
একটি কামানে টাটকা কলকাতার বিখ্যাত রাজপরিবারের স্মৃতি
‘ভুবনে কৈলাস-শোভা ভূকৈলাস ধাম
সত্যের আলয় শুদ্ধ সত্য সব নাম,
চারিদিকে কাটাগড় কেমন সুন্দর
খিলানে নির্মিত সেতু, বর্ত্ম পরিসর…’
দীনবন্ধু মিত্রের বর্ণনায় এভাবেই এসেছে ভূকৈলাস রাজবাড়ির গল্প। সাবেক কলকাতা শহরে ‘রাজা’ বা রাজবাড়ি কোনোটারই কমতি ছিল না। এমনকি একই পাড়ায় দু-জন রাজা, দুটো রাজবাড়ি- এমনটাও দেখা যাবে। রাজায়-রাজায় রেষারেষিও কম ছিল না। কলকাতার সেই দিন গেছে। অনেক রাজবাড়ির অবস্থাও কাহিল হয়েছে সময়ের ঝাপটায়। কিন্তু এত ওলটপালট, ভাঙচুরের মধ্যে আজও টিকে আছে ভূকৈলাস রাজবাড়ি। অবশ্য রাজবাড়ি বললে ভুল হবে। মাথা তুলে আছে রাজমন্দির দুটি। খিদিরপুরের বাবুবাজারের কাছে কাঞ্চন কলোনিতে গিয়ে অনেক খোঁজাখুঁজির পর রাজবাড়ির সন্ধান মেলে। অনেক শরিকি ভাগাভাগি তাতে। টিকে আছে পুরোনো কিছু থাম। তা দিয়ে রাজবাড়িকে চিনে নেওয়া যায়।
পুরোনো কলকাতা বলতে কীভাবে যেন আমাদের মাথায় থেকে গেছে উত্তর কলকাতাটাই। সেই দমদম থেকে শুরু করে বাগবাজার, শ্যামবাজার, শোভাবাজার, বউবাজার ঘুরে পার্কস্ট্রিট-ভবানীপুর– পুরোনো কলকাতার মানচিত্রটা আমাদের মগজে এতটুকুই হয়ে আছে। অথচ এটা কিন্তু সঠিক নয়। গঙ্গা বা হুগলি যাই বলি না কেন– তার ধার ঘেঁষে বিস্তৃত হচ্ছিল শহরটি। খিদিরপুর অঞ্চলও ছিল তারই মধ্যে। যার মুখেই রয়েছে বন্দর, সেখানেই নিত্য মুখর ছিল জাহাজের ইঞ্জিনের ঘর্ঘর শব্দ। কোনো অকথিত কারণে খিদিরপুরকে আমরা বাদ দিয়ে দিই যেন।
ভূকৈলাস রাজপরিবারের যাত্রা শুরু জয়নারায়ণ ঘোষালের হাত ধরে। মর্ত্যে তিনি কৈলাসধাম প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তাই ভূ-কৈলাস। এই নামেই রাজবংশটির নামকরণ। অবশ্য ঘোষাল বংশের দাপট তার অনেক আগে থেকেই। আজ যেখানে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ, সেখানে বা তৎসংলগ্ন অঞ্চলে ছিল আগে ঘোষালদের বসতবাটি। সেখানেই ১১৫৯ বঙ্গাব্দে জয়নারায়ণের জন্ম। আদি বাড়ি অবশ্য হাওড়ার বাকসাড়া গ্রামে। দুর্গ হবে বলে গোবিন্দপুরের সেই স্থান তাঁরা ছেড়ে দেয় ইংরেজদের। তখন ‘গভর্নর অব বেঙ্গল’ ছিলেন হ্যারি ভেরেস্ট। রাজা জয়নারায়ণ ঘোষাল তাঁরই দেওয়ান। নিজেদের জমির বিনিময়ে খিদিরপুরে জমি পেলেন তিনি। খিদিরপুর তখন জঙ্গলাকীর্ণ এলাকা। এই খিদিরপুরেই একটি রাজবাড়ি তৈরি করলেন জয়নারায়ণ। প্রতিষ্ঠা করলেন শিব ও কুলদেবীর মন্দির। সেটা ১৭৮১ সাল।

জয়নারায়ণের পিতামহ কন্দর্প ঘোষাল ছিলেন নামকরা নুন-ব্যবসায়ী। পাশাপাশি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মচারীও। পসার জমিয়েছিলেন খুব। তাঁর তিন ছেলে। কৃষ্ণচন্দ্র, গোকুলচন্দ্র এবং রামচন্দ্র। কৃষ্ণচন্দ্র ছিলেন একাধারে ধনবান ও ধর্মবান। ঢের অর্থ করেছিলেন। অন্যদিকে সাধক কবি রামপ্রসাদের সঙ্গেও গভীর সখ্য ছিল তাঁর। খিদিরপুরে পতিতপাবনীর মন্দির নির্মিত হলে তাঁর পুজো করেছিলেন স্বয়ং রামপ্রসাদ।
