‘দেবভাষা’ শিল্প আবাসে জয় গোস্বামী কথা বলছেন কবিতা ও ছবির বসবাস নিয়ে
কবিতা এবং ছবি পাশপাশি মিলে যাচ্ছে। যেভাবে একটা পেইন্টিং-এর রং হয়ে ওঠে কবিতার ভাষা কিংবা কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে রং-তুলির যাত্রা। ঠিক সেভাবেই অবাধ্য যাত্রাপথে বিচরণ করছেন বিশিষ্ট কবি জয় গোস্বামী। তিনি কথা বলছেন কবিতা ও ছবির বসবাস নিয়ে। গত ১৫ নভেম্বর শনিবার দক্ষিণ কলকাতার দেবভাষা শিল্প আবাসে সৌরভ দে এবং দেবজ্যোতি মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কবিতা ও ছবির আলোচনা নিয়ে হাজির ছিলেন কবি জয় গোস্বামী। সৌরভ দে এদিন বলছিলেন, শিল্পের মাধ্যমে সমস্ত প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে কাজের অনুপ্রেরণায় পৌঁছে যাওয়া যায়। গোঁসাই তার উত্তরে বলেন, “প্রেরণা কথাটা আজকাল খুব ভয় করে বলতে। প্রেরণা এসেছিল রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’-এ। প্রেরণা এসেছিল রিলকের। প্রেরণা এসেছিল শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের। প্রেরণার সঙ্গে এমন মহৎ সব নাম যুক্ত আছে, যে আমার প্রেরণা বলতে কুণ্ঠা হয়। আমি কি প্রেরণাকে চিনতে পারি?”

এদিন পুরো অনুষ্ঠানটি হয় রাস্তায়। যেভাবে একজন বাউল রাস্তা দিয়ে গাইতে গাইতে চলে যান, যেভাবে ফুটপাথের ধারে দেখা যায় অসামান্য সব গ্রাফিত্তি কিংবা পথ নাটকের মাধ্যমে উঠে আসে বিদ্রোহ – ঠিক তেমনই এই অনুষ্ঠানটি হচ্ছে রাস্তার ধারে। কারণ দেবভাষার শিল্পমেলা চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দি না থেকে খোলা আকাশের নিচে আরও উদাত্ত হয়ে যায়। শিল্পমেলা হয়ে ওঠে প্রত্যেকের। বুদ্ধদেব বসু একটি লেখায় বলেছেন, “ধনুকের ছিলা কান পর্যন্ত না টানলে আমাদের ক্ষমতার সীমা আমরা জানতে পারি না। লেখকের জীবনে ধৈর্য আর প্রযত্নই সব। আর তার কিছুটা দৈবেরও দান।” ‘মৌতাত মহেশ্বর’ বইয়ের ভূমিকায় গোঁসাই লিখছেন, “এই বইয়ের চারিদিকে নানারকমের রং ভেসে এল। কী করে আমি নিজেই জানি না। ঘর অন্ধকার করে শুয়েছি মাঝরাতে। জানলার আকাশে দেখা দিল চেন্নাইয়ের সাগরবেলা। দিন এবং সমুদ্র যেখানে একসঙ্গে শেষ হতে দেখেছিলাম তিনবছর আগে। দিগন্তের ঘন সন্ধ্যা রং জল থেকে ভেসে উঠছে ঝাপসা ধোঁয়াটে জাহাজ। বালুতটের অপরদিকে উঠছে যেন বাদল বসুর ধবধবে ধুতি-শার্টের পতাকা। জাগ্রত অবস্থায় দেখা স্বপ্নেরই মতো কখনও পড়ার টেবিলে রাখা বইয়ের মলাট থেকে দালির হাতের নীল রং আর দূরে একফোঁটা পাখির আভাস। শুভাপ্রসন্নর কাক ডাকে না কখনও। কিন্তু তার লম্বা ঠোঁট আর গোল করে তাকানোই তো কালো রঙের একরকম ডাক।”
অতীতে অনেক কবিই চিত্র নিয়ে আলোচনা করেছেন। যেমন প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত। কিন্তু গোঁসাই তথাকথিত চিত্র নিয়ে গুরুগম্ভীর আলোচনা না করলেও, তাঁর গদ্যে, কবিতায় বারবার এসেছে চিত্রের প্রসঙ্গ, রং-তুলির অনুষঙ্গ। মৌতাত মহেশ্বর-এর ভূমিকার এই গদ্যে কী অবলীলায় লিখে গেছেন সমুদ্র রঙের জলের ছবি, কখনও বন্ধু বাদল বসুর ধুতি-শার্টের মিশেল, আবার কখনও শুভাপ্রসন্নর কাকচিত্র। এভাবেই ছবি আর কবিতা বারবার একই পথে হাঁটাচলা করছে। এদিন আলোচনায় উঠে এসেছে গোঁসাইয়ের বইয়ের বিভিন্ন ভূমিকা। তাঁর ‘সন্তান সন্ততি’ কাব্যগ্রন্থে আছে প্রথম প্রকাশিত ভূমিকা। কিন্তু গোঁসাই এদিন বলেন, আসলে প্রথম ভূমিকা লিখেছিলেন ‘সূর্য পোড়া ছাই’তে। এক বন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন কেমন হয়েছে এই ভূমিকাটি! উত্তরে বন্ধু জানিয়েছিলেন, কবিতার বইয়ে আবার ভূমিকা কী হে! তারপর সেই ভূমিকা আর ছাপা হয়নি। প্রথম ছাপা ভূমিকা বেরিয়ে এল সন্তান সন্ততির হাত ধরে।

