দুশোর বেশি বয়স হল ঐতিহাসিক এই হলের
একদিকে হাইকোর্ট, অন্যদিকে এজি বেঙ্গল, সামনেই রাজভবন, সেন্ট জন গির্জে, উপরি পাওনা গঙ্গার ফুরফুরে হাওয়া। টাউন হলের অবস্থানটা বেশ চোখে পড়ার মতোই। ব্রিটিশ ক্যালকাটার সবথেকে অভিজাত অঞ্চলে অভিজাত হল। একসময় কলকাতায় ভালোই শীত পড়ত। দীর্ঘ দীর্ঘতর সেসব শীতে গিজগিজে ভিড় বেশ খানিক আরামদায়কও। ১৮০৪ সালের ২১ ডিসেম্বর, এক কনকনে ঠান্ডার দিনে কলকাতার মানুষ ঠিক করল জনসমাবেশের জন্য তাদের একটি হল লাগবেই। না, জনসমাবেশের কারণ অবশ্য শৈত্য নয়। কারণটি সামজিক।
ঘটনাটা হয়েছিল কী, ১৭৯২ সালে ডালহৌসি স্কোয়ারে তো ভেঙে ফেলা হল ওল্ড কোর্ট হাউস। তা ইউরোপীয় মানুষ বা এদেশীয় গণ্যমান্যদের মিলিত হয়ে সভাসমিতি করার জায়গায় টান পড়ল। একটু আমোদ-প্রমোদের জায়গাই নেই পোড়া শহরে। তা একেবারে যে ছিল না, তা নয়। ডেকার্স লেনে ছিল মুরস অ্যাসেম্বলি রুমস, লালবাজারে ছিল হারমোনিক ট্যাভার্ন, সেন্ট জন চার্চের কাছে ছিল রাইটস নিউ ট্যাভার্ন আর লায়ন্স রেঞ্জে ছিল এক্সচেঞ্জ এন্ড পাবলিক রুমস। এইসব জায়গার কোথাও কোথাও অনায়াসে পাঁচশো লোকও ধরে যেত। কিন্তু বাধ সাধল ‘থোরা বড়া সোচো’-র মানসিকতা। যদি কখনো হাজার লোকের সমাবেশ হয়, তাহলে? তাই একটি সুবৃহৎ হলের দাবি খুবই জোরালো হয়ে উঠল।

সেই দাবি থেকেই জন্ম নিল টাউন হল। ১৮১৩ সালে হল নির্মাণ শেষ হয়। ডোরিক স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এই হলটি সম্পূর্ণ হতে সময় নিয়েছিল সাত বছর। লর্ড মিন্টোর জমানা তখন। খরচ হয়েছিল সাত থেকে সাড়ে সাত লক্ষ টাকা। লটারির মাধ্যমে সেই টাকা তোলা হল। এই বিরাট হল নির্মাণ করেছিলেন জন গার্স্টিন। দোতলা এই হলের দুটি তলাতেই আছে ১৬২×৬৫ ফুটের দুটি হলঘর। হাজার লোকের অনায়াস উপবেশন সেখানে৷ দক্ষিণ দিকে রয়েছে সুপ্রসস্থ সিঁড়ি। সেখানে দাঁড়িয়েই নাকি কলকাতার শেরিফ ঘোষণা করেছিলেন ষষ্ঠ জর্জের অভিষেকের কথা। হলের সামনেই রয়েছে অসামান্য একটি গাড়িবারান্দা।
হলের মধ্যে এখন অবশ্য একটি সংগ্রহশালা আছে। পুরাতন ইতিহাস জানান দেবার জন্যে। তবে টাউন হলের একটি অন্যতম আকর্ষণের বিষয় আগেও ছিল, এর ভিতরে নানান মূর্তির সমাবেশ। তার অনেকগুলি অবশ্য সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে। দ্বারকানাথ ঠাকুরের ছোটো ভাই রমানাথ ঠাকুরের মূর্তি থেকে আরম্ভ করে জন পামার, চার্লস বেকেট গ্রিনলের আবক্ষ মূর্তি, প্যারীচাঁদ মিত্র, প্রসন্নকুমার ঠাকুর, রাধাকান্ত দেব, মহারাজা নরেন্দ্রকৃষ্ণ দেবের মূর্তিতে আলোকিত টাউন হল। অতীত যেন সত্যিই কথা বলে এখানে। "for public meetings, dinners, concerts and ball…" এই ছিল টাউন হল নির্মাণের কারণ। একসময় এই হলের এক রাতের ভাড়া ছিল ৮০ টাকা। একাধিক রাত্রি পরপর ভাড়া নিলে ভাড়া কমে আসত ৫০ টাকায়। স্বর্ণযুগ আরকি!
আরো পড়ুন
সিংহদুয়ার এবং আরেকটি মস্ত বাড়ির গল্প
তবে টাউন হলে ইউরোপীয় সাহেবরা শুধু মিলিত হতেন খানাপিনা বা বলড্যান্সের জন্য- এমনটা কিন্তু নয়। এদেশীয় বহু স্বনামখ্যাত মানুষের জমায়েতের জায়গা ছিল টাউন হল। ১৯৩১ সালে রবীন্দ্রনাথের ৭০ বছর উপলক্ষে তাঁকে সম্বর্ধনা জানানো হয়েছিল এখানেই। বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতার স্লোগান উঠেছিল এখান থেকে। ইলবার্ট বিলের বিরোধিতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পক্ষেও জনমত তৈরি হয়েছিল টাউন হলেই। অর্থাৎ ব্রিটিশ সরকারের হেফাজতে তৈরি হলেও বিরুদ্ধতার চাবুক ওঠানোতেও ভূমিকা ছিল এই হলটির। যা আজ হয়তো আর সম্ভব না। এই প্রসঙ্গে মনে হয়, টাউন হলের আজ সপ্রাণ উপস্থিতিটি নেই। এমন জনমত নির্মাণের ক্ষমতা ছিল যার, তাকে সেই চিরন্তন ভূমিকাটি থেকে নির্বাসিত করা হয়েছে। আজ তা শুধু অতীত কাঠামো। ঐতিহ্য নয়, হয়তো।