সিরাজদ্দৌলার ‘হস্তি’ আর ‘উদ্যান’ পরবর্তীতে হয়ে উঠল হাতিবাগান

এই প্রাচীন হাতিবাগান নামটি নিয়ে বেশ কয়েকটি মত শোনা যায়

কবি প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায় একবার বলেছিলেন, প্রত্যেক বাঙালির একটা করে উত্তর কলকাতা আছে। আর উত্তর কলকাতা বলতেই বাগবাজার, শ্যামবাজারের পাশাপাশি চলে আসে ব্যস্ত হাতিবাগানের নাম। কলকাতার এমন একটি অঞ্চল হাতিবাগান, যেখানে সবকিছুর মধ্যে মিশে আছে সাহিত্য এবং বাঙালির প্রজন্মের ধারাবাহিকতার ইতিহাস। আর আছে সিনেমা। হিন্দি-বাংলা-ইংরেজি, হাতিবাগানের অস্তিত্ব জুড়ে একটা আস্ত সিনেমাপাড়া। মাত্র আধ কিলোমিটারের মধ্যে পরপর সিনেমা হল। টকি শো হাউস ফড়িয়াপুকুরে, একটু এগিয়ে এসে বিধান সরণিতে পা রাখলেই একে একে রাস্তার এধারে ওধারে বাস করছে রূপোলি পর্দা। স্টার, দর্পণা, মিত্রা, মিনার, শ্রী, উত্তরা, রাধা, রূপবাণী। স্বপ্নপুরীই বলা চলে। সেইসব স্বপ্নপুরীতে কখনও হাজির দেবানন্দ-ওয়াহিদা, কখনও উত্তম-সুচিত্রা। তাঁদের দেখতে দুপুর থেকে রাত উপচে পড়া ভিড়। বাড়ির গিন্নিরা থেকে অফিসফেরতা বাবু। তারপর দিন চলে গেছে সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে। বন্ধ হয়ে গেছে একের পর এক সিনেমাহল। ইতিহাস থেকে মুছতে থেকেছে এক একজন দর্শকের হাততালির আওয়াজ। আজও দেওয়ালে কান পাতলে শোনা যায় বৈকি!

কলকাতা শহরের এই প্রাচীন হাতিবাগান নামটি নিয়ে বেশ কয়েকটি মত শোনা যায়। বাংলায় হাতি শব্দের অর্থ ‘হস্তি’ আর বাগান মানে ‘উদ্যান’। ১৭৫৬ সালে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজদ্দৌলা যখন কলকাতা আক্রমণ করেছিলেন, সেইসময় নবাবের হাতিগুলিকে এই অঞ্চলের একটি উদ্যানে রাখা হয়েছিল। অন্য মতে আবার এই অঞ্চলে ‘হাতি’ পদবীধারী জনৈক ব্যক্তির একটি বাগানবাড়ি ছিল। সেখান থেকেই হাতিবাগান নামটি এসেছে। মেহতাব চাঁদ মল্লিক পরে সেই বাগানবাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, এই মেহতাব চাঁদ মল্লিকই হাতিবাগান বাজারটি প্রতিষ্ঠা করেন। এখনও যে বাজার রমরমিয়ে চলছে। এখনও এই অঞ্চলে বহু ঐতিহ্যবাহী দোকান দেখতে পাওয়া যায়। সিনেমা শুধুই সিনেমা নয়, তাকে ঘিরে ছিল নানা বাণিজ্যের পশরা। হাতিবাগানের মনোহারি দোকান বা ফুটপাথের হকার, সিনেমাহলে ছবি দেখতে আসা দর্শকেরা ছিলেন ক্রেতা। মাঝদুপুরে ছবি শুরুর আগে গৃহবধূরা টুকটাক গৃহস্থালি বা জামাকাপড়ের দোকানে ঢুঁ মারতেন নিয়ম করে। এখনও শহরের প্রবীণ নাগরিকদের জিজ্ঞাসা করলে জানতে পারা যাবে, তাঁদের ছোটোবেলায় সিনেমা দেখার পরে অবশ্যম্ভাবী বায়না ছিল রাধার পাশে গোপাল মিষ্টান্ন ভান্ডারের লুচি-ডাল কিংবা জোনাকির বা তৃপ্তির ফিস ফ্রাই। অর্থাৎ, সিনেমাপাগল দর্শকরা শুধুমাত্র সিনেমাই নয়, থলিতে ভরে নিতেন দৈনন্দিন সামগ্রী বা প্রসাধনী, পেট পুরে খাওয়া-দাওয়াও সারতেন।

কে একে রাস্তার এধারে ওধারে বাস করছে রূপোলি পর্দা

উনিশ শতকের শেষভাগে নির্মিত স্টার থিয়েটার দীর্ঘদিন নাট্যমঞ্চই ছিল। পরবর্তীতে তা সিনেমাহলের আকার নিয়েছে। গিরিশচন্দ্র ঘোষের একাধিক নাটক এখানে মঞ্চস্থ হয়েছিল। রামকৃষ্ণ পরমহংসও একাধিকবার এই নাট্যমঞ্চে নাটক দেখতে আসেন। বর্তমানে সিনেমাহলে রূপান্তরিত স্টার থিয়েটারে টিকিটের দাম কম হওয়ায় কলকাতার অনেক মানুষ মাল্টিপ্লেক্সের পরিবর্তে এখানেই সিনেমা দেখতে আসেন। হাতিবাগানের শতাব্দীপ্রাচীন বাজারটি বাংলার রেশম ও তাঁতের শাড়ির জন্য বিখ্যাত। ২০১২ সালের ২২ মার্চ একটি অগ্নিকাণ্ডে এই বাজারের একটি বড়ো অংশ পুড়ে যায় বটে, কিন্তু বিক্রেতারা পিছপা হননি। শোনা যায়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি বিমানবাহিনী হাতিবাগানে একটি বোমা ফেলেছিল। কিন্তু সেটি ফাটেনি। তাই কোনোরকম ক্ষতিও হয়নি।

সুসজ্জিত রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকলে একবারও কি ব্রিটিশ জমানার কথা মনে পড়বে না? মনে পড়বে না জমিদারি ব্যবস্থার কথা? একদিকে হেঁদুয়া আরেকদিকে শ্যামবাজার, মধ্যিখানে হাতিবাগান যেন পুরোনো কলকাতাকে ধারণ করে রেখেছে। কিন্তু হাতিবাগানের নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য আজ ভুলতে বসেছে মানুষ। এই ছোট্ট অঞ্চলটি আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু।

Post Tags
Developed by DXDasia