তারকেশ্বরের এই ব্যবহার ইংরেজদের সময়কাল থেকেই
হুগলি জেলার মোকাম তারকেশ্বর। এ বঙ্গের মহান শৈব তীর্থ। সেই তীর্থের বাজারে নিত্য পুজোর পসরা, পাথরের থালাবাটি, ফুলের রকমারি, প্যারা, নিকুতির ভক্তের ডালা আরো কত কী। গমগম করছে সারাক্ষণ। সেখানেই দোকানে মেলে ভক্তের সংগ্রহের জন্য শিব পুরাণের গল্প ভিত্তিক নানা ছবি। শিবের ছবি, শিব লিঙ্গের মাথায় কলকে ফুলের ছবি, সঙ্গে আছেন জড়ানো ধূর্জটি। এই সব ছবি আঁকা হয়েছে কাগজে নয়, কাপড়ে নয় – সরাসরি কাচের ওপরে। আজও কলকাতার বহু পুরনো বাড়িতে বা গ্রামগঞ্জের অনেক বাড়ির দেওয়ালেই দেখা যায় এই ছবি। তারকেশ্বরে এই যে কাচের ছবি পাওয়া যায় তা বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে ভক্তরা ঠাকুর দেবতার ছবি হিসেবেই কিনে নিয়ে যান। সেই ভক্তের কাছে এই ছবির ভক্তি মূল্য থাকলেও শিল্পমূল্য নেই।
আপাত দৃষ্টিতে এই কাচের ছবি শিক্ষিত মানুষের চোখে ক্যালেন্ডার শিল্পের অনুকরণ মনে হলেও তারকেশ্বরের কাচের ছবির শতবর্ষ পার হওয়া পরম্পরা কী আদৌ উপেক্ষার বিষয়? আসলে বিষয়টি বহুল পরিচিত কিন্তু বহু আলোচিত নয়। এই সূত্রেই কিছু কথা উঠে আসতে চায়। যেমন এদেশে কাচের ব্যবহার প্রাচীন হলেও ইংরেজরা আসার আগে অবধি কাচের ব্যবহার সহজলভ্য ছিল না বললেই চলে। এরপর বাঙালি বিত্তবানদের বাড়িতে কাচের ব্যবহার শুরু ইংরেজদের হাত ধরেই। তারকেশ্বরের কাচের ছবির ব্যবহার ইংরেজদের সময়কাল থেকেই। পরিষ্কার একটা রেখা টানলে তাই দেখা যায় তাঞ্জোর ও বেনারসের মতো তীর্থযাত্রীদের জন্য কাচের ওপর আঁকা ছবি আমাদের তারকেশ্বরেও পাওয়া যায়। তারকেশ্বরে শিবমন্দির তৈরি হয় সতেরশো উনত্রিশ সালে। আর হাওড়া থেকে তারকেশ্বর রেলগাড়ি চালু হয় ১৮৮৫ নাগাদ। তারপর থেকেই এখানে তীর্থযাত্রীদের সমাগম বেড়ে যায়। আর তখনই আসে তীর্থের স্মৃতি কেনা বেচার উদ্যোগ। যার সূত্র ধরেই উঠে আসে কাচের ওপরে আঁকা ঠাকুর দেবতার ছবি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ‘জয়া আপ্পাস্বামী’ যখন ‘ইন্ডিয়ান পেন্টিংস অন গ্লাস’ লিখেছেন তাতে তাঞ্জোর কাচের ছবি জায়গা পেলেও তারকেশ্বরের এই ছবির পরম্পরার কথা উচ্চারিতও হয়নি।

‘জয়া আপ্পাস্বামী’ যখন ‘ইন্ডিয়ান পেন্টিংস অন গ্লাস’ লিখেছেন তাতে তাঞ্জোর কাচের ছবি জায়গা পেলেও তারকেশ্বরের এই ছবির পরম্পরার কথা উচ্চারিতও হয়নি
বাংলার এই পরম্পরাগত কাচের ছবিতে তারকেশ্বরের শিল্পীরা নানাবিধ পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছে কিন্তু তা নিয়ে আমাদের ভাবার সময় হয়নি। যেমন আমরা যদি মনে করি তারকেশ্বরের কাচের ছবি কেবলই শিবভিত্তিক ছিল তাহলে আমরা ভুল করব। কারণ শুধু শিবের কাহিনিই নয় সর্বধর্ম নির্বিশেষে বিষয় নিয়ে তারকেশ্বরে কাচের ওপর ছবি আঁকা হয়েছে। তাছাড়া প্রকৃতি দৃশ্যর সঙ্গে নীতিবাক্য, প্রতিকৃতি সবকিছুই আঁকা হয়েছে এখানে।

তারকেশ্বরের কাচের ছবি কেবলই শিবভিত্তিক ছিল না
এককালে বাড়ির মেয়েরা ক্রশস্টিচে সেলাই করত নানা নীতি বাক্য, যেমন- ‘পতির পূণ্যে সতীর পুণ্য’ ইত্যাদি। তারকেশ্বরে কাচের ছবিতে পাওয়া গিয়েছে এরকমই নীতিবাক্য যুক্ত ছবি। যাতে লেখা ‘সতী নারী পতি তরে, সব সহ অকাতরে’। পাওয়া গিয়েছে এমনও ছবি যেখানে লেখা রয়েছে ‘খোদা করুণাময়’। দুটি ক্ষেত্রেই ছবি অঙ্কিত হয়েছে প্রকৃতি দৃশ্যের ব্যঞ্জনায়।
এছাড়া তারকেশ্বরের কাচের ছবিতে পাওয়া যায় যিশুর ছবি। এই প্রসঙ্গেই আমাদের মনে রাখতে হবে গঙ্গার ওপারে হুগলি, চন্দননগর ও চুঁচুড়াতে খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের নিবাস ও আস্তানার ইতিহাস বহু প্রাচীন। শ্রীরামপুরের ব্যাপটিস্ট মিশন, চন্দন নগরের ফরাসি কলোনি কিম্বা হুগলির ডাচ অধিবাসীদের জীবন ইতিহাসের সঙ্গে খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার ও প্রসারের সম্পর্ক বিদ্যমান হুগলিতে। তাই তারকেশ্বরের শিব ছাড়াও শিল্পীদের হাতে যিশুর ছবি আজও তৈরি হয় চাহিদার নিরিখেই।

শিব ছাড়াও শিল্পীদের হাতে যিশুর ছবি আজও তৈরি হয় চাহিদার নিরিখেই
রং লাগানোর শৈলী অনেকটা আর্লিবেঙ্গল অয়েল এর মতো। শুধু তাই নয় ছবির মাধ্যমে প্রথমে তৈল রং ছিল। ছবির মধ্যে রয়েছে গল্প বলার ভঙ্গি আর আলঙ্কারিক সত্ত্বা। এসব ছবির একটা পূর্ণাঙ্গ নথি নির্মাণ প্রয়োজন। লোকশিল্পের কিছু গুণ আর নাগরিক চেতনাবোধ থেকে এই ছবি একটা ধারা পেয়েছে। তাই আজ যখন কালীঘাট পট নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা হয় তখন সেই ধারার সম্পূর্ণতায় তারকেশ্বরের কাঁচের ছবি নিয়েও পূর্ণাঙ্গ গবেষণার প্রয়োজনীয়তা আছে।

সতী নারী পতি তরে, সব সহ অকাতরে
আজ থেকে কুড়ি বছর আগে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘তারকেশ্বরের কাচে আঁকা ছবি শীর্ষক একটি অভিসন্দর্ভ পত্র লিখেছিলেন সেখানের ছাত্রী ঋতুপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই পত্রের নিদের্শক ছিলেন শিল্প ঐতিহাসিক শোভন সোম। বর্তমান প্রতিবেদক সেদিন এই পত্রটি রচনার জন্য বিশেষ ভাবে সহায়তায় নিযুক্ত ছিল। প্রতিবেদকের সেদিনের তোলা ছবিগুলি এখানে ব্যবহৃত হল। গবেষণা পত্রটি আরো বিস্তারিত সংযোজনে প্রকাশিত হতে পারলে ভালো হত। ছবি গুলির মধ্যে ‘সতী নারী পতি তরে’ আর ‘খোদা করুণাময়ী’ ছবি দুটি দেখিয়েছিলেন অধ্যাপক শোভন সোম।

‘তারকেশ্বরের কাচে আঁকা ছবি শীর্ষক একটি অভিসন্দর্ভ পত্র লিখেছিলেন সেখানের ছাত্রী ঋতুপর্ণা বন্দ্যোপাধ্যায়