চারদিকে তাকাও, বই পড়ো, প্রশ্ন করো – ‘আগুনপাখি’ কল্পনা দত্তের স্কুলজীবন

স্কুলের এক শিক্ষিকাই তাঁর চেতনায় বিপ্লবের বীজমন্ত্র বুনে দিয়েছিলেন

১৯২৯ সালের মে মাস। মাস্টারদা সূর্য সেন তখন চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সম্পাদক। চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের উদ্যোগে বিভিন্ন রাজনৈতিক সম্মেলন, যুব সম্মেলন, ছাত্র-ছাত্রী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। নেতৃত্ব দেন মাস্টারদা।মাস্টারদা ও তাঁর সহযোগীদের পরিচালনায় চট্টগ্রাম জেলা রাজনৈতিক সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন নেতাজী। এই সম্মেলনের মাধ্যমেই চট্টগামের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রত্যয়ী হয়ে ওঠে। ঐক্যবদ্ধ হয় চট্টগ্রামের যুব শক্তি। ছাত্র-ছাত্রী সম্মেলনে চট্টগ্রামের ছাত্র সংগঠন ‘অল বেঙ্গল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিপ্লবী অনুশীলন দল দ্বারা প্রভাবিত) ও ‘বেঙ্গল প্রভিন্সিয়াল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (বিপ্লবী যুগান্তর দল দ্বারা প্রভাবিত) একসঙ্গে জোট বেঁধে, জীবন বাজি রেখে দেশমাতৃকার স্বাধীনতার জন্য লড়ে যাওয়ার পণ করে।

এই সম্মেলনগুলোয় ওই সময়ে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করতো। তাদের মধ্যেই দু'জন ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত। স্কুলে পড়তেই রাজনীতি ও বিপ্লবের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রপাত হয় কল্পনার। স্কুলের বইয়ের সঙ্গে পড়তে শুরু করেন ক্ষুদিরাম, কানাইলালের জীবনী, পথের দাবি এগুলির মতো স্বদেশি বই। ধিকি ধিকি আগুন জ্বলতে শুরু করে তাঁর বোধের ভিতর। এর নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁর স্কুলের এক শিক্ষিকা—উষাদি।

অগ্নিযুগের বিপ্লবী আন্দোলনের শুরু থেকে বহু মহিলাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই আন্দোলনের অংশ হয়ে উঠেছিলেন। অনুশীলন, যুগান্তর প্রভৃতি সশস্ত্র বিপ্লবী দলের সঙ্গে 'ঘরের মেয়েরা' যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁরা গোপনে গোপনে ‘বিপ্লবী’ হয়ে উঠেছিলেন; আশ্রয় দিতেন বিপ্লবীদের। অনেকে আবার টাকা-কড়ি, সোনা-গয়না দিয়ে বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। অগ্নিযুগের প্রথম পর্বে স্বর্ণ কুমারী দেবী, সরলা দেবী, আশালতা সেন, সরোজিনী নাইডু, ননী বালা, দুকড়ি বালা, লীলা রায় প্রমুখ দেশপ্রেমিক নারী বিপ্লবী দলে যুক্ত ছিলেন এবং তাঁদেরই উত্তরসূরি হিসেবে, অগ্নিযুগের অগ্নিকন্যা হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী আন্দোলনের ইতিহাসে কল্পনা দত্ত হয়ে উঠেছিলেন অবিস্মরণীয় একটি নাম।

১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই চট্টগ্রামের বোয়ালখালী থানার শ্রীপুর খরণদ্বীপ ইউনিয়নের শান্ত, সবুজ, পাহাড়ঘেরা শ্রীপুরে জন্ম হয় কল্পনার। ছোটবেলা ও ছাত্রজীবন কাটে চট্টগ্রামে। তাঁর দাদু ছিলেন শহরের নামকরা ডাক্তার রায় বাহাদুর দুর্গাদাস দত্ত—পূর্ণেন্দু দস্তিদার। তাঁর প্রাথমিক পড়াশোনার হাতেখড়ি হয় পরিবারেই। প্রাথমিক লেখাপড়া শেষে তাঁকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন তাঁর বাবা। কল্পনা দত্ত প্রীতিলতার এক ক্লাসের ছোট ছিলেন। দুজনেই পড়তেন ডা. খাস্তগীর স্কুলে। এই স্কুলটি ছিল সেই সময়ের অন্যতম নারী শিক্ষালয়। প্রতিটি শ্রেণীতেই প্রথম কিংবা দ্বিতীয় হতেন কল্পনা-প্রীতিলতা, যেকারণে তাঁদের মধ্যে আলাদা করে যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। এমনকি, মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় অঙ্ক ও সংস্কৃতে লেটারসহ চতুর্থ স্থান পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন কল্পনা। ভালো ফলাফল করায় সরকার তাঁর জন্য মাসে ১৫ টাকা বৃত্তির ব্যবস্থা করেছিল।

ছাত্রীদের সঙ্গে প্রায়শই গল্প করতেন ডা. খাস্তগীর স্কুলের শিক্ষিকা উষাদি। দেশ-বিদেশের বিভিন্ন গল্প শোনাতেন। একদিন সেই উষাদিই তাঁর ছাত্রীদের সঙ্গে মাস্টারদা আর অম্বিকা চক্রবর্তীর মামলার কথা নিয়ে আলোচনা করেন। সেই আসরে কল্পনাও ছিলেন। উষাদি হেসে বলেন, দোষ করেছে, মানে ডাকাতি করেছে। অপরাধ করেছে এই কথা তো? কিন্তু দোষ কার? কে শাস্তি দেবে? সেই বিচার কে করবে? এই যে আমাদের স্বদেশ, এখানে আমরা এভাবে আছি কেন? আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষ না খেয়ে থাকে, শিক্ষা পায় না, রোগে ঔষধ পায় না।…

ছোট্ট কল্পনা অবাক হয়ে শুনেছিল শিক্ষিকার বলা কথাগুলো। সেদিন উষাদির করা প্রশ্নগুলো তীরের ফলার মতো বিঁধে গিয়েছিল তাঁর মনে। উষাদির সংস্পর্শে এসেই বিভিন্ন স্বদেশি বই পড়তে শুরু করেছিলেন, গভীর ভাবে বুঝেছিলেন স্বাধীনতার মানে। উষাদি ছিলেন স্বদেশিদের গোপন বিপ্লবী সহযোগী। তিনিই মূলত কল্পনার চেতনায় দেশপ্রেম ও বিপ্লবী রাজনীতির বীজমন্ত্র বুনে দিয়েছিলেন। বাকিটা ইতিহাস।     

সহায়ক গ্রন্থ:

শত বিপ্লবীর কথা, শেখ রফিক

 

 

 

Developed by DXDasia