হিন্দি বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব আদতে আগ্রাসনের নামান্তর নয় কী?
দেশজুড়ে হইচই, প্রতিবাদ, তীব্র বিরোধিতায় অবশেষে বাতিল হয়ে গেল স্কুলস্তরে হিন্দি বাধ্যতামূলক করার খসড়া প্রস্তাব। কে কস্তুরীরঙ্গনের নেতৃত্বাধীন কমিটি যে জাতীয় খসড়া শিক্ষা নীতি প্রকাশ করেছিল, তাতে গোটা দেশেই স্থানীয় ভাষা এবং ইংরেজির পাশাপাশি বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি শেখানোরও সুপারিশ ছিল। তার মানে, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, মিজোরাম, পশ্চিমবঙ্গ-সহ সব অঙ্গরাজ্যের সমস্ত ছাত্রছাত্রীরাই ক্লাস এইট অবধি তৃতীয় ভাষা হিসেবে হিন্দি শিখতে বাধ্য থাকত। ভালোবেসে হিন্দি শেখা নয়, হিন্দি সিনেমা দেখে কিংবা হিন্দি গান শুনে হিন্দি শেখা নয়। বাধ্যতামূলকভাবে হিন্দি শেখা। নিজের মাতৃভাষা এবং ইংরেজির পাশাপাশি।
কেন্দ্র এই সুপারিশ বাতিল করে দিয়েছে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন তো উঠছেই। এক, এমন সুপারিশের প্রয়োজন পড়ল কেন? মানে, হিন্দিকে বাধ্যতামূলক করার পিছনে বিশেষ কোনো পরিকল্পনা আছে কি? এ তো আসলে ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার নামান্তর।
আরো পড়ুন
“বিপন্ন আজ আমার বাংলা ভাষা…”
আসলে ভাষা নিয়ে এই জটিলতার একটি ইতিহাস আছে আমাদের দেশে। সেই ১৯৪৬ সাল থেকেই কন্সটিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলিতে ভাষাকে কেন্দ্র করে চূড়ান্ত মতবিরোধ চলছে। হিন্দিভাষী প্রদেশের নেতারা হিন্দিকে ‘জাতীয়’ ভাষা করার পক্ষে ধুয়ো তুললেন। পন্ডিত রঘুনাথ বিনায়ক ধুলেকরের মুখে শোনা গেল, ‘যারা হিন্দুস্তানি ভাষা জানে না তাদের ভারতবর্ষে থাকার অধিকার নেই’ ইত্যাদি। কিন্তু অ-হিন্দিভাষীদের ওপর হিন্দি চাপানোর বিরোধিতাও এল। শেষ অবধি, ‘জাতীয় ভাষা হিন্দি’-র পক্ষ থেকে কে এম মুন্সি এবং বিরোধী পক্ষে থেকে এন গোপালাস্বামী আয়াঙ্গার একটি ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করলেন। হিন্দির বিপক্ষে অন্যান্য একাধিক বা সবকটি ‘ভারতীয় ভাষা’ নয়, তার বদলে জায়গা পেল ইংরেজি। ইংরেজি ততদিনে আন্তর্জাতিক বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভাষা। তাছাড়া, ইংরেজদের বদান্যতায় এই দেশেও তার শিকড় অনেকখানি গাঁথা। অতএব, এই প্রস্তাব মান্যতা পেয়ে গেল।
এদিকে হিন্দিকে ‘জাতীয় ভাষা’ করার চেষ্টা কিন্তু চলতেই থাকল। ১৯৫০ সালের ভারতীয় সংবিধানের ৩৪৩ ধারায় ইংরাজি ভাষার সঙ্গে সঙ্গে দেবনাগরী লিপিতে হিন্দিও সরকারি ভাষার স্বীকৃতি পেল। সরকারের প্রাথমিক পরিকল্পনা ছিল ১৫ বছরের মধ্যে সংসদীয় এবং অন্যান্য কাজে ইংরাজি ভাষার ব্যবহার রদ করা হবে এবং ১৯৬৫ সালের মধ্যে একমাত্র হিন্দিকেই সরকারি ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু ষাটের দশকের গোড়ায় হিন্দি জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রতিবাদে