ যদি আকাশ হয় তোমায় কী বলে আমি ডাকব।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আমার জিজ্ঞাসা থাকত যে, আপনি ‘এসেছ প্রেম এসেছ আজ কি মহাসমারোহে/ বিরস দিন বিরল কাজ প্রবল বিদ্রোহে’— এইরকম একটা লাইন লেখার পর ‘একেলা রই’ কেন লিখলেন? ‘একলা রই’ কেন লিখলেন না? ‘ভাঙিলে দ্বার’— কেন? স্যার, ‘ভাঙলে দ্বার’ কেন নয়?।
তন্ময়: আমি আপনাকে যদি বলি, ব্যক্তি-র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কবীর সুমনের গানের কথা দেখতে, আপনি কি নিরপেক্ষভাবে কখনও তা ভেবেছেন? কী বিশ্লেষণ করবেন তার?
সুমন: দ্যাখো, আমি আগে কথা লিখি, তারপর সুর দিই। কিন্তু যে-মুহূর্তে সুর দিচ্ছি, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘গলাগলি’… আমার মনে যখন গান এল, কথা-সুর গলাগলি করে এল। সেই গলাগলিটা ঘটে গেল।
তন্ময়: বাংলা কবিতার পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়, আপনার গানের কথাগুলোর সাহিত্যমূল্য যা, তা কবিতার সমতুল্য হওয়ার যোগ্য। আমি যে উদাহরণগুলো বললাম, শব্দ ব্যবহার বা ইত্যাদি, লিরিকে এই নৈপুণ্যগুলো কিন্তু আমরা অন্যদের গানে দেখি না ততটা।
সুমন: সেটা তাদের সমস্যা। সম্ভব হয় না অশিক্ষিত বলে। কথাটা হচ্ছে, যে পারে না সে অক্ষম। অক্ষমতার আবার অজুহাত কী! আমি গান লিখছি, পারছি না। ব্যর্থ হলাম, ধ্যাড়ালাম। ধরো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আমার জিজ্ঞাসা থাকত যে, আপনি ‘এসেছ প্রেম এসেছ আজ কি মহাসমারোহে/ বিরস দিন বিরল কাজ প্রবল বিদ্রোহে’— এইরকম একটা লাইন লেখার পর ‘একেলা রই’ কেন লিখলেন? ‘একলা রই’ কেন লিখলেন না? ‘ভাঙিলে দ্বার’— কেন? স্যার, ‘ভাঙলে দ্বার’ কেন নয়?। আপনার নাম পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় হলে বা সলিল চৌধুরী হলে আমি জিজ্ঞেস করতাম না। কারণ ওঁদের কাছে আমার কোনও জিজ্ঞাসাই নেই। আপনার কাছে আছে। রবীন্দ্রনাথ আধুনিকতাটাকে রাখছেন না কেন? অভ্যেসের জন্য? উনি বলবেন, দ্যাখো কবীর, আমার সময়ে এটা চলত। তুমি প্রশ্ন তুলছ, সংগত প্রশ্ন, কিন্তু আমার সময়ে এটা চলত, তাই লিখলাম। সলিল চৌধুরীর সময়ে তো চলত না। উনি লিখলেন কেন? পারলেন না বলে। আমি ওঁকে জিজ্ঞেস করেছি, বললেন, ‘দ্যাখ, তোর মতো কেউ তো এই প্রশ্নটাই করেনি আমার কাছে।’
তন্ময়: কবি রাহুল পুরকায়স্থের সঙ্গে আমার বেশ ভালো পরিচয় ছিল। ওঁর মুখে আপনার অনেক গল্প শুনেছি। ওঁর যে স্মরণ অনুষ্ঠান হয়েছিল বেলঘরিয়ায়, সেখানে আপনি উপস্থিতও ছিলেন। বন্ধু রাহুল পুরকায়স্থ ও কবি রাহুল পুরকায়স্থ আপনার কাছে কী?
