
লোকসংগীতে হেমাঙ্গ বিশ্বাস ‘বাহিরান’ এই ধারণা কে প্রয়োগ করেছিলেন সারাজীবন
দেহতরী দিলাম ছাড়িও গুরু তোমার নামে
আমি যদি ডুবে মরি,কলঙ্ক তোমার নামে।।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গলায় এ গান যাঁরা শুনেছেন,তাঁরা জানবেন যে রণেন রায়চৌধুরী বা অন্যান্যদের গায়কীর সঙ্গে তাঁর একটা বড় তফাৎ গানের আড়া তালে এবং এক ধরনের চলন অলংকরণে, যা তাঁর একান্ত নিজস্ব। যে উত্তরাধিকারে সমৃদ্ধ এই নিজস্বতা – যাকে তিনি ডাকেন বাহিরানা বলে – তার সংজ্ঞা নির্মাণের এক একটি দিক হিসাবে তাঁর লিখিত প্রবন্ধের সংকলন ‘গানের বাহিরানা’ হেমাঙ্গ বিশ্বাস রচনাসংকলন -প্রথম খণ্ড (দে’জ প্রকাশনা, ২০১২)র অন্তর্ভুক্ত হয়েছে তাঁর জন্মশতবর্ষে।
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের গুরুমুখী ঘরানার বিপ্রতীপে দাঁড়িয়ে থাকা ‘বাহিরানা’ বা আঞ্চলিকতার পরিসর যদি নির্মিত হয় একটি অঞ্চলের ভাষা, সুর, লয়, চলন, গায়কী, শব্দনির্বাচন, শ্রমছন্দ, ভাব, পরিবেশ-অনুষঙ্গ এবং তার ভৌগোলিক-সাংস্কৃতিক-ঐতিহাসিক উপাদানের সন্নিবেশে, তবে তাকে একটা বিশ্লেষণাত্মক ধারণা বা critical tool হিসাবে আমরা দেখতে পারি।লোকসঙ্গীতের নানান মাত্রার বিচারে, তার সমস্যা, সঙ্কট এবং সঙ্কটমুক্তির উপায় হিসাবে হেমাঙ্গ বিশ্বাস ‘বাহিরানা’র এই ধারণাকে প্রয়োগ করেছেন সারা জীবন ধরে। সে অর্থেই আঞ্চলিকতার সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম উপাদানগুলি অবধি তাঁর লোকায়ত চর্চার এত গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। এবং তাঁর তত্ত্ব আত্মস্থ করলে বাংলাদেশের এক জেলা সিলেটের মানুষ হওয়া সত্ত্বেও অঞ্চলভেদে কীভাবে বদলায় গায়কীর ধরন -কেন রণেনবাবু এবং হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের স্টাইলে একধরনের গঠনের অমিল সুরকাঠামোর মিলকে ছাপিয়ে যায়- তা বুঝতে অসুবিধে হয় না।
এত বিশেষতাপূর্ণ লোকসঙ্গীত চর্চার অবিসংবাদিত অংশ হিসাবে আসে অঞ্চল এবং গানভিত্তিক লোকযন্ত্রের প্রয়োগ। বাহিরানার ধারণা যদি বিশুদ্ধতার এক রকমের খোঁজ হয়,তাহলে খাঁটি লোকযন্ত্র এবং তার ঠিক ব্যবহার এর অপরিহার্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়। বহু লোকবাদ্যের ক্রমাবলুপ্তি অথবা তার একটা সহজলভ্য, অনায়াসসাধ্য বিকল্পের প্রয়োগে লোকসঙ্গীত যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন–তাকে অন্তত স্বীকারের সময় এসে গেছে আজ।
অন্য সব সংগ্রহশালার মত নাকতলায় তাঁর বাড়ি ‘জিরণি’-তে প্রকাশিত-অপ্রকাশিত লেখা, কাগজ, ডায়রি, বই,চিরকুটের যে সম্ভার হেমাঙ্গ বিশ্বাস রেখে গিয়েছেন তা আজ তাঁর আর্কাইভের অংশ। তাঁর ব্যবহার সামগ্রী,রেকর্ড, ক্যাসেট, টেবিল ডায়রি এবং অত্যন্ত মুল্যবান ছবিগুলিও তার অন্তর্ভুক্ত। যে লোকযন্ত্রগুলি তিনি ব্যবহার করতেন নিয়ত (দোতরা, ঘুঙুর, এমনকি ছিন্ন ম্যারাকাস)অথবা সংগ্রহ করেছিলেন (যেমন চীন থেকে আনা গোসাপের চামড়ার তৈরি ওবো ধরণের এক বাদ্যযন্ত্র), কালের অবিসংবাদী কামড় পার করে যেগুলি আর সুরসৃষ্টিতে সক্ষম নয় হয়ত, কিন্তু সেসব যন্ত্রের গঠনকাঠামো আজ লোকশিল্পীদের গবেষণার গুরত্বপূর্ণ অংশ হিসাবে বিবেচিত হবে,এবিষয়ে আমি নিঃসন্দিহান।
তাঁর চিঠির সম্ভার-এর কথা আলাদাভাবে বলার প্রয়োজন। দেবব্রত বিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর চিঠির বিনিময়ের কিছু অংশ উজান গাঙ বাইয়া (সম্পাঃ মৈনাক বিশ্বাস, অনুষ্টুপ,২০১২) বইতে প্রকাশিত হয়েছে – সিলেট এবং ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় লিখিত চিঠিগুলিতে আন্তর্জাতিক রাজনীতি-সমাজনীতি আলোচনার ফাঁকে যা উঠে আসে, যার বিনিময় হয় তা আবারও একধরনের আঞ্চলিকতায় জারিত রসবোধ, গুণী পাঠক যার আস্বাদনে নির্ভেজাল আনন্দের স্বাদ পাবেন। কিন্তু এর বাইরে বহু অপ্রকাশিত গুরুত্বপুর্ণ চিঠি রয়েছে, যা আশা করি তাঁর রচনাসংকলনের কোনো একটি খন্ডে অদূর ভবিষ্যতেই বার করতে পারব । শঙ্কর গুহ নিয়োগীর একটি চিঠি খুঁজে পেলাম সেদিন, সাতাশি সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের টেবিল ডাইরিতে একেবারে শেষের দিকে নিয়োগীজীর ওখানে গানের দল নিয়ে যাবার বিষয়টা উল্লিখিত আছে, সেখানে যাবার সুযোগ তাঁর আর হয় নি, কিন্তু ডাক্তার পু্ণ্যব্রত গুণ- যিনি দল্লি-রাজহরায় শঙ্করের সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন-তাঁর সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রে বুঝতে পারি ওই চিঠি পুণ্যদার হাত দিয়ে নিয়োগীজী পাঠিয়েছিলেন – হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন তিনি আজীবন।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সংগৃহীত লোকগান – যার সংখ্যা খুব কম নয়- বহু অঞ্চল, রাজ্য এবং দেশ জুড়ে যার বিস্তৃতি- হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর্কাইভকে একটা স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে। এর অনেকগুলিই ‘গানের বাহিরানা’য় তিনি উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তার বাইরেও বহু গান রয়েছে – ভারতবর্ষব্যাপী তো অবশ্যই, এমনকি চীন,মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, তদানীন্তন রাশিয়ার লোকগান সে সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। নেপাল থেকে আসতেন কালু সিং। অপূর্ব গলা ছিল তাঁর। নেপালী ঝাউরে এবং অন্যান্য বহু গান কালু সিং এর থেকে সংগ্রহ করেছিলেন তিনি –একসময় উৎপল দত্তের তীর নাটকের জন্য বীরপ্রধান বলে যে গান রচনা করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস , কালু সিং যার সুরারোপে তাঁর অংশীদার ছিলেন – তা এইসব নেপালী লোকগানের প্রভাবসমৃদ্ধ। পার্ক সার্কাসে থাকার সুবাদে বহু জাতির, অঞ্চলের, ভাষার মানুষ আসতেন আমাদের পাড়ায় বা আশেপাশে। দেখেছি, কীভাবে দেহাতের কোনো মানুষ যিনি হয়ত বেড়াতে এসেছেন আত্মীয়ের কাছে –বাবা তাঁকে বাড়িতে নিয়ে এলেন ভোজপুরী লোকসঙ্গীত তুলবেন বলে, সেখানকার অসম্ভব সুন্দর এক লোকগান গাইতে গাইতে স্থূলকায়, বিশালদেহী মানুষটি কেঁদে ফেললেন – কদিন আগে শ্বশুরঘর এ পাঠানো নিজের মেয়ের কথা ভেবে।
ছোটবেলা থেকে সংখ্যাতীত বার শুনে এবং তাঁর কাছে লোকসঙ্গীতের শিক্ষানবিশির কারণে যে গান আমার বা তাঁর ছাত্রছাত্রীদের স্মৃতিতে রয়েছে, তার সংখ্যাটা এই সংগ্রহের এক-তৃতীয়াংশও নয় হয়ত তবু এই প্রায়-বিস্মৃত আঙ্গিকের গানগুলি ঠিক যন্ত্রানুষঙ্গে গাওয়াটা হেমাঙ্গ বিশ্বাস সংগ্রহশালা নির্মাণের প্রধান উদ্দেশ্য । সে অর্থে এটা একটা living archive –যেখানে সংরক্ষণ, সংকলনের তুলনায় ফিরে যাওয়া, ক্রমান্বিত সন্ধান এবং উৎখননের জায়গাটা কিছু কম নয়।