বিশেষত দক্ষিণের রাজ্যগুলি উত্তাল হয়ে উঠল। শেষপর্যন্ত ১৯৬৩ সালে প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, অহিন্দিভাষী জনগণ ভারত যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাজকর্মের একক ভাষা হিসাবে হিন্দিকে গ্রহণ করতে রাজি না হলে ইংরাজিকেও তার সঙ্গে রাখা হবে। অর্থাৎ স্বাধীন ভারতের প্রশাসনিক কাজ চালানোর জন্য সরকারি ভাষা হল দুটি—হিন্দি ও ইংরেজি।
বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ‘সরকারি ভাষা’ আর ‘জাতীয় ভাষা’ কিন্তু এক নয়। কারণ, ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তপশিল অনুযায়ী ‘জাতীয় ভাষার’ সংখ্যা বাংলা, গুজরাটি, সংস্কৃত, সিন্ধি, কন্নড়, কোঙ্কণি, মণিপুরি, নেপালি সহ ১৮টি।
সে যাহোক, হিন্দিকে চাপিয়ে দেওয়ার এই চেষ্টা কেন? বিনা কারণে তো কেউ কিছু চাপায় না। হিন্দিকে ‘জাতীয় ভাষা’ করার চেষ্টার আড়ালেও নিশ্চয়ই কারণ ছিল। সেই কারণটি ধর্মীয় আধিপত্যের সঙ্গেও জড়িত বলছেন কেউ কেউ। সাম্প্রতিক ঘটনায় তো অনেকে স্পষ্টভাবেই বলছেন, ‘হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্থান’ আসলে একটি অখণ্ড স্লোগান বা প্রোজেক্ট। এখনো অনেক ট্রেনের গায়ে, এমনকি দমদম এয়ারপোর্টেও দেখা যায় লেখা আছে— ‘হিন্দি হ্যায় হাম। বতন হ্যায়। হিন্দোস্থিতা হামারা।’ অথচ, দমদম এয়ারপোর্ট পশ্চিমবঙ্গে। আমরা কীভাবে ‘হিন্দি হ্যায় হাম’-এর অংশ হলাম? যেভাবে না চেয়েও হয়ে পড়লাম, সেই প্রক্রিয়ারই অঙ্গ হিন্দিকে ক্লাসরুমে বাধ্যতামূলক করার প্রস্তাব। অর্থাৎ, আপাতঅর্থে ভাষা সামনে এলেও এর আড়ালে অন্য গল্প আছে।
এমনিতে ভাষা-জটিলতা কখনোই শুধু ভাষার জটিলতা হয় না। তাতে মিশে থাকে রাজনীতি-ধর্ম-জাতিসত্তার প্রশ্ন, মিশে থাকে ক্ষমতা। এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার সময় যে দেশভাগ অনিবার্য হয়ে পড়েছিল, তার মূলেও ছিল সাম্প্রদায়িক বিভাজন। যে বিভাজন ঔপনিবেশিক প্রভু ইংরেজদের সুচারু বিভাজন নীতির ফলাফল। এরপর, স্বাধীন পাকিস্তানের প্রধান ভাষা হয়ে উঠল উর্দু আর ভারতের প্রধান ভাষা হওয়ার জন্য প্রধানতম দাবিদার হয়ে উঠল হিন্দি। ব্যাপারটা মোটে কাকতালীয় নয়। হিন্দি ততদিনে সংস্কৃতর উত্তরাধিকারী হয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদ তথা হিন্দুত্ববাদের প্রধান ভাষায় পরিণত হয়ে উঠেছে। উল্টোদিকে উর্দুও হয়ে উঠেছে ইসলামীয় মর্যাদা ও ঐতিহ্যের প্রতিনিধি। ফলে, ভারতে জন্ম নেওয়া উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হল। আর হিন্দিকে ভারতের ‘জাতীয় ভাষা’ করে তোলার চেষ্টা চলতেই লাগল।
কেউ বলতেই পারেন, শুধু কি ধর্মীয় বয়ানই দায়ী হিন্দিকে ‘জাতীয় ভাষা’ করার চেষ্টায়? হিন্দি তো ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষা, তাহলে তার ‘জাতীয় ভাষা’ হতে অসুবিধে কোথায়? উত্তর হিসেবে বলা যায়– এক, শুধু ধর্মীয় বয়ান দায়ী নয়। দায়ী আসলে ধর্মের সঙ্গে যুক্ত একটি বিশেষ রাষ্ট্রগঠনের বয়ান। ‘হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান’ যে বয়ানেরই প্রতিফলন। এর সঙ্গে জুড়ে থাকতেই পারে ভারতের হিন্দি-বলয়ের রাজ্যগুলির আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা। হিন্দিকে চারিয়ে দিলে একটা সংস্কৃতিকেও তো চারিয়ে দেওয়া হয়। তাতে আধিপত্যের বীজ বোনা যায় সহজেই। আর দুই, ভারতবর্ষের মতো এত বিপুল ভাষা-বৈচিত্রের দেশে নিছক সংখ্যাগত গরিষ্ঠতা দিয়ে কোনো ভাষাকেই ‘জাতীয় ভাষা’ করা যায় না। উচিতও না।
আসল কথাটা হল, কোনো ভাষাকেই অন্য ভাষাগোষ্ঠির ওপরে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। কেউ হিন্দি ভালোবেসে শিখতেই পারেন, হিন্দি চর্চাও করতে পারেন। কিন্তু জোর করে ক্লাসে হিন্দি বাধ্যতামূলক করা আদতে আগ্রাসন। গোটা দেশকে শুধু হিন্দি দিয়ে চিহ্নিত করতে চাওয়াটাও আগ্রাসন। সম্মিলিত বিরোধিতায় এবারের চেষ্টাটা কার্যক্রী হল না। পরের বার হয়তো অন্যভাবে ফের চেষ্টা হবে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার।
ভাষা চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে এই তীব্র বিরোধিতার আবহে আমরা, মানে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা কিন্তু বেশ সমস্যায় রয়েছি। বিশেষ করে হিন্দু বাঙালিরা। হিন্দি-আগ্রাসন নিয়ে আমাদের সত্যিই কি খুব বিরোধিতা আছে? এই রাজ্যে ধর্মীয় মেরুকরণ তীব্র হচ্ছে দিন-দিন। হিন্দি গান-হিন্দি সিনেমা-হিন্দি বলয়ের সংস্কৃতিতে তো আমরা বহুদিন ধরেই বেশ আচ্ছন্ন। বাঙালি হিসেবে একটা গৌরব এখনো আছে বটে, কিন্তু সে যেন দূরের তারা থেকে চুঁইয়ে আসা আলোর মতো। নিজেদের মধ্যে কথা বলা বাদে বাংলা আমাদের খুব বেশি কাজে লাগে না আর। সামনে হিন্দি সূর্যের মতো জ্বলছে। সেই হিন্দি 'হিন্দুস্থান' আর হিন্দুত্বের সঙ্গে লীন। আমরাও হয়তো ভাবছি, হিন্দু-হিন্দি-হিন্দুস্থান আসলে আমাদেরও আকাঙ্ক্ষা। হিন্দির ক্রমে জাঁকিয়ে বসাতেও তাই খুব একটা অস্বস্তি হচ্ছে না আমাদের। আমাদের ভাষাগত পরিচয়ের থেকে অন্য পরিচয়টি ক্রমশ বড়ো হয়ে উঠছে। বলা ভালো, ভাষাগত পরিচয়টা আবছা হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
অথচ পাশের বাংলাই কিন্তু গত শতাব্দীতে একটা অন্য ঘটনা ঘটিয়ে ফেলেছিল। ধর্মীয় পরিচয়ে মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ভাষা পরিচয়ে বাঙালি-সন্তানরা বিদ্রোহ করেছিল জোর করে উর্দু ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরুদ্ধে। সেই বিদ্রোহ থেকে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম—এ আসলে এক জাতির নিজের ভাষার শিকড়কে প্রতিষ্ঠা দেওয়ার ইতিহাস।
উর্দুর বদলে হিন্দি বসল ধরা যাক। তেমন কিছু যদি এই দেশেও ঘটে, পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা লড়বেন তো মাতৃভাষার জন্য?