‘চিত্রনিভা’ নাম রেখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ
রবীন্দ্রনাথ চেয়েছিলেন শান্তিনিকেতন আশ্রম মেয়েদের মুক্তাঙ্গন হয়ে উঠুক। তিনি চেয়েছিলেন রক্ষণশীল অচলায়তনের তোয়াক্কা না করে মেয়েরা সবরকম ভাবে তার স্বাধীনতা অনুভব করুক। শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্পকলা, শরীরচর্চা, খেলাধূলা, বিজ্ঞান –সবদিক থেকেই মেয়েরা যেন পরিপূর্ণতা পায়। মনন ও মেধা দিয়ে গড়ে তোলা ইচ্ছেডানায় উড়ে বেড়াক তারা। শান্তিনিকেতনের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা বুঝতে পারবো রবীন্দ্রনাথের এই আকাঙ্খা বিফলে যায়নি। আমরা যদি শুধুমাত্র একটি বিভাগ, কলাভবন নিয়ে আলোচনা করি, দেখা যাবে প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে একে একে উঠে আসবে সুকুমারী দেবী, চিত্রনিভা চৌধুরী, গৌরী ভঞ্জ (নন্দলাল বসুর কন্যা), রানী চন্দ, ইন্দুলেখা ঘোষ, অনুকণা দাশগুপ্ত, শান্তা দেবী-দের নাম। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী প্রতিমা দেবী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাইঝি, খ্যাতনামা শিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ও গগনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোটো বোন সুনয়নী দেবীও ওই পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ শরিক ছিলেন।
বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত কলাভবনে নারীরা অধ্যাপকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন, যার শুরুটা হয়েছিল নিভাননী দেবী তথা চিত্রনিভা চৌধুরীর (১৯১৩-১৯৯৯) হাত ধরে। তিনিই কলাভবনের প্রথম মহিলা অধ্যাপক। শান্তিনিকেতনে মুক্তবিহঙ্গের মতো নিজেকে বিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন চিত্রনিভা।

এমিল ওটো হপ-এর ক্যামেরায় ধরা পড়েছে বিংশ শতাব্দীর কলাভবন, পাঠ নিচ্ছেন মেয়েরা (ছবিসূত্র : দ্য ট্রাভেলিং আর্কাইভ)
শিল্প নিয়ে এক ধরনের গঠনভিত্তিক লিঙ্গবৈষম্যের কারণে বেশিরভাগ শিল্পআলোচনা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের নাম বাদ পড়ে যায়। বিশেষত মহিলা শিল্পীদের। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত বাঙালি সমাজের, এবং বৃহত্তর ভারতীয় সমাজের, উপরে সুগভীর প্রভাব ফেলেছিল শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক আখর। বহু মহিলা শিল্পী এর অংশীদার। কীভাবে এটা ভারতে নারীবাদের একটি গঠনমূলক পরিপ্রেক্ষিত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, তা নিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ রয়েছে ‘ট্রান্সেন্ডিং দ্য গ্লাস কেস — বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় বাংলায় নারী শিল্পীরা এবং লিঙ্গায়িত দেশজ আধুনিকতা’ নামে ডক্টর অপর্ণা রায় বালিগার বইটিতে। বইটিতে তিনি বিশেষ ভাবে আলো ফেলেছেন চিত্রনিভার ওপর। যে আলো নিভাননীর মধ্যে খুঁজে পেয়েছিল রবীন্দ্রনাথের দূরদর্শীতা।
