মহীয়সী স্বাধীনতা সংগ্রামী চারুশীলা দেবী
“স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে কে বাঁচিতে চায়”
পরাধীনতার নাগপাশ থেকে মুক্তি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অত্যাচারী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সহিংস আন্দোলনে নেমে কারাবরণ, দ্বীপান্তর এবং স্বদেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন অনেকে। যাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই পুরুষ স্বাধীনতা সংগ্রামী, যাঁদের নাম ও কাজ বারংবার দেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের আলোচনায় উঠে আসে। তবে শুধুমাত্র পুরুষেরাই নয়, সেই সময় স্বদেশী আন্দোলনে জোয়ারে দেশমাতৃকার শৃঙ্খল মোচনের জন্য নেমে পড়েন অনেক মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামীও। তাঁরা সংখ্যায় কম হলেও দেশের কাঙ্খিত স্বাধীনতা লাভের জন্য অনেকে জেল খেটেছেন, প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন। আসলে সংখ্যাটা অল্প, কেন না, সেই সময়ে সমাজে মেয়েদের জীবনযাপনে অনেক বাধা-নিষেধ ছিল। তারপর রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগরের মতো মহান মণীষীরা সমাজ সংস্কার করবার ফলে নারীরা শিক্ষা, দীক্ষা, সমাজসেবা, দেশের কাজে ক্রমশ রক্ষণশীলতার বিধিনিষেধের বেড়াজাল টপকে বাইরে বেরোতে লাগলেন। দেশের কাজে যেমন কেউ অহিংস আন্দোলনে জড়িয়ে পড়লেন, আবার কেউ কেউ বেছে নিলেন সহিংস আন্দোলনকে, “দেশের জন্য কিছু একটা করব, তাতে প্রাণ বিসর্জন যায় যাক” – এই আদর্শ নিয়ে।
এই সব বীরাঙ্গনা নারীরা তখন ব্রিটিশদের কাছ থেকে গোপন খবরাখবর আনা, পিকেটিং করা, বিপ্লবীদের সুরক্ষিত স্থানে পৌঁছে দেওয়ার জন্য তাঁদের স্ত্রী সাজা, লুকিয়ে অস্ত্র আনা, এবং টাকার প্রয়োজন হলে নিজেদের গয়না পর্যন্ত বিক্রি করে টাকার অভাব মেটানোর কাজ করতেন। স্বদেশী যুগে ননীবালা দেবী, নেলী সেনগুপ্তা, হেমপ্রভা মজুমদার, কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীণা দাসের মতো মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মতো আরেকজনের নাম বিশেষ ভাবে আলোচনা করতে হয়। তিনি হলেন চারুশীলা দেবী যিনি আজও অনেকের বিস্মৃতির আড়ালে রয়ে গেছেন।
‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী’ গ্রন্থে কমলা দাশগুপ্ত জানিয়েছেন চারুশীলা দেবী ১৮৮৩ সালে মেদিনীপুরে জন্মগ্রহণ করেন, পিতা রাখালচন্দ্র অধিকারী মা কুমুদিনী দেবী। তিনি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, চিন্তাবিদ তথা সাহিত্যিক ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের কাছ থেকে।
চারুশীলা দেবীর সঙ্গে অল্প বয়েসের ক্ষুদিরামের সঙ্গে পরিচয় ছিল। ছেলেবেলায় বাবা-মা হারানো ক্ষুদিরামের আশ্রয় নিতে হয়েছিল মেদিনীপুর শহরের কাছে হাবিবপুরে তাঁর দিদির বাড়িতে। সেখানেই চারুশীলা দেবীর সঙ্গে ক্ষুদিরামের পরিচয় হয় এবং বাবা-মা ছাড়া বাচ্চা ক্ষুদিরামকে চারুশীলা খুবই স্নেহ করতেন। এমন সুসম্পর্ক হওয়াতে তাই ক্ষুদিরাম মাঝে মধ্যে চারুশীলা দেবীর বাড়িতে থাকতেন। একদিন ক্ষুদিরাম দেশের জন্য নিজেকে নিবেদিত করবেন এই মনোবাসনা ব্যক্ত করলে চারুশীলা দেবী ক্ষুদিরামকে রক্ততিলক পরিয়ে স্বদেশীর প্রতিজ্ঞা করিয়ে নেন। এরপর ১৯০৫ সালে ক্ষুদিরাম স্বদেশী দলে যোগদান করেন।
