তোরণ যার পাহারা দিচ্ছে পশুরাজ সিংহ- একার্থে সিংহবাড়িই

খুব চেনা, খুব কাছের জিনিসগুলি ধাঁধাঁয় ফেলে সবচেয়ে বেশি। চেনা, অথচ শেষমেশ কতই যে দূরে থাকে তারা। অবশ্য যার কথা বলতে গিয়ে এমন গৌরচন্দ্রিকা, সে আমাদের অনেকটা অচেনাও। কলকাতার মানুষ তার ঠিকানা জানে। ভৌগোলিক অবস্থান জানে। দূর থেকে সামান্য অবয়ব দেখেই বলতে পারে, এই বাড়ির বাসিন্দা কে! কিন্তু তার অন্দরমহলে ঢুঁ মারা যার-তার কম্ম নয়। কারণ চিরকালই সে বাড়ির চারপাশ ঘোরতর পাহারায় মোড়া। প্রবেশাধিকার পেতে গেলে লাগে বিশেষ অনুমতি। আর নাহলে হতে হয় রাজ্যের বা দেশের ভাগ্যনিয়ন্তাদের কেউ একজন। 

রাজভবনের কথা বলছিলাম আসলে। আজীবন কলকাতায় কাটিয়েও এই ম্যাজেস্টিক বাড়িখানার নাগাল পাওয়া হল না কোনোদিনই। 

রাজভবনের পাশেই ফ্যান্সি লেন। শ্রীপান্থীয় বয়ানে তা আসলে ফাঁসির বিবর্তিত রূপ। এককালে কলকাতায় গাছপালার অভাব ছিল না। অধুনা রাজভবনের কাছে উঁচু-উঁচু ডালপালা মেলা গাছেদের রাজত্বি। ফাঁসির জন্য তা অতি সুবিধেজনক। এমন প্রাকৃতিক উপায়কে কাছে পেয়ে ইংরেজরা কখনোই হাতছাড়া করতে চায়নি। তাই দ্যাখ-না-দ্যাখ ফাঁসিও হত ইংরেজ রাজত্বর প্রথম যুগে। আর গঙ্গার ফুরফুরে, তাজা হাওয়ায় খাবি খেতে খেতে পঞ্চত্ব প্রাপ্তি হত আসামির।

তা সে’সব কিছুকে সাক্ষী রেখেই তৈরি হল জমজমাট রাজভবন। প্রথম রাজভবনটি অবশ্য সুবা বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা ধূলিসাৎ করেছিলেন, ১৭৫৬ সালে। সেই দুঃসাহসের মূল্য চোকাতে হয়েছিল ১৭৫৭-তে। তারপর তো সব চলছিল মোদ্দায়। হেস্টিংসের জমানায় তরতরিয়ে এগোচ্ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্য-তরণী। তা হঠাৎই কলকাতায় অবতীর্ণ হলেন আর্ল অব মনিংটন অর্থাৎ রিচার্ড ওয়েলেসলি। তাঁর কিন্তু মোটেই হেস্টিংসের মতো ‘সাদামাটা’ জীবনযাপন পছন্দ হল না। যথাযথ লাটসাহেবি হচ্ছে না বলে তিনি বারবার মানসিক সমস্যায় পড়ছিলেন। তাই ঠিক করলেন মনের মতো রাজভবন নির্মাণ করবেন তিনি। 

এমনিতে একথা বলে রাখা ভালো যে, কলকাতায় আসা ইস্তক ব্রিটিশবাবুদের বাবুয়ানির রোগ মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। সারবদ্ধ চাকরবাকর, বিলাসবহুল বাড়ি– সবমিলিয়ে নবাবিয়ানার শেষ থাকত না। তা তেমনি রাজকীয় দিন কাটাবেন বলে ওয়েলেসলি সাহেব রাজকীয় রাজভবন নির্মাণে মনোনিবেশ করলেন। নির্মাণের বরাত পেলেন চার্লস ওয়েট নামের এক স্থপতি। হুকুম হল, ডার্বিশায়ারের কেডলস্টন হলের মতো হতে হবে রাজভবনকে। কাজ শুরু হল ১৭৯৯-তে। শেষ হতে ঝাড়া চারটি বছর। ১৮০৩-এ গিয়ে কলকাতা পেল পেল্লায় রাজভবন।

তবে বড়োই দুর্ভাগা ওয়েলেসলি সাহেব। রাজভবন বানাতে একটু নাহয় খরচই করে ফেলেছেন। শুধু বাড়িটি বানাতেই খরচ হয়েছিল আশি হাজার পাউন্ড। তারপর আসবাবে খরচ ১৮০০০ পাউন্ড, আশেপাশের রাস্তা ৩০০০ পাউন্ড ও তার সঙ্গে জমির দরটর মিলিয়ে…  সে একটা ব্যাপার। অগত্যা শাস্তিও পেলেন তিনি। ১৮০৫ সালে তল্পিতল্পা গুটিয়ে স্বদেশ গমন। বড়োই যন্ত্রণার কথা। 

ওয়েলেসলি তো গেলেন। কিন্তু উত্তরসূরিদের জন্য রেখে গেলেন বিলাসিতার সমাহার। যার যার পদার্পণ ঘটল সে বাড়িতে, সেই মনের মতো রূপ দিতে চেষ্টা করে গেল। কার্জন আনলেন গ্রিক নকশাদার পাত্র, বৈদ্যুতিন পাখা। হার্ডিঞ্জ ঢেলে সাজালেন তোরণদ্বার। লর্ড নর্থবুকের আমলে রাজভবনের কলে গরম ও ঠান্ডা জলের ধারা। 

শুধু লাটসাহেবরা নন, লাটগিন্নিদেরও যথেষ্ট ভূমিকা রাজভবনের সাজসজ্জায়। লেডি উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক, লেডি আর্মহার্স্ট, অকল্যান্ডের বোন এমিলি ইডেন, লেডি ক্যানিং- নানান লেডিদের নানান ভূমিকা। আর তাঁদের বদান্যতায় রাজভবনেও জমে উঠত চাঁদনি রাতের মেহফিল। দেদার খানাপিনা শুধু না, হৃদয়ের আদানপ্রদানেও রাজভবন ছিল অন্যতম। 

ইট-পাথর খুঁড়লে নিশ্চয়ই সেসব হাসিকান্নার দিনগুলো আজও উঁকি দিয়ে যাবে। 

সেই বাড়ি,  তোরণ যার পাহারা দিচ্ছে পশুরাজ সিংহ- একার্থে সিংহবাড়িই। যাদের নিত্য আনাগোনা সে চত্বরে, জানা নেই- অতীতের কোনো স্পর্শ তারা পায় কিনা। পেলেও তা কেমন? ফাঁসির মঞ্চ থেকেও কেউ কেউ উঁকি দেয় কি? সিঁধেল চোর কোনো? আমরা ছাপোষা মানুষ। সেসবের অভিজ্ঞতা আমাদের ধর্তব্যে সয় না। তবে, বাসে করে যেতে প্রতিবার ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বাড়িটাকে গিলতে থাকি। আর ভাবতে থাকি, গঙ্গা তখন কাছেই, ভোরবেলা বিউগল বাজছে। চাঁদপাল ঘাটে নামছে নতুন তরণী। আর তা দেখতে এদেশের গরিব জিরজিরে বাসিন্দা জড়ো হয়েছে। সেই মুখগুলো আজও খুব চেনা।

Post Tags
Developed by DXDasia