প্রবল নির্যাতন টলাতে পারেনি, আজও কৃষক আন্দোলনের প্রেরণা ইলা মিত্র

ইলার অনূদিত বই ‘হিরোশিমার মেয়ে’ অর্জন করেছিল সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার

নাচোলের রামচন্দ্রপুরে জমিদার মহিমচন্দ্র মিত্রের বাড়িতে এলেন ২০ বছর বয়সী পুত্রবধূ। নাম ইলা। রক্ষণশীল পরিবারের নিয়ম মেনে অন্তঃপুরেই থাকতেন। কিন্তু এভাবে মন টেকে না। বেথুন কলেজের মেধাবী ছাত্রী, অল্প বয়সেই যোগ দিয়েছেন কমিউনিস্ট আন্দোলনে। দু’চোখে সমাজ বদলের স্বপ্ন। কতদিন আর খাঁচায় বন্দি থাকা যায়? শেষ পর্যন্ত অবশ্য মুক্তির খোঁজ মিলল। বাড়ির কাছেই একটি স্কুল খোলা হয়েছিল মেয়েদের জন্য। সেখানে পড়ানো শুরু করলেন ইলা। প্রথমে ছাত্রী ছিল ৩ জন। কয়েক মাস পরেই ৫০ ছাড়িয়ে যায়। এই স্কুলকে কেন্দ্র করেই তিনি সংগ্রামী জীবন শুরু করেন। যোগ দেন তেভাগা আন্দোলনে। পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘নাচোলের রানি’ নামে। 

কলকাতায় জন্মের সময় তাঁর নাম ছিল ইলা সেন। বাবা ইংরেজ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী। আদি নিবাস যশোরের বাগুটিয়া গ্রামে। বেথুন কলেজ থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতক হন ইলা। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এবং মহিলা সমিতির সদস্যপদ লাভ করেছেন এরই মধ্যে। ‘রাওয়াল বিল’ বা ‘হিন্দু কোড বিল’-এর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছেন। খুব ভালো বাস্কেট বল এবং ব্যাডমিন্টন খেলতেন। জাপান অলিম্পিকের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয়ে পড়ায় আর যাওয়া হয়নি। ১৯৪৫ সালে রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। রমেন্দ্রও ছিলেন কমিউনিস্ট। জমিদারি পরিবারের মোহ ত্যাগ করে কৃষকদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।

১৯৪৩ সালে বাংলায় দুর্ভিক্ষ শুরু হলে কৃষকদের ওপর শোষণ আরও বেড়ে যায়। ১৯৪৬-৪৭ সালে ফসলের দুই-তৃতীয়াংশের ওপর অধিকারের দাবিতে তেভাগা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন কৃষকেরা। রাজশাহী জেলা, বিশেষ করে নাচোল অঞ্চলের চাষিদের সংগঠিত করতে থাকেন ইলা মিত্র। হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা রুখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। আদিবাসী কৃষকরা তাঁকে ভাবতেন নিজেদেরই একজন।

ইলা মিত্রও সাঁওতালদের পোশাক পরে পালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রহনপুরে ধরা পড়ে যান গোয়েন্দা পুলিশের হাতে।

দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হল নাচোল। ইলার নেতৃত্বে কৃষক আন্দোলন প্রবল আকার নেয়। ১৯৫০ সালে পাকিস্তান সরকার নাচোলে প্রায় ২ হাজার সেনা পাঠায়। বহু মানুষকে তারা হত্যা করে। কয়েকশো বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। গ্রাম ছেড়ে কৃষকরা পালাতে থাকেন। ইলা মিত্রও সাঁওতালদের পোশাক পরে পালাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু রহনপুরে ধরা পড়ে যান গোয়েন্দা পুলিশের হাতে।  