রবীন্দ্রজন্মশতবর্ষে ২৫ বৈশাখে জোড়াসাঁকোয় রবীন্দ্রকক্ষে আলপনা দিচ্ছেন চিত্রনীভা
শান্তিনিকেতনের শুরুর দিনগুলো থেকেই রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্য পেয়েছেন। কবিও তাকে মেয়ের মতো স্নেহ করতেন। নিভাননীর চিত্রকর্মের প্রতি তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি নিভার শিল্পচর্চার নিয়মিত খোঁজ নিতেন। নিজেও তো সেই সময় ছবি আঁকছেন। ছাত্র থাকাকালীন চিত্রনিভাকে আশ্রমের গন্ডি ছাড়িয়ে ভুবনডাঙার মাঠেঘাটে স্কেচ করে বেড়ানোর অনুমতিও দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চিত্রনিভা চৌধুরী তার ‘স্মৃতিকথা’য় লিখেছেন-
“দেখা হলেই তিনি আমায় বলতেন, ‘তুমি কী কী ছবি আঁকলে? আমায় এনে দেখিও।’ তাই আমি যখন যা ছবি আঁকতাম তাকে দেখাতাম। তিনি দেখে খুব খুশি হয়ে, আমার মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, ‘তোমার শক্তি আছে, তুমি পারবে, আমি আশীর্বাদ করলুম।’ একথাগুলো থেকে আজও আমার সমস্ত কাজে প্রেরণা লাভ করি।”
শিল্প নিয়ে এক ধরনের গঠনভিত্তিক লিঙ্গবৈষম্যের কারণে বেশিরভাগ শিল্পআলোচনা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ শিল্পীদের নাম বাদ পড়ে যায়। বিশেষত মহিলা শিল্পীদের। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার থেকে মধ্যভাগ পর্যন্ত বাঙালি সমাজের, এবং বৃহত্তর ভারতীয় সমাজের, উপরে সুগভীর প্রভাব ফেলেছিল শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক আখর। বহু মহিলা শিল্পী এর অংশীদার।

চিত্রনীভা-লিখিত দুটি বই
নিভাননীর চিত্রকর্ম দেখে মুগ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ নাম রেখেছিলেন ‘চিত্রনিভা’। চিত্রনিভা তাঁর ‘স্মৃতিকথা’ইয় লিখেছেন- “একদিন আমার সব ছবি দেখে খুশি হয়ে, তিনি আমার নাম রেখে দিলেন ‘চিত্রনিভা’। সেই থেকে তিনি আমায় ‘চিত্রনিভা’ বলে ডাকতেন। এবং প্রায়ই তিনি রসিকতা করে আমায় বলতেন, ‘তোমার নামকরণ করলুম। এখন বেশ ঘটা করে আমাদের খাইয়ে দাও।” নাম রাখার জন্যে চিত্রনিভা কখনও কবিগুরুকে খাইয়েছিলেন কি-না তা আমাদের জানা নেই। তবে তিনি এই নামটিই আজীবন সযত্নে-সশ্রদ্ধায় ব্যবহার করেছেন।

বাঁ-দিকে চিত্রনীভার আঁকা ‘রোজ’ ও ডানদিকে উস্তাদ বাবা আলাউদ্দিন খানের প্রতিকৃতি
