হাওড়া জিলা স্কুল : শিক্ষাক্ষেত্রে ১৭৮ বছর ধরে বাংলার গৌরব

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৪৫

রাজ্যের বেশিরভাগ সরকারি স্কুলের মূলধন হলো ঐতিহ্য। এর অন্যতম উদাহরণ হাওড়া জিলা স্কুল। এখনও বাংলা মাধ্যম সরকারি স্কুলগুলির মধ্যে হাওড়া জিলা স্কুলে ছাত্র ভর্তির প্রবণতা উল্লেখযোগ্য। হাওড়া জেলায় এই একটিই সরকারি স্কুল। ঐতিহ্য ও গৌরবকে সঙ্গী করেই সামনের দিকেই এগিয়ে চলেছে ১৭৮ বছর বয়সী এই স্কুল।

স্কুল প্রাঙ্গন

হাওড়া জিলা স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৮৪৫ সালের ১ ডিসেম্বর। ১৮৩৫ সালের দিকে ফারসি ভাষার ব্যবহার বন্ধ হয়ে, শিক্ষার বাহন হলো ইংরেজি। ১৮৫৪ সালে চার্লস উডের ডিসপ্যাচ প্রচারিত হলে ইংরেজি ভাষার একমাত্র প্রাধান্য স্বীকৃত হলো। তখনো হাওড়ার সেতু হয়নি, শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় খেয়া নৌকায় গঙ্গা পার হয়ে কলকাতার উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করা ছোটো ছোটো শিক্ষার্থীর পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই হাওড়াবাসীরা ইংরেজি স্কুলের প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। ১৮৪৫ সালের ১৬ নভেম্বর তারিখে হাওড়ার ম্যাজিস্ট্রেট ১৯০ জন মধ্যবিত্ত হিন্দু অধিবাসীর কাছ থেকে একটি আবেদনপত্র পেলেন, যাতে তাঁরা সরকার পরিচালিত উচ্চ ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন। ইতিপূর্বে অবশ্য ডিরেক্টর অফ ইনস্ট্রাকসন (DPI) দেশীয়দের জন্য ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথা চিন্তা করছিলেন। বড়লাটের নির্দেশ আসে যে, হাওড়া শহরে সরকারি প্রবর্তনায় জেলা স্কুল স্থাপন করতে হবে–জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ককবার্ন সাহেবকে উপযুক্ত ব্যবস্থার জন্য তৎপর হতে বলা হয়। ১৮৮৫, ১ অক্টবর ম্যাজিস্ট্রেট হাওড়া কোর্টের কাছে মাসিক ৬০ টাকা ভাড়ায় একটি বাড়ির ব্যবস্থা করেন। ভর্তির জন্য ২১০টি ছাত্রের আবেদনপত্র পাওয়া গেছিল। ১৮৪৫ সালের ২৬ নভেম্বর প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন দেলানগার্ড এবং দ্বিতীয় শিক্ষক হলেন একজন বাঙালি–ভগবতীচরণ বসু। ১৮৪৫ সালের ১ ডিসেম্বর সরকারিভাবে হাওড়া জেলা স্কুলের জন্ম হয়। তখন বলা হতো হাবড়া গবর্নমেন্ট স্কুল। এই হলো স্কুলের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।ভূদেব মুখোপাধ্যায় ছিলেন এই স্কুলের প্রথম ভারতীয় প্রধান শিক্ষক যিনি হেনরি লুই ভিভিয়ান ডিরোজিওর শিষ্য এবং মাইকেল মধুসূদন দত্তের সহপাঠী ছিলেন। ১৮৮৫ সালে এই স্কুলের ছাত্ররা প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে। মাখনলাল দে, যিনি ১৮৯৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করেছিলেন। এই মাখনলাল দে ১৯৩৮ সালে এই স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসাবে নিযুক্ত হন। স্কুলের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছেন উমেশ চন্দ্র দাস, করুণানিধান বন্দোপাধ্যায়, বিধুভূষণ ভট্টাচার্য, যোগেন চৌধুরী, জয়দীপ সারঙ্গী এবং সাগর সেন। এখনও এই স্কুলটি হাওড়া জেলার একমাত্র সরকারি স্কুল।