জয় বলেন যাতায়াতের গতি তাঁকে ভাবায়। ট্রামে যেতে যেতে একসময় লিখেছিলেন প্রচুর কবিতা। তাঁর মতে, একটা স্টপেজ থেকে আরেকটা স্টপেজে যাওয়া মানে দুই লাইন বা তিন লাইন। আর স্টপেজে থামা হল একটা স্পেস বা গ্যাপ। এভাবে তৈরি হচ্ছে যাতায়াতের কবিতা। তা যে সবসময় খাতায় লেখা হচ্ছে এমন নয়। মাথাতেই সৃষ্টি হচ্ছে কবিতা।
জয় গোস্বামী প্রায় তিনবছর অর্থাৎ দুই বছর এগারো মাস কোনো কবিতাই লেখেননি। তখন তাঁর বয়স ৫৩-৫৬ বছর। গদ্য লিখতেন। কবিতা নিয়ে গদ্য। গোঁসাইবাগান। যেখানে ঠাঁই পেত অন্যের কবিতা। গোঁসাইয়ের মতে, এই তিনবছর তিনি কোনো কবিতার ভাষা খুঁজে পাননি। অজানার রাস্তা খুঁজে পাননি। অজানার পথে যদি না হাঁটা যায়, তাহলে নতুন জীবন আবিষ্কার করা যায় না হয়তো। কমফোর্ট জোনের বাইরে বেরনোর মতো মজা হয়তো সত্যিই নেই। গোঁসাই এটিই বারবার বলতে চেয়েছেন।

দেবভাষার এই অনুষ্ঠানে এদিন হাজির ছিলেন জয় গোস্বামীর বহুদিনের বন্ধু চিত্রকর কৃষ্ণেন্দু চাকী। যিনি কবির অনেক বইয়ের প্রচ্ছদ করেছিলেন। এমনকি ‘যারা বৃষ্টিতে ভিজেছিল’ বইয়ের ভিতরের বিখ্যাত ছবিগুলি কৃষ্ণেন্দু চাকীরই আঁকা। এই অনুষ্ঠানে হাজির ছিলেন অনেক তরুণ কবি। প্রথমেই জয় তাঁদের ধন্যবাদ জানালেন। কারণ চিত্র আর কবিতার এই অবাধ্য যাতায়াতে তরুণ কবি এবং তরুণ চিত্রকররা হাজির থাকলে তা আর সময়ের বেড়ায় আটকে থাকে না। তা কাল বা সময়কে অতিক্রম করে যায়। এখানেই শিল্পের মজা।

ছবি সৌজন্যে- দেবভাষা