সুমন: এক, এক। যে রাহুল আমার বন্ধু, সেই রাহুলই কবিতা লিখত। ‘অতর্কিত পাখি, নিরুদ্দেশে চল’। একটা কবিতা লিখেছিল, ওটা দিয়ে আমি নন্দ্ রাগের ওপর একটা বন্দিশ বানিয়েছিলাম। তারপরের দুটো লাইন আমি নিজে লিখেছি, সেটা ভুলে গেছি, কিন্তু আরম্ভই হয়েছে ‘অতর্কিত পাখি, নিরুদ্দেশে চল’। বন্ধু রাহুল একদিন আমাকে এটা বলে পাঠালেন— ‘কবীরদা, দ্যাখো তো এটা!’ দুজনে এক।
তন্ময়: কবিতা বা গান ইত্যাদি রচনা কি সবসময়ই অবচেতন থেকে উঠে আসে, নাকি পরিস্থিতির সঙ্গে আপোস করেও লেখা যায়?
সুমন: আপোস কথাটা কেন বললে বলো তো?
তন্ময়: কারণ, অনেক সময় কবিতার ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি যে, বাণিজ্যিক বা অন্যান্য কারণে ‘ফরমায়েশি কবিতা’ বলে একটি বিষয় উঠে আসে, যেটি হয়তো স্বতঃস্ফূর্ত নয়।
সুমন: এই প্রশ্নটা অবান্তর। কে যে কাকে ফরমায়েশ করে আমি জানি না, আমায় কিন্তু কেউ বলেনি যে, কবীর, তুমি এরকম একটা গান লেখো তো যেখানে ধরো— আমার বাবার নাম আর আমার ঠাকুরদার নাম প্রত্যেকে…
তন্ময়: না, এরকম ডাইরেক্ট না। আমি বলতে চাইছি, বিষয়ভিত্তিক…
সুমন: ধরো ফিল্মের কাজ করছি, তখন তো করতেই হয়। পরিস্থিতির ওপর গান লিখতে হয়। আপোস কেন হতে যাবে? তুমি যদি মাংসের কোরমা রাঁধো, সেটা কি আপোস? সবসময় কি রেজালা করতেই হবে? তা তো না। ফর্মটা তো আপোস না।
‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ উপন্যাসের কাহিনিটা কি আমরা সুনীলে পাই? সমরেশ বসুতেও তো পাই না। আবার সমরেশ বসুর বিশেষ বিশেষ লেখায় যা পাই, তা তো ওখানে আবার পাই না। ‘জাগরী’-তে যে যে গল্পটা পাচ্ছি, সেটা পৃথিবীর কটা জায়গায় আছে!
তন্ময়: সেখানে কি স্কিল ও মেধা একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে?
সুমন: সবটাই স্কিল। এভরিথিং ইজ স্কিল, নাথিং এলস। স্কিল না থাকলে ওই জিনিস হয়, যা হচ্ছে।
তন্ময়: আমি কবিতার ক্ষেত্রে বলছি, ধরুন একজন কবি স্কিল দিয়ে কি একটা লেখাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে পারেন? যদি লেখার ভেতরে সারবত্তা নাও থাকে, কোথাও গিয়ে স্কিলটা কি একজনকে অনেকটা মাইলেজ দিতে পারে?
সুমন: স্কিলই তো সব করে। সবটাই তো স্কিল। মানে হাউ ডু ইউ ডিফারেনশিয়েট বিটুইন স্কিল অ্যান্ড নো স্কিল? যার স্কিল নেই, সে পারবে না। দ্যাখো, আলাদা করে কাব্য প্রতিভা কোথায় লুকিয়ে আছে আমি দেখতে যাইনি। কিন্তু যখন ‘পৃথিবীর সব ঘুঘু ডাকিতেছে হিজলের বনে;/ পৃথিবীর সব রূপ লেগে আছে ঘাসে;/ পৃথিবীর সব প্রেম আমাদের দু-জনার মনে;/ আকাশ ছড়ায়ে আছে শান্তি হয়ে আকাশে আকাশে।’— এর যে কাব্যটা, এর যে উচ্চারণের ভেতরে উচ্চারণ, সেটা বার বার ফিরে আসছে। একটু আগেও, আমি যাঁকে ভালোবাসি, তাঁকে বোঝাতে পারছিলাম না কীভাবে তাঁকে আমি ভালোবাসি। আমার জীবন শেষ হয়ে আসবে। আমি আবার জন্মাব। শুধু তাঁর জন্যে জন্মাব। কী করে বোঝাব এটা!