নাচোল এবং রাজশাহীতে প্রচণ্ড নির্যাতনের শিকার হন ইলা। রাজশাহী আদালতে জবানবন্দিতে তিনি বলেছিলেন, “কেসটির ব্যাপারে আমি কিছু জানি না। বিগত ০৭/০১/১৯৫০ তারিখে আমি রহনপুরে গ্রেফতার হই এবং পরদিন আমাকে নাচোল নিয়ে যাওয়া হয়। যাওয়ার পথে পুলিশ আমাকে মারধর করে এবং তারপর আমাকে একটা সেলের মধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। পুলিশ হত্যাকাণ্ডের সম্পর্কে সবকিছু স্বীকার না করলে আমাকে উলঙ্গ করে দেওয়া হবে বলে এসআই আমাকে হুমকি দেখায়। আমার যেহেতু বলার মত কিছু ছিল না, কাজেই তারা আমার সমস্ত কাপড়-চোপড় খুলে নেয় এবং সম্পূর্ণ উলঙ্গভাবে সেলের মধ্যে আমাকে বন্দি করে রাখে। আমাকে কোনো খাবার দেওয়া হয়নি, এক বিন্দু জলও নয়। সেদিন সন্ধ্যাবেলাতে এসআইয়ের উপস্থিতিতে সেপাইরা তাদের বন্দুকের বাঁট দিয়ে আমার মাথায় আঘাত শুরু করে।…তারা অমানুষিক নির্যাতন চালায়। সেলে চারটে গরম সেদ্ধ ডিম আনার হুকুম দেয়। তারপর চার-পাঁচজন সেপাই আমাকে জোরপূর্বক ধরে চিত করে শুইয়ে দেয় এবং একজন আমার যৌনাঙ্গের ভিতর একটা ডিম ঢুকিয়ে দেয়। আমি আগুনে পুড়ে যাচ্ছিলাম। এরপর অজ্ঞান হয়ে পড়ি। ৯ জানুয়ারি ১৯৫০ সকালে যখন আমার জ্ঞান হয় তখন উপরোক্ত এসআই এবং কয়েকজন সেপাই আমার সেলে এসে তাদের বুট দিয়ে আমাকে চেপে লাথি মারতে শুরু করে। এরপর আমার ডান পায়ের গোড়ালিতে একটা পেরেক ফুটিয়ে দেওয়া হয়। সেই সময় আধাচেতন অবস্থায় পড়ে থেকে আমি এসআইকে বিড়বিড় করে বলতে শুনি, আমরা আবার রাত্রিতে আসছি এবং তুমি যদি স্বীকার না কর তাহলে সিপাইরা একে একে তোমাকে ধর্ষণ করবে। গভীর রাত্রিতে এসআই এবং সেপাইরা ফিরে আসে এবং তারা আবার সেই হুমকি দেয়। কিন্তু যেহেতু তখনো কিছু বলতে রাজি হইনি তখন তিন-চারজন আমাকে ধরে রাখে এবং একজন সেপাই সত্যি সত্যি ধর্ষণ করতে শুরু করে। এর অল্পক্ষণ পরই আমি অজ্ঞান হয়ে পড়ি। পরদিন ১০ জানুয়ারি যখন আমার জ্ঞান ফিরে আসে তখন আমি দেখি যে, আমার দেহ থেকে দারুণভাবে রক্ত ঝরছে এবং কাপড়-চোপড় রক্তে সম্পূর্ণ ভিজে গেছে। এরপর আমাকে নবাবগঞ্জ হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং ২১ জানুয়ারি নবাবগঞ্জ থেকে রাজশাহী কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে এসে সেখানকার জেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।… কোনো অবস্থাতেই আমি পুলিশকে কিছু বলিনি।”

ইলা মিত্রকে তারপর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়। চলতে থাকে নির্যাতন। ইলা প্রায় মরণাপন্ন হয়ে পড়েন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয় তাঁকে। ১৯৫৪ সালের ৫ এপ্রিল যুক্তফ্রন্ট সরকারের ৫ সদস্যের এক কমিটি ইলা মিত্রের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে একটি প্রতিবেদন দাখিল করে। তাতে বলা ছিল, কোনো শর্ত ছাড়া যদি ইলাকে মুক্তি দেওয়া না হয়, তাহলে আর তাঁকে প্রাণে বাঁচানো সম্ভব হবে না। ইলা মিত্রকে দেখতে হাসপাতালে ভিড় করতেন কয়েকশো ছাত্রছাত্রী ও প্রতিবাদী মানুষ। অবশেষে পাকিস্তান সরকার তাঁকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে কলকাতা আসার অনুমতি দেয়। তিনি ভর্তি হন ক্যালকাটা মেডিক্যাল কলেজে। দীর্ঘ ৮ মাসের চিকিৎসায় ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে ওঠেন।

ইলা আর কখনও পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে যাননি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাইভেটে এমএ পাশ করেন। সিটি কলেজের অধ্যাপনায় যোগ দেন। কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে মানিকতলা কেন্দ্র থেকে চারবার নির্বাচিত হন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভায়। রাজনৈতিক কারণে আমাদের দেশেও তাঁকে কয়েকবার জেলবন্দি হতে হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হলে তার পক্ষে জনমত গঠন করতে থাকেন ইলা মিত্র। তাঁর অনূদিত বই ‘হিরোশিমার মেয়ে’ অর্জন করেছিল সোভিয়েত ল্যান্ড নেহরু পুরস্কার।

২০০২ সালে ইলা মিত্র প্রয়াত হন কলকাতায়। আজও তিনি সারা উপমহাদেশে কৃষক আন্দোলনের প্রেরণা।

তথ্যসূত্র – বাংলাদেশ প্রতিদিন, বাংলাদেশ সরকার (নাচোল উপজেলা)

Developed by DXDasia