ক্ষুদিরাম বসু
১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে একদিন ক্ষুদিরাম ‘বন্দেমাতরম’ লেখা একটি ছোটো বই মেদিনীপুরের পুরনো কেল্লার একটি প্রদর্শনী দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বিলি করছিলেন। পুলিশ সেটা দেখা মাত্র বইগুলো কেড়ে নিলে ক্ষুদিরাম রাগের বশবর্তী হয়ে পুলিশকে মেরে দেন। এই কাণ্ড ঘটবার পরে অল্পবয়সী ক্ষুদিরামকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারের খবর শুনে সেই সময়ে মেদিনীপুরের বিপ্লবীদের কর্মধারার সমর্থক রাজা নরেন্দ্রলাল খান নিজের টাকা খরচ করে ক্ষুদিরামকে মুক্ত করেন। এই ঘটনার দু’বছর পর ১৯০৮ সালে ক্ষুদিরাম যখন মজফফরপুরের ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে যখন হত্যা করতে যান তখন কিছুদিন চারুশীলা দেবীর বাড়ি থাকেন। তারপর কিংসফোর্ড মামলার বিচারের সময় পুলিশ গোপন সূত্রে জানতে পারে, চারুশীলা দেবীর বাড়িতে ক্ষুদিরাম ছিলেন। তখন পুলিশ তাঁর খোঁজ করলে চারুশীলা দেবী বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকেন।
এই ঘটনা ঘটবার কিছুদিন পরই চারুশীলা দেবী হারান স্বামী বীরেন্দ্রকুমার গোস্বামীকে। স্বামীহারা হবার পরও তিনি দেশের সেবাকার্য থেকে সরে আসেননি। ১৯২১ সালে গান্ধিজির নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। গান্ধিজি, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখেরা মেদিনীপুরে যান। সেখানে নারীজাগরণ দেখা দেয়। তাতে সামিল হয়ে চারুশীলা দেবীও দেশের কাজ করার জন্য একটি মহিলা সমিতি গঠন করেন। তারপর সেই মহিলা সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কলকাতায় ট্রেনিং নিতে আসেন। ট্রেনিং শেষ করে আবার তিনি মেদিনীপুরে ফিরে গিয়ে নতুন করে গঠনমূলক কাজে যুক্ত হয়ে যান।
১৯৩০ সালে সারা দেশে লবণ আইন অমান্যের ঢেউ আছড়ে পড়ে। তখন চারুশীলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবী সেই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে নরঘাটে একটি জনসভার আয়োজন করেন। চারুশীলা দেবী যখন বক্তৃতা করছিলেন তখন মেদিনীপুরের ম্যাজিস্ট্রেট পেডি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী নিয়ে সেই সভাস্থলে হাজির হন এবং বলেন, মিটিংস্থলে ১৪৪ ধারা রয়েছে। সুতরাং মিটিং করা যাবে না। জ্যোতির্ময়ী দেবী পুলিশের বাধাকে না মেনে বলেন, “যাঁরা বুকের রক্ত দিতে প্রস্তুত আছেন তাঁরা সভায় এগিয়ে আসুন আর যাঁরা পৃষ্টপ্রদর্শন করবেন তাঁরা ফিরে যান”। এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাবিত্রী নামে ষোড়শী এক তথাকথিত ‘পতিতা’ নারী এসে বলেন “আমি বুকের রক্ত দেবো”। তার পিছনে প্রায় আট শত গ্রামের মেয়ে বৌ কোলে বাচ্চা নিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন মিটিংএ। শপথ নিলেন যে নিজেদের প্রাণ বিসর্জন দিয়ে সভা রক্ষা করবেন। চারুশীলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী দেবীরা কিছু সময়ের মধ্যে সভা শেষ করে লবণ তৈরির ক্ষেত্রের দিকে অগ্রসর হলে পেডি প্রায় ঘণ্টাখানেক তাঁদের উপর লাঠি চালাতে থাকেন।