ভগবানচন্দ্র বসু এবং শরৎকুমারী’র ছোটো মেয়ে নিভাননীর জন্ম ১৯১৩ সালের ২৭ নভেম্বর মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে, মামাবাড়িতে। সাত বছর বয়স থেকে তিনি পিতৃহারা। ছোটবেলা কাটে জিয়াগঞ্জেই। নিভাননী’র মামাবাড়ি ছিল শিল্প ও সংগীতের এক বিপুল চর্চাকেন্দ্র। এখানেই শিল্প ও সংগীতের বীজ অঙ্কুরিত হয় নিভাননীর ভেতর (যা পরে পূর্ণতা পাবে দীনেন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথের ছত্রছায়ায়)। চক ও খড়ির সাহায্যে নানা ধরনের আলপনা আঁকা, সুরকি, কাঠকয়লা, চালের গুড়ো আর শুকনো বেলপাতার গুড়ো মিশিয়ে নানা ধরনের রঙের কাজে মেতে থাকতেন। অল্পবয়স থেকেই কনে সাজানো, বিয়ের তত্ত্ব সাজানোয় পারদর্শী হয়ে উঠেছিলেন। বিয়ের পিড়িতে আলপনা দেওয়ার মাধ্যেমেই ছোট্ট নিভাননীর শিল্পচর্চা শুরু হয়েছিল। চিত্রনিভার বৈবাহিক জীবনের সূচনাও হয়েছিল চাঁদপুরে বিয়ের পিঁড়িতে আঁকা আলপনা শিল্পকলার মাধ্যমেই। এক দিন নোয়াখালির লামচর নিবাসী জমিদার ঈশ্বরচন্দ্র চৌধুরীর জেষ্ঠ্যপুত্র মনোরঞ্জন চৌধুরী, নিভাননীর আঁকা বিয়ের পিঁড়ি দেখে মোহিত হয়ে তৎক্ষণাৎ মেয়েটির খোঁজ করতে থাকেন। ছোট্ট মেয়েটির শিল্প, সঙ্গীত ও কাব্যচর্চায় আগ্রহ যাচাই করে মনোরঞ্জনবাবু ছোটো ভাই নিরঞ্জন চৌধুরীর সঙ্গে বিয়ের দিনক্ষণ ধার্য করে ফেলেন। ফলে মাত্র ১৪ বছর বয়সে ১৯২৭ সালে নিভাননীর বিয়ে হয়। এর পর তাঁর শ্বশুরবাড়ির লোকজনই আটপৌরে গৃহকাজে তাঁকে বেঁধে না রেখে পাঠিয়েছিলেন কবিগুরুর আশ্রমে। মনে রাখতে হবে, তখন ১৯২৮ সাল।
চিত্রনিভা যখন প্রথম শান্তনিকেতনে আসেন তখন ছাত্রীনিবাস ছিল ‘দ্বারিক’। তখন সেখানে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা ছিল। গুরুদেবের ইচ্ছানুসারে তখন মেয়েরা পালা করে ছোট্ট শিশুদের দেখাশোনা করতেন। কিন্তু পরবর্তীতে গুরুদেবের উদ্যোগে ‘শ্রীসদন’ নামে নতুন ছাত্রীনিবাস গড়ে ওঠে। তখন দেশ-বিদেশ থেকে কোনও নতুন মেয়ে শ্রীসদনে এলেই চিত্রনিভা তাঁদের নিয়ে গুরুদেবের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেন। কবিগুরু সবাইকে বলতেন, ‘‘চিত্রনিভা হচ্ছে নূতনের সঙ্গী।’’
চিত্রনীভার স্কেচে রবীন্দ্রনাথ ও রামকিংকরের পোর্ট্রেট
নন্দলাল বসুর প্রিয় ছাত্রী আলপনা আঁকায় সিদ্ধহস্ত হওয়ায় শান্তিনিকেতনের ছেলেমেয়েরা চিত্রনিভাকে ‘আলপনাদি’ নামে ডাকতেন। মহাত্মা গাঁধীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে কেন্দ্রীয় সরকার তাঁকে ডেকে পাঠায় রাজঘাটে গাঁধীমণ্ডপে আলপনা দেওয়ার জন্য। জগদীশচন্দ্র বসু শতবার্ষিকী উপলক্ষেও তাঁকে ডাকা হয়েছিল আলপনা দেওয়ার জন্য। কলাভবনে ১৯৩৪ সালে তাঁর শিল্পশিক্ষা সমাপ্ত হলে কবিগুরু ও নন্দলাল বসুর ইচ্ছানুসারে তিনি ১৯৩৪ সালে কলাভবনে শিল্প-অধ্যাপিকার পদে যোগ দেন। সুখময় মিত্র, দিনকর কৌশিক, নিহাররঞ্জন চৌধুরী, সুকৃতি চক্রবর্তী, শঙ্খ চৌধুরী প্রমুখ প্রখ্যাত শিল্পী ছিলেন তাঁর ছাত্র। ১৯৩৬ সালে এক বছর অধ্যাপনা করার পরে চাকরিজীবন থেকে অব্যাহতি নিয়ে চিত্রনিভাকে ফিরে যেতে হয় লামচরে শ্বশুরবাড়িতে। লামচরে ফিরে গিয়ে গ্রামের মহিলাদের শিল্পশিক্ষার মাধ্যমে স্বনির্ভর করে তোলার ব্যাপারে তিনি উদ্যাগী হয়েছিলেন। বাংলাদেশের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের বিভাগীয় প্রধান জে কে চৌধুরীর বৈঠকখানায় দেওয়াল জুড়ে তিনি একেঁছিলেন প্রথম জয়পুরী রীতির ভিত্তিচিত্রটি। আফসোসের বিষয় দেশভাগের পরে বারবার বাড়িটির মালিকানা হস্তান্তরিত হওয়ার ফলে ভিত্তিচিত্রটির আজ আর কোনও অস্তিত্ব নেই।

কবিকে ঘিরে ‘বসন্ত উৎসব’, শিল্পী- চিত্রনীভা চৌধুরী
নন্দলাল বসুর নেতৃত্বে বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়ের ম্যুরালের কাজে সাহায্য করেছেন, শ্রীসদনের দেওয়ালে ফ্রেস্কো, কলাভবন প্রাঙ্গণে অবস্থিত ‘কালোবাড়ি’র ‘শিবের বিয়ে’ ম্যুরাল নির্মাণে চিত্রনিভার বিশেষ অবদান রয়েছে। চিত্রনিভার বেশিরভাগ চিত্রই জলরং ও প্যাস্টেলে আঁকা। ওয়াশ, প্যাস্টেল, তেলরং, টেম্পেরা, উডকাট, লিনোকাট… প্রায় এক হাজার শিল্পকৃতি। রবীন্দ্রনাথের তো বটেই, প্রতিকৃতি এঁকেছেন দিনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর বেজ, মহাত্মা গাঁধী, জওহরলাল নেহরু-সহ অনেকের। তাঁর আঁকা ‘বসন্ত উৎসব’কে অন্যতম সেরা ছবি বললেও অত্যুক্তি হবে না। ২০২১-এর ২৭ নভেম্বর চিত্রনিভা চৌধুরীর ১০৮তম জন্মদিন উপলক্ষে অ্যাকাডেমি অব ফাইন আর্টসের নর্থ গ্যালারিতে শিল্পীর চিত্রকৃতি ফের দেখার সুযোগ হয়েছিল এই শহরের, শিল্পীকন্যা চিত্রলেখা চৌধুরীর উদ্যোগে। সেই সুযোগ আবার যেন আসে, যাতে এদেশের অসংখ্য চিত্রনিভার মনে অনুরণিত হতে পারে, ‘তোমার শক্তি আছে, তুমি পারবে’।
________________
তথ্যঋণ :
Chitralekha Choudhury and the Story of a Disappeared Fresco
চিত্রনিভা চৌধুরী কাছে যবে ছিল পাশে হল না যাওয়া, নিসার হোসেন (কালি ও কলম)
রাজ্য চারুকলা পর্ষদ, পশ্চিমবঙ্গ সরকার থেকে প্রকাশিত চারুকলা স্মৃতিকথা সিরিজের বই চিত্রনিভা চৌধুরীর লেখা ‘স্মৃতিকথা’
রবীন্দ্র সান্নিধ্যে চিত্রনিভা চৌধুরী, সন্ধিনী রায়চৌধুরী
ইতিহাসের পুনর্নির্মাণ, অর্ক দাশ
https://www.theheritagelab.in/
https://dagworld.com/discovering-the-lives-of-bengal-s-women-artists-with-soma-sen.html
‘রবীন্দ্রস্মৃতি’: চিত্রনিভা চৌধুরী
‘শক্তি আছে, তুমি পারবে’, আনন্দবাজার (কলকাতার কড়চা)
ছবি: সংগৃহীত