আরো পড়ুন
সিংহদুয়ার এবং আরেকটি মস্ত বাড়ির গল্প
কৃষ্ণচন্দ্রের ভাইও কম কৃতী নন। গোকুলচন্দ্র ছিলেন গভর্নর ভেরিলস্টের দেওয়ান। মিরজাফর নবাব হওয়ার পর কোম্পানি পলাশির যুদ্ধের ক্ষতিপূরণবাবদ আদায় করেছিল ৭০ লক্ষ টাকা। সেই টাকা যথাযথভাবে ভাগ করার জন্য ১৩ জন কমিশনার নিযুক্ত হয়েছিল। গোকুলচন্দ্র ছিলেন তাদের মধ্যে একজন। ত্রিপুরার রাজা দুর্গামাণিক্য দেবশর্মা বাহাদুরকে দেওয়ানি মামলায় সাহায্য করে একটি গ্রাম পুরস্কার পান। তাও সম্পূর্ণ নিষ্কর।
আর জয়নারায়ণ ছিলেন পণ্ডিত মানুষ। আরবি ফারসি সংস্কৃত বাংলা ইংরেজি- সবেতেই সুদক্ষ। নবাব নাজিম মোবারকউদ্দৌলার নায়েব ছিলেন প্রথম জীবনে। পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির পুলিশ। কাজ করেছিলেন কলকাতা যশোর ঢাকার সুবিস্তৃত অঞ্চলে। সে কাজ এতই ভালো ছিল যে, খোদ হেস্টিংস বাদশাহর কাছ থেকে তাঁকে এনে দিয়েছিলেন সাড়ে তিনহাজারি মনসবদারের সনদ। সেই ঘটনার স্মৃতি রয়ে গেছে একটি কামানে। এসব ছাড়া পেয়েছিলেন ‘মহারাজা বাহাদুর’ খেতাব।

জয়নারায়ণ ছিলেন বেশ জোগাড়ে মানুষ। ত্রিপুরা, ঢাকা, চব্বিশ পরগণার নানা জায়গায় তিনি জমিদারি কিনেছিলেন। খিদিরপুরে কালীবাগান এলাকায় ১০৮ বিঘে নিচু জায়গায় পরিখাবেষ্টিত চমৎকার প্রাসাদ নির্মাণ করান তিনি। তার কাছেই শিবগঙ্গা নামে একটি দিঘি খনন করান। দিঘির পূর্ব পশ্চিম তীরে রক্তকমলেশ্বর আর কৃষ্ণচন্দ্রেশ্বর মন্দির নির্মাণ করান। ধর্মস্থান বলেই হয়তো আজও সে’দুটি রয়ে গেছে।
জয়নারায়ণ বড়ো ভূমিকা রেখেছিলেন এদেশের নানা কাজে। কাশীতে বিদ্যালয় তৈরি, হিন্দু কলেজ তৈরি, মায়ো হাসপাতাল নির্মাণে, অনাথ আশ্রম তৈরিতে– তাঁর বা তাঁর এস্টেটের বড়োসর ভূমিকা ছিল। অর্থাৎ বাংলার বুকে যে নতুন আলোড়ন, তাতে যথেষ্ট প্রভাব ছিল তাঁর।
আর জয়নারায়ণের প্রাসাদটিও যে ছিল নয়নভুলানো তা দীনবন্ধুর লেখাতেই পাওয়া যায়। খিলানে ভরা প্রশস্ত পথ, তার দুধারে বকুল গাছের সারি, গ্রীষ্মের দাবদাহে ‘অতি অনুকূল’… তবে এসব নেহাৎই স্মৃতিচারণ। শরিকি ঝামেলায়, মোকদ্দমায় কোথায় আর রাজবাড়ি? ট্রামডিপোর উল্টোদিকে সরু গলিপথে সে দাঁড়িয়ে। বাস্তবিকই ‘ভূতে’র ভবিতব্য।
ছবিসূত্র:
https://creativecommons.org/licenses/by-sa/4.0/deed.en,
https://commons.wikimedia.org/wiki/Commons:GNU_Free_Documentation_License,_version_1.2
https://commons.wikimedia.org/wiki/Commons:GNU_Free_Documentation_License,_version_1.2