এরপর চারুশীলা দেবীরা কাঁথি, কালীনগর ইত্যাদি স্থানে গিয়ে সভা করেন এবং আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেবার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। বেআইনি লবণ তৈরির অপরাধে কর্মী ঝাড়েশ্বর মাঝির কারাদণ্ড হয়। তারপর চারুশীলা দেবীরা যখন ঝাড়েশ্বরের বাড়ি যান, সেখানে তাঁর মায়ের মুখে শোনেন যে পুলিশে তাঁদের আটশো মণ ধান নষ্ট করে দিয়েছে। কৃষিজাত সম্পদ আর বাগান সহ চরকা, বাড়ির আসবাবপত্র সব ধ্বংস করে দিয়েছে। মা জানান তবুও ঝাড়েশ্বর দেশের জন্য সভা করবেন। এমন দৃঢ় মানসিকতা তৈরি হওয়ার পেছনে নারী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
এই ঘটনার পর আবার চন্দ্রাকরে গিয়ে চারুশীলা দেবী আরেকটি সভা করেন, সেখানেও পুলিশ তাদের উপর লাঠিচার্জ করে। এরপর পুলিশ চারুশীলার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। সেই সময় তিনি পুলিশের হাতের নাগালে যাতে না পড়েন সেইজন্য কিছুদিন খড়গপুরে চলে আসেন। সেখানে তিনি সত্যাগ্রহীদের জন্য অর্থ সংগ্রহের জন্য শ্রমিক ইউনিয়নের একটি বিশাল জনসভা করেন। সভা থেকে পাঁচশো টাকা এবং গয়না যা কিছু পান সেগুলি নিয়ে কাঁথি রওনা দেন এবং গভীর রাতে কাঁথি পৌঁছে সেই অর্থ ও গয়না তিনি তুলে দেন অন্নদা চৌধুরীর হাতে।
ওই বছরের ৭ আগস্ট যখন তিনি মেদিনীপুর শহরে একটি বেআইনি মিছিল করেন। সেই সময় পুলিশ তাঁকে গ্রেপ্তার করে এবং বিচারে তাঁর ছয় মাস কারাদণ্ড হয়। মুক্তি পাওয়ার পর আবারও ১৯৩১ সালে তাঁকে রাজবন্দি হিসেবে আটক করা হয়। তারপর যখন তিনি ১৯৩২ সালে ছাড়া পান আবারও তিনি আইন অমান্য করেন এবং সেই অপরাধে আবারও দেড় বছরের কারাদণ্ড ভোগ করেন।
মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধি
কারাদণ্ড থেকে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি চলে যান পাবনায়। সেখানেও দেশের জন্য যখন এক সভায় ব্রিটিশ বিরোধী বক্তৃতা দেন। তখনও আবার তাঁকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সেখানে একমাস কারাভোগের পর মুক্তি পেয়ে নিজের শহর মেদিনীপুরে চলে আসেন। মেদিনীপুর-সহ সারা বাংলায় তখন স্বদেশী আন্দোলনের ঢেউ। নানা জায়গায় ইংরেজ কর্মচারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিচ্ছেন বিপ্লবীরা। মেদিনীপুর জেলার ম্যাজিস্ট্রেটকেও ১৯৩৩ সালে বিপ্লবীরা হত্যা করেন। এর ফলে শহরে পুলিশি ধরপাকর জোরদার করা হলে চারুশীলা দেবীকেও ব্রিটিশ সরকার আট বছরের জন্য মেদিনীপুর জেলা থেকে বহিষ্কৃত করে। তিনি পুরী চলে যান আর সেই সুযোগে ব্রিটিশ সরকার পিউনিটিভ পুলিশের ট্যাক্স আদায় করবার জন্য চারুশীলা দেবীর বাড়ি, জমি সব নিলাম করে দেয়।
এরপর ১৯৩৮ সালে ব্রিটিশ সরকার চারুশীলা দেবীর আট বছরের বহিষ্কার তুলে নিলে গৃহহারা হয়ে তিনি কলকাতায় চলে আসেন। রাস্তাঘাটে সাত দিনে ভবঘুরের মতো যখন এদিক ওদিক করছেন, তখন কলকাতা কর্পোরেশনের এডুকেশন অফিসার শৈলেন ঘোষ তাঁকে কর্পোরেশনের স্কুলে শিক্ষিকার কাজ নিতে অনুরোধ করেন। বাধ্য হয়ে তিনি সেই কাজে যুক্ত হলেন। যতদিন শরীর পেরেছিল, তিনি শিক্ষিকার কাজে যুক্ত থেকে দেশের নতুন প্রজন্মে শিক্ষার আলো দিয়েছিলেন। এই মহীয়সী নারী ধীরে ধীরে বিস্মৃতির অন্ধকারে তলিয়ে গিয়েছেন। কিন্তু তাঁদের মতো দেশপ্রেমিকদের আত্মত্যাগ ছাড়া মহান স্বাধীনতা আমরা পেতাম না। আজ স্বাধীনতা দিবসে চারুশীলা দেবীর চরণে রইল শতকোটি প্রণাম।
ঋণ: ‘স্বাধীনতা সংগ্রামে বাংলার নারী’ – কমলা দাশগুপ্ত