১২৫-এ বাঙালির ‘সিধুজ্যাঠা’ হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

সরোজিনী নাইডুর ভাই ছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়

ত্যজিৎ রায়ের (Satyajit Ray) তিনটি ছবিতে তিনটি পৃথক চরিত্রে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। তবে সেই তিনটির মধ্যে একটি চরিত্রে তার অভিনয় আজও বাঙালির স্মৃতিতে জাগরুক। ‘সোনার কেল্লা’য় সেই দৃশ্যটির কথা মনে করুন। ফেলুদা এসেছেন তাঁর গুরুজন-প্রতিম এবং পরামর্শদাতা তথ্যভাণ্ডার সিধুজ্যাঠার কাছে। প্যারাসাইকোলজিস্ট ড. হাজরাকে নিয়ে কোনও একটা অতীতের ঘটনার তথ্য জানতে ফেলু শরণাপন্ন হয়েছেন সিধুজ্যাঠার। গায়ে লাল শাল, সাদা পাঞ্জাবি-পাজামা পরিহিত অবস্থায় সিধুজ্যাঠা (Sidhu Jyatha) একটার পর একটা বাঁধানো খাতা খুঁজে চলেন। হঠাৎই একটা পেয়ে এগিয়ে ধরেন ফেলুদার সামনে, অনেকগুলি খবরের কাগজের কাটিং তাতে সাঁটা। এ যেন হাল আমলের ‘গুগল’মশাই। নিমেষের মধ্যে তথ্য হাজির। বাধ্য হয়েই ফেলুদাকে (Feluda) বলতে হয়, ‘ভাগ্যিস আপনি গোয়েন্দা হননি, তাহলে আমাদের পসার থাকত না’। মোটা ফ্রেমের কালো চশমা পরিহিত সেই বৃদ্ধকে আবারও একবার দেখা গিয়েছিল সত্যজিতের ‘সীমাবদ্ধ’ ছবিতে – শ্যামলেন্দুর অফিসের সিনিয়র বরেন রায়ের চরিত্রে। অদ্ভুত এক প্রহসনের ছাপ তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন সেই চরিত্রের অভিনয়ে। মুখে সব সময় পাইপের ধোঁয়া উঠছে, মিটিং-এর মাঝখানে ঘুমিয়ে পড়া কিংবা মহিলা দেখলেই তাঁর চঞ্চল হয়ে ওঠা সব মিলিয়ে একেবারে অন্য মানুষ যেন। তিনি স্বয়ং হরীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জী (Harindranath Chatterjee), লোকমুখে হারীন চাটুজ্জে। কোনান ডয়েলের শার্লক হোমসের গল্পে শার্লকের দাদা মাইক্রফটের আদলে গড়ে তোলা সিধুজ্যাঠাকে রূপোলি পর্দায় একেবারে জীবন্ত করে তুলেছিলেন তিনি। বর্ণময় চরিত্রাভিনয়ের পাশাপাশি তাঁর ব্যক্তিজীবনও কম বর্ণময় ছিল না।

১৮৯৮ সালের ২ এপ্রিল তেলেঙ্গানায় জন্মেছিলেন হরীন্দ্রনাথ। তাঁর দিদি বিখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী ভারতের নাইটিঙ্গেল সরোজিনী নাইডু (Sarojini Naidu), অন্যদিকে দাদা বীরেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায় ভারতের বামপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি শুনছেন ক্ষুদিরামের ফাঁসির সংবাদ। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সর্বকনিষ্ঠ বিপ্লবী ক্ষুদিরামের (Khudiram) মৃত্যু গভীর দাগ কেটে গিয়েছিল তার মনে। ইংরেজি ভাষায় ঐ বয়সেই একটা আস্ত কবিতা লিখে ফেললেন হরীন্দ্রনাথ, নাম দিলেন ‘ডাইং প্যাট্রিয়ট’। ১১ বছর বয়সে লিখে ফেলেছেন একটা গোটা নাটক – ‘আবুল হাসান’, সেই নাটক আবার মঞ্চস্থও হচ্ছে সেই বছর। তবে ব্যক্তিস্বার্থে সেই নাটক করেননি তিনি, নাটকের টিকিট বিক্রির টাকা পুরোটাই বালক হরীন্দ্রনাথ তুলে দিয়েছিলেন অ্যানি বেসান্তের হাতে তাঁর জাতীয় শিক্ষা তহবিলের জন্য।

হরীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জীকে নিয়ে ফ্লিম ডিভিশনের তথ্যচিত্র