হাওড়া জিলা স্কুলের মোট ছয়টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে দুটিকে ঐতিহ্যবাহী ভবন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। স্কুলে সকাল ও দিন বিভাগের জন্য দুটি আলাদা শিক্ষকের কক্ষ রয়েছে। “নতুন হল” এবং “পুরানো হল” নামে দুটি সম্মেলন হল রয়েছে। প্রাথমিক বিভাগ সকালে ও ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির ক্লাস হয় দিবা বিভাগে। স্কুলে পাঁচটি বিষয়ভিত্তিক গবেষণাগার রয়েছে। এগুলি হচ্ছে, রসায়ন গবেষণাগার, পদার্থবিদ্যার পরীক্ষাগার, কম্পিউটার ল্যাবরেটরি, জীববিজ্ঞান পরীক্ষাগার, ভূগোল পরীক্ষাগার, পরিসংখ্যান পরীক্ষাগার।

স্কুলে বর্তমানে ৩৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা রয়েছেন। এর মধ্যে ৬ জন শিক্ষিকা। স্কুলের প্রধান শিক্ষক পদে আমল কুমার শীল অবসর গ্রহণের পর থেকে স্কুলে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। বর্তমানে রাকেন্দু বিকাশ মজুমদার বর্তমানে স্কুলের অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ইন চার্জ হিসেবে দায়িত্ব প্রাপ্ত রয়েছেন। স্থায়ী প্রধান শিক্ষকের পদে কেউ নেই। স্কুলের প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত সমস্ত ক্লাস মিলিয়ে ছাত্র সংখ্যা ১২০০। স্কুলে ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকার পদ অনুমোদিত হলেও ৫০ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা স্কুলে নেই। 

২০১৯ সালে স্কুলের ১৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে পদযাত্রা

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় এই স্কুলের ছাত্ররা ভালো ফল করে। বাংলা মাধ্যম স্কুলে এই মুহূর্তে ছাত্র ভর্তির প্রবণতা হ্রাস পেলেও রাজ্যের ৪২টি সরকারি স্কুলে ছাত্র ভর্তির চাপ যথেষ্ট। সেই দিক থেকে হাওড়া জিলা স্কুলেও ছাত্র ভর্তির চাপ রয়েছে। প্রাথমিক বিভাগে কোনও ছাত্র এই স্কুলে ভর্তি হলে স্বাভাবিক ভাবেই সেই ছাত্র মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে উন্নীত হয়ে যায়।

এই স্কুলের অতীত খুবই গৌরবময়। হাওড়া জিলা স্কুলের প্রাক্তনীদের মধ্যে রয়েছেন স্বনামধন্য অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভারতীয় বিমান বাহিনীর প্রথম এয়ার মার্শাল সুব্রত মুখোপাধ্যায়, বিখ্যাত বাঙালি সাহিত্যিক মণিশঙ্কর মুখোপাধ্যায় ওরফে শংকর, শিক্ষাবিদ-ভাষাবিদ মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অ্যান্ড্রু ইউল অ্যান্ড কোম্পানির চেয়ারম্যান কাম ব্যবস্থাপনা পরিচালক শ্রী দেবাশিস জানা, বিখ্যাত মহিষাসুরমর্দিনী বা মহালয়ার স্ক্রিপ্টের লেখক বাণী কুমার, প্রথম ভারতীয় মিন্ট মাস্টার, ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ মেটালের প্রতিষ্ঠাতা এবং পঞ্চম সভাপতি গণেশ চন্দ্র মিত্তর।  

লাইব্রেরি

বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে সরকারি ভবন রয়েছে যেখানে শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে ৯টি শ্রেণিকক্ষ রয়েছে। এছাড়া সবকটি শ্রেণিকক্ষ ভালো অবস্থায় আছে। স্কুলে অশিক্ষক-কর্মীদের জন্য আরও ২টি কক্ষ রয়েছে। বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের জন্য একটি পৃথক কক্ষ রয়েছে। স্কুলের নিজস্ব খেলার মাঠ আছে। একটি লাইব্রেরি রয়েছে, যেখানে ২ হাজারের বেশি বই রয়েছে। বিদ্যালয়টিতে একটি কম্পিউটার সহায়ক লার্নিং ল্যাবরেটরি রয়েছে। কম্পিউটার ল্যাবে ১৫টি কম্পিউটার রয়েছে এবং সবগুলোই কার্যকর।

তথ্য সূত্র : রাকেন্দু বিকাশ মজুমদার, অ্যাসিস্ট্যান্ট হেডমাস্টার ইন চার্জ, হাওড়া জিলা স্কুল
ছবি: সংগৃহীত  
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia