হাজার হাজার শ্রমিক-কৃষক বাড়ি ফিরছেন পায়ে হেঁটে
ইতিহাসের ধারাবিবরণীতে মানুষ পাল্টে গেছে বারবার। পাল্টেছে চিন্তা-ভাবনা, বেঁচে থাকা, স্বপ্ন দেখা – টেকনোলজির দুনিয়ায় এসে গোগ্রাসে গিলে নিয়েছে সবকিছু। কিন্তু মানুষের শ্রেণি সংগ্রাম কি পাল্টেছে? প্রত্যেকটা দিন-রাতের সঙ্গে লড়াই? টাইম এবং স্পেসের ব্যবহার বিশ্ব-সংসারে হু হু করে বদলাতে থেকেছে, সেইসঙ্গে বদলে গেছে জীবনযাত্রার সংজ্ঞা। এমতাবস্থায় আমাদের কি একবার হলেও মনে পড়বে না ‘মেঘে ঢাকা তারা’ চলচ্চিত্রের সেই অমোঘ দৃশ্যটির কথা, যেখানে রাতের অন্ধকারে জানলার ধারে কিছুক্ষণ থমকে যাওয়া এক চরিত্র বলে ওঠেন, ‘রাত কত হল? উত্তর মেলে না।’ বিশ্বায়ন আর পুঁজিবাদী সংস্কৃতির গ্রাস আমাদের যেমন নিঃসঙ্গ করেছে, তেমনি শাসক আর শোষকের মধ্যে ঠিক কতখানি দূরত্ব তা বুঝিয়েও দিয়েছে। নাহলে ঋত্বিক ঘটক দেশভাগের যন্ত্রণার ছবি বানাতে বানাতে লিখতেন না, “মানুষ, তোমাকে ভালোবাসি।/ এইভাবে, পৃথিবীর ইতিহাস বারবার বদলে গেছে,/ তবুও মানুষ, সবসময় বেঁচেছে।/ মানুষ, তোমাকে ভালবাসি।”
মানুষ বাঁচে। আনন্দে, যন্ত্রণায়, উচ্ছ্বাসে, অনাহারে – মানুষ বেঁচে যায়। এটাই মানুষের ধর্ম, এটাই মানুষের নিয়তি। দেশভাগের পর কেটে গেছে প্রায় ৭৩টা বছর। শিকড় হারানোর যন্ত্রণার মধ্যে সেই ছোট্ট হাসির চারাগাছটি কীভাবে পুঁতে রাখা যায়, মানুষ জানে। ‘দেশভাগ এবং তৎকালীন ভারত’ বনাম ‘করোনা এবং বর্তমান ভারত’ – পাশাপাশি রেখে আলোচনা করলে একটা শব্দই হয়তো মাথায় আসে আমার আপনার – মানুষ। এখন ২০২০ সালের এপ্রিল মাস। ঠিক কয়েকদিন আগেই আমরা দেখেছি হাজার হাজার শ্রমিক-কৃষক বাড়ি ফিরতে চাওয়ার আকুতি জানিয়েছিলেন। গিজগিজ করছে তাঁদের মাথা। না, আমরা কেউ তাঁদের নাম জানি না। মানচিত্রের বুকে তাঁরা ‘দুঃস্থ খেটে খাওয়া শ্রমিক’, করোনা ভাইরাসের ভয়াবহ প্রকোপে তাঁরা সবাই বাড়ি ফিরছেন – ‘দেশের বাড়ি’। আরেক দেশ থেকে অন্য দেশে। এতদিন তাঁরা জানতেন, উপার্জনের ওই জায়গাটিই আসলে নিজের দেশ। যেখানে খেতে পরতে পান। আরেক দেশে থাকেন স্বজনেরা। বছরের হয়তো ওই তিন চারটে দিন তাঁদের দেখার সুযোগ হয়। আর সারাবছর মালিক যেখানে রাখবেন, সেটাই দেশ। লকডাউনের এই কঠিন পরিস্থিতিতে হঠাৎ তাঁদের বলা হয়েছে, ‘চলে যাও’ কিংবা ‘বাড়ি যাও’। তাঁরা দেশে ফিরতে চাইছেন। কিন্তু বাড়ি? এতদিন যেখানে কাজ করছেন সেটা বাড়ি নয়? বাবুরা লকডাউনের নির্দেশ দেন, কিন্তু কীভাবে তাঁরা বাড়ি ফিরবেন তা বলে দেন না। অতএব হাঁটা। ২০০ মাইল, ৫০০ মাইল, ৭০০ মাইল – হাঁটাপথ পৌঁছে দেবে দেশের বাড়িতে। স্বামী-স্ত্রী-দুই বাচ্চা আর একটা পুঁটলি – ১৯৪৭ সাল – দেশভাগ – হঠাৎ ঘোষিত হল দেশ ছাড়তে হবে। করোনা যেন সেই বিস্তৃত কাঁটাতার। রাষ্ট্রের কাছে মানুষ বলি হয় বারবার।
প্রায় পঞ্চাশ হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে বাড়ি ফিরছেন, এইভাবে
ইতিহাস আসলে আমাদের নিজেদের চিনতে শিখিয়েছে। বোঝানোর চেষ্টা করেছে এক থেকে আরেক প্রজন্মে যাওয়ার বিবর্তন। ঘটনাচক্রে আমাদের বেশ কয়েকটি প্রজন্ম স্বচক্ষে এমন মহামারী প্রত্যক্ষ করিনি। ছিয়াত্তরের মন্বন্তর পড়েছি, খাদ্য আন্দোলনের কথা জানি – সবটাই বইয়ের পাতায় কিংবা সিনেপর্দায়। আমাদের কাছে তাই ‘করোনা’ নামক মহামারী প্রবল উদ্বেগের। আমরা ঠিক চিনে উঠতে পারছি না কোলাহলহীন এই বৃহত্তর সমাজটাকে।
প্রত্যেকটা সময়েই বলি হতে হয় কিছু শ্রমজীবী মানুষকে। শরনার্থী মানুষকে। ইতিহাস পাল্টে যায়, কিন্তু সমাজ গড়ার নামে যাবতীয় ‘প্রগতিশীলতা’ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তখন ঋত্বিক ঘটককে অনুসরণ করেই বলতে হয়, ‘তবুও মানুষ, সবসময় বেঁচেছে’। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি ভিডিও ঘুরছে কয়েকদিন ধরে। যেখানে দেখা যাচ্ছে, দিল্লি থেকে বিহার পায়ে হেঁটে ফিরছিলেন প্রায় কয়েকশো শ্রমিক। তিনদিন পর খাবার পেয়েছেন। দুমুঠো ভাত তখন ভেসে যাচ্ছে চোখের জলে। তাঁরা জানেন চোখের জলে ভাত মাখলে তা মহামারীর চেয়েও বিষাক্ত হয়ে ওঠে। করোনার জন্য ভয় যতটুকু, তারও বেশি পেটের জন্য।
আরেকটি ঘটনার দিকে চোখ রাখা যাক। অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর এলাকা। এক দোকানে কাজ করতেন মঞ্চল মনোহর। বাড়িতে স্ত্রী, তিন সন্তান। ছোটো সন্তানটি মারা গেলেন দিন দুয়েক আগেই। সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা হাঁটছেন শ্মশানের উদ্দেশে। এ-ও এক হাঁটা। এরকম আরও অজস্র মুখ ভেসে ওঠে। এই যেমন, বদায়ুঁর একুশ বছরের যুবক অজয় একটি পরিবহন সংস্থায় হেল্পারের কাজ করতেন। জমানো টাকা বলতে কিছুই নেই। ঘরভাড়া দিতে পারবেন না, দিল্লিতে থাকাও সম্ভব নয়। তাই গ্রামে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
আবার মধ্যপ্রদেশের কামতা প্রসাদ অনেক কষ্টে ১০০ টাকা জমিয়েছিলেন। ওই টাকাতেই বাড়ি যাচ্ছেন। গাড়িঘোড়া কিছু পাননি। যতক্ষণ শরীর আছে, হেঁটে যাবেন।
জয় গোস্বামীর একটি কবিতার কথা মনে পড়ছে। দেশভাগের প্রেক্ষাপটে কিছু শরনার্থী মানুষদের নিয়ে তাঁর সেই দীর্ঘ লেখা ‘নন্দর মা’। “সেই কোন দেশে আমরা যাচ্ছিলাম/ কোন দেশ ছেড়ে আমরা যাচ্ছিলাম/ পেরিয়ে পেরিয়ে উুঁচু, নিচু, ঢালু মাঠ/ শিশির ভেজানো কাঁটাতার, গাছপালা/ আলপথে নেমে আমরা যাচ্ছিলাম/ ধানক্ষেত ভেঙে আমরা যাচ্ছিলাম/ ছোট বোন আর মা বাবা, গ্রামের লোক/ তার পাশে আমি…”
দেশভাগ বনাম করোনা – দুটিই মহামারী। একটি ভৌগোলিক আরেকটি ভাইরাস। মধ্যিখানে পড়ে থাকেন অজস্র মানুষ। পরিবারকে নিয়ে অথবা পরিবারের উদ্দেশে তাঁরা যেতে চান ‘দেশের বাড়ি’।