পারিবারিক আবহ এভাবেই গড়ে তুলেছিল তাঁকে। ইংরেজি ভাষায় সেই যে প্রথম কবিতা লিখে ফেলেছিলেন তিনি, সেই চর্চা থামিয়ে দেননি হরীন্দ্রনাথ। এমনকি কেমব্রিজে পড়ার সময় তাঁর কবিতা পড়ে রবীন্দ্রনাথও (Rabindranath) ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। কেমব্রিজের একটি কলেজে উইলিয়াম ব্লেকের কবিতা নিয়ে গবেষণা করেছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সাহিত্যচর্চা ছিল তাঁর জীবনের নিত্যসঙ্গী। ‘ইন্ডিয়ান ম্যাগাজিন’, ‘ব্রিটেন অ্যান্ড ইন্ডিয়া’ ইত্যাদি বিদেশি পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতেন তিনি। ‘তুকারাম’ নামে একটি নাটকও লিখে ফেলেছিলেন তিনি। সালটা তখন ১৯২৯। যদিও তার অনেক আগে থেকেই বহু কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পেতে শুরু করেছে তাঁর। ১৯২২ সালে ‘দ্য ম্যাজিক ট্রি’, ১৯২৭-এ ‘পোয়েমস অ্যান্ড প্লেজ’, তারপর একে একে ‘স্ট্রেঞ্জ জার্নি’ (১৯৩৬), ‘দ্য ডার্ক ওয়েল’ (১৯৩৯), ‘লাইফ অ্যান্ড মাইসেলফ’ (১৯৪৮), ‘স্প্রিং ইন দ্য উইন্টার’ (১৯৫৬) কিংবা ‘ভার্জিনস অ্যান্ড ভাইনইয়ার্ড’ (১৯৬৭) ইত্যাদি হরীন্দ্রনাথের লেখা বিখ্যাত সব কাব্যগ্রন্থ। শুধু এতেই থেমে ছিলেন না তিনি। লিখেছেন বহু হিন্দি ছায়াছবির গানও, অশোককুমারের সঙ্গে ‘আশীর্বাদ’ ছবিতে গান গেয়ে আর ১৯৪৪ সালে কলকাতায় ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে নিজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান আর কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন হরীন্দ্রনাথ। বলা ভালো হরীন্দ্রনাথ সেদিন হরণ করেছিলেন দর্শক-শ্রোতার মন।

অশোককুমারের সঙ্গে ‘আশীর্বাদ’ ছবিতে গান গেয়ে আর ১৯৪৪ সালে কলকাতায় ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘের অনুষ্ঠানে নিজে হারমোনিয়াম বাজিয়ে গান আর কবিতা আবৃত্তি পরিবেশন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন হরীন্দ্রনাথ।

হরীন্দ্রনাথ চ্যাটার্জীকে নিয়ে দূরদর্শনের তথ্যচিত্র

অবসর নেওয়ার বয়সেই রূপোলি পর্দার দুনিয়ায় পদার্পণ করেন তিনি। যাত্রাপথের সূচনা হয় গুরু দত্তের ‘সাহেব বিবি অউর গোলাম’ ছবিতে ঘড়িবাবুর চরিত্র দিয়ে। তপন সিংহের ‘গল্প হলেও সত্যি’ অবলম্বনে যখন ‘বাওয়ার্চি’ নামে হিন্দি ছবি তৈরি করলেন হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়, রাজেশ খান্না যার মুখ্য ভূমিকায়, সেখানে ‘দাদুজি’র ভূমিকায় অভিনয় করেন হরীন্দ্রনাথ। তারপর ‘রাত অউর দিন’, ‘তেরে ঘরকে সামনে’, ‘চল মুরারী হিরো বননে’, ‘গৃহপ্রবেশ’ ইত্যাদি ছবিতে দেখা যায় তাঁর অনবদ্য অভিনয়। তবে এই পরিচয়ের বাইরেও তাঁর একটি পৃথক পরিচয় ছিল ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের দীর্ঘ ইতিহাসে। গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনের সময় দেশে ফিরে আন্দোলনের জন্য হিন্দি এবং ইংরেজি ভাষায় একের পর এক দেশাত্মবোধক গান লিখেছেন হরীন্দ্রনাথ। তাঁর নিজের লেখা ‘শুরু হুই জং হামারি’ গানটি গাওয়ার জন্য কারাবাসও করতে হয়েছিল তাঁকে। জওহরলালের দাক্ষিণ্যে ও সৌজন্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত লোকসভার সদস্য হন তিনি। দেশীয় রাজনীতির একেবারে সামনের সারিতে থাকার সুবাদে বহু দেশের রাষ্ট্রনায়কদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও সখ্যতা গড়ে উঠেছিল। এমনকি বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্যেও বাংলা ভাষায় দুটি গান লিখে দিয়েছিলেন হরীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। ইংরেজি ভাষায় অনবদ্য কবিতা লেখার জন্যে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সম্পর্কে দিলীপ কুমার রায়কে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, ‘বাংলা সাহিত্য তাঁকে পেল না এটাই আক্ষেপের!’।

বহুমুখী প্রতিভাধর হরীন্দ্রনাথ অভিনীত সিধুজ্যাঠাকে বাঙালি মনে রাখলেও যৌথ স্মৃতিতে ব্যক্তি হরীন্দ্রনাথ অনেকটাই ম্লান। এবছর এপ্রিল মাসে নীরবেই পেরিয়ে গেল তাঁর ১২৫ বছর পূর্তি। বাঙালির হাতের কাছে এখন গুগল আছে, তাই সিধুজ্যাঠার প্রয়োজন ফুরিয়েছে অচিরেই। 

 

তথ্যসূত্র –

১. https://www.livehistoryindia.com/story/people/harindranath-chattopadhyay

২. https://banglalive.com/harindranath-chattopadhyay/

Developed by DXDasia