দরদি বঙ্গসন্তানরা কলকাতার বুকে খুলে বসলেন ‘বসাক্‌স্ পুয়োর ফার্মেসী’

বাংলা হরফে লেখা ‘বসাক্‌স্ পুয়োর ফার্মেসী', তার তলায় লেখা ‘স্থাপিত ১৯১৯ সাল’

গর্বের শহর কলকাতা। এই কলকেতার ইতিহাস যত ঘাঁটা হয়, ততই বেরিয়ে আসে মণিমাণিক্য। আহা! সে সব সময়ে টাইমমেশিন চড়ে পাড়ি দিতে মন চায়। শহুরে ফুটপাথ ঘেঁষে হাঁটলে দেখা মেলে কত কত না বলা কথা। ইট-কাঠের পাঁজর বেরিয়ে আছে যেসব দেওয়ালে, আমাদেরও মন চায় হাত রাখি, ছুঁয়ে দেখি। এমন কত কত বাড়িরই তো সন্ধান মেলে না। সামনে থেকে দেখলে মনে হয়, এ আর এমন কী! কিন্তু ইতিহাস জানান দেয়, এটাই এই কলকেতার বৈশিষ্ট্য। যাও, একবার ঘুরে দ্যাখো। নতুন দরজা খুলে যাবে তৎক্ষনাৎ। 

খাস উত্তর কলকাতার কর্নওয়ালিস স্ট্রিট চত্বর। ব্যস্ত রাস্তা। ট্রামলাইন চলে গেছে টানা শ্যামবাজারের দিকে। ওই দিকে নেমে দু-চার পা হাঁটলেই সিমলে পাড়ার নরেন দত্ত’দের বাড়ির সিং দরজা। তারপর আরও দু’পা, পথের মধ্যে একটি গাড়ি বারান্দা বাড়ি। যার নিচে গুটিকয়েক ফুটপাথ বাসীর অস্থায়ী আস্তানা। এমন বাড়িরই জীর্ণ রং ঘষা দেওয়ালের গায়ে আবছা হয়ে যাওয়া সিমেন্ট রিলিফ অক্ষরের একটি নাম নির্দেশ। যা প্রাথমিকভাবে বাড়িটির পরিচয় দেয়। ওতে লেখা বাংলা হরফে ‘বসাক্‌স্ পুয়োর ফার্মেসী', তার তলায় লেখা ‘স্থাপিত ১৯১৯ সাল।’ 

গেটের পাশে বাড়ির কোনও এক ডাক্তার সদস্যের নাম ফলক। জীর্ণতা বাড়িটিকে গ্রাস করেছে সর্বাগ্রে। কিন্তু তার আড়ালের ইতিহাসটি জীর্ণ নয়। একটু ফেরা যাক সে পথে।


সময় দূরত্ব আজ থেকে অনেকটাই, মানে সেই ১৭৬৪। কোম্পানির কর্মকর্তারা তখন বিস্তর ব্যস্ত ভারত শাসনের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপনে। জাহাজের পর জাহাজ তখন ভারতমুখী, তথা বাংলা পানে কম্পাসের দিক নির্দেশ। ভারতে আসার কারণে সঙ্গে আনা হচ্ছে বিলিতি ডাক্তারদের দল। যাদের সার্ভিস পরিচয় হল ‘ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল সার্ভিস’-এর সদস্য ডাক্তার। এদেশের জল হাওয়ায়, রোগ ভোগের থেকে রেহাই পেতে কোম্পানির অফিসার, আমলা আর সেনাদের সঙ্গে আনা হতে লাগল ‘সার্ভিস’ অন্তর্গত ডাক্তারদের। এরপর ১৮২২ পরিষ্কার বোঝা গেল এত এত ডাক্তার বিলেত থেকে আনা সম্ভব নয়। তাই ঠিক করা হল কুড়িজন নেটিভ ডাক্তারকে নেওয়া হবে। এমন কাজটি শুরু হল বাংলার মানচিত্রেই। এই কার্যকারণই পরবর্তীকালের মেডিক্যাল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের গোড়ার কথা। সেই হিসেবে লর্ড বেন্টিঙ্ক-এর ভাবনার ফসল হিসেবে গড়ে উঠল মেডিক্যাল কলেজটি। ইউরোপীয় চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োগ শেখানো শুরু হল এদেশের শিক্ষার্থীদের। প্লেগ, কালাজ্বর, কলেরা, ম্যালেরিয়া-সহ বহুবিধ রোগের সঙ্গে লড়াইতে সেদিন পশ্চিমী পদ্ধতির প্রয়োগ দেশের মানুষের সামনে আশার আলো জাগালো। পাশাপাশি ডাক্তারদের সহায়ক হিসেবে উঠে এল আরেকটি পেশা যাঁদের বলা হয় কম্পাউন্ডার। ফার্মাসি বিদ্যায় দক্ষ এই মানুষগুলি সেদিন বিলিতি চিকিৎসা পদ্ধতি প্রয়োগে দক্ষ ডাক্তারদের যোগ্য সহকারি। ওষুধের কম্পোজিশন, মাপজোক, প্রয়োগ পদ্ধতি, মিক্সচার তৈরির নিয়মকানুন, প্রয়োগের ঘড়ি নির্ধারণ সবই সেদিন ডাক্তারদের মতোই করে চলেছেন কম্পাউন্ডাররা। এই পেশার মানুষদের আজ আর দেখা মেলে না। ধীরে ধীরে দেখা গেল কলকাতার গরিব মানুষেরা অর্থের অভাবে যদি ডাক্তার অবধি পৌঁছাতে নাও পারতেন, তবে দ্বারস্থ হতেন ধন্বন্তরি কম্পাউন্ডারদের। বিশ্বাস ছিল কম্পাউন্ডারবাবুর দুটো পুরিয়াই তার রোগের উপশম ঘটাবে।ওঝা-গুণিন নির্ভর মানুষের জীবনে সেদিন নতুন আলোর আশা। বাংলা তখন দক্ষ কম্পাউন্ডারদের আঁতুড়ঘর।

এমনই কলকাতার কিছু মানুষ সেদিন বুঝলেন যে, কলকাতার গরিব মানুষও ধীরে ধীরে বিলিতি চিকিৎসার দিকে ঝুঁকছে। কিন্তু তাদের সেই সামর্থ্য নেই। এরকম অবস্থাতেই বেশ কিছু বড়ো বাড়ির দরদি সন্তানরা কলকাতার বুকে খুলে বসলেন ‘পুয়োর ফার্মেসী’। অন্তত যেখান থেকে রোগ বুঝে মিলবে ইউরোপীয় পদ্ধতির প্রয়োগিক চিকিৎসা ও ওষুধ। সেরকমই একটি হল এই ‘বসাক্‌স্ পুয়োর ফার্মেসী।’

এ যেন জীর্ণ দেওয়ালের গায়ে দেশ সেবার অঙ্গীকার। এ হল জীর্ণ লেখনীর আড়ালে ওঝা-গুণিন নির্ভর মধ্যযুগীয় চিকিৎসা পন্থা থেকে বেরিয়ে আসার আলোর দিনের গাঁথা। একটি নাম ফলকে এক নয়া মুক্তির ইতিহাস। চোখে ভেসে ওঠে ধুতি, শার্ট পড়া স্বদেশি কম্পাউন্ডারদের আবছা গৌরবের ছবি। যদিও কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে গিয়েছে এই দোকান। 

তথ্যঋণঃ দেবদত্ত গুপ্ত
 

Post Tags
Developed by DXDasia