তেমনি, স্কিল যদি না থাকে, তবে ওই লেখাটাই হত না। পুরো লেখাটাই স্কিল।এই স্কিলের মধ্যে রয়েছে, কী নিয়ে স্কিল। একজন কামার একটা লোহা পিটিয়ে দা করছেন বা শাবল করছেন। স্কিলের ওপরে সেটা নির্ভর করে। এবং কী রূপ দিতে চাইছেন, সেই রূপটা দেন। স্কিল না থাকলে তো দিতে পারবেন না।
তন্ময়: অনেকসময় এই তর্কটা ওঠে যে, বাংলা কবিতা কি আন্তর্জাতিক মানের? কেউ কেউ বলেন সমতুল্য, কেউ আবার বলেন, বাংলা কবিতা পিছিয়ে আছে। প্রায় ৬০ বছরের ওপর আপনার যে-পাঠকসত্তা, সেখানথেকে দাঁড়িয়ে কী মনে হয়?
সুমন: কিছু আসে-যায় না। আমি এভাবে ভাবিই না। আন্তর্জাতিক বলতে কী বোঝায়! বাংলাটাও তো আন্তর্জাতিকতার মধ্যেই পড়ে। এখন যদি বলো ইউরোপীয় কবিতার সঙ্গে তুলনা… অনেকসময় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির তারতম্যের জন্য অনেককিছু হয়। আমরা কি সেভাবে উপন্যাস লিখতে পেরেছি, যেভাবে তলস্তয় লিখেছেন বা জন স্টেইনবেক লিখেছেন— সেরম কিছু তো নেই। ‘ঢোঁড়াই চরিত মানস’ উপন্যাসের কাহিনিটা কি আমরা সুনীলে পাই? সমরেশ বসুতেও তো পাই না। আবার সমরেশ বসুর বিশেষ বিশেষ লেখায় যা পাই, তা তো ওখানে আবার পাই না। ‘জাগরী’-তে যে যে গল্পটা পাচ্ছি, সেটা পৃথিবীর কটা জায়গায় আছে!
তন্ময়: কবিতা আপনার কাছে কী?
সুমন: কবিতা। তার বেশি কিছু না।
তন্ময়: আপনি কি এখনও নিয়মিত কবিতা পাঠের মধ্যে আছেন?
সুমন: না। ছাত্রজীবনে ভীষণ কবিতা পড়তাম। এখন কোনও কোনও কবিতা হাতে আসলে তখন পড়ি। কিন্তু আলাদাভাবে তো পত্রিকা রাখি না। দেশ পত্রিকা রাখি না। লিটল ম্যাগাজিন তেমন হাতে আসে না। ফলে পড়া হয় না।

কবীর সুমনের সঙ্গে তন্ময় ভট্টাচার্য
__________________
i মূল লাইনটি— ‘চাঁদ বুঝি ডুবে গেল?- গব্ গব্ গ-বাস!’
ii মূল লেখায়— ‘মালপোয়া আধখানা’
iii সুমনের মূল গানটিতে ছিল— ‘শব্দ ছোটে নিজের ছন্দে’
iv রবীন্দ্রনাথের মূল উক্তিটি— ‘গানের কবিতা, সাধারণ কবিতার সঙ্গে কেহ যেন এক তুলাদণ্ডে ওজন না করেন। সাধারণ কবিতা পড়িবার জন্য ও সংগীতের কবিতা শুনিবার জন্য।’
__________________
এই সাক্ষাৎকারের মধ্যে-মধ্যে থাকা ছবিগুলি কবীর সুমনের ঘরের বিভিন্ন দৃশ্য ও মুহূর্তের। ছবিগুলি ক্যামেরাবন্দি করেছেন তন্ময় ভট্টাচার্য। সাক্ষাৎকার গ্রহণের তারিখ: ৭ এপ্রিল, ২০২৬।

