গিরীন্দ্রশেখর ভারত তথা এশিয়ায় আধুনিক মনোবিজ্ঞান গবেষণায় একজন পথিকৃত
কিংবদন্তি সাহিত্যিক, অনুবাদক, অভিধান-প্রণেতা, রসায়নবিদ রাজশেখর বসু ওরফে পরশুরাম নিজের বহুমুখী গুণে বিখ্যাত। তাঁর ভাই গিরীন্দ্রশেখর ভারত তথা এশিয়ায় আধুনিক মনোবিজ্ঞান গবেষণায় একজন পথিকৃত হয়েও কিন্তু খ্যাতির পাদপ্রদীপ থেকে দূরেই রয়ে গিয়েছেন এখনও। শিক্ষায়তনের বাইরে গিরীন্দ্রশেখরকে নিয়ে চর্চা খুবই কম হয়। আসলে মনোবিদ্যা বিষয়টির থেকে এদেশের সাধারণ মানুষ একটু দূরে থাকতেই পছন্দ করে। যদিও আগের থেকে মনোবিদ্যা ও মানসিক সমস্যা নিয়ে এখনকার আমবাঙালি তথা আমভারতীয়র সচেতনতা অনেক বেড়েছে, তা সত্ত্বেও বৈজ্ঞানিক মনোচর্চার থেকে একটা ভয়মিশ্রিত দূরত্ব বজায় রাখতেই তারা স্বচ্ছন্দ বোধ করে।
গিরীন্দ্রশেখরের বাবা চন্দ্রশেখর বসু দ্বারভাঙার রাজার দেওয়ান ছিলেন। চন্দ্রশেখরের তৃতীয় স্ত্রী লক্ষ্মীমণি দেবীর নয় সন্তানের মধ্যে সবথেকে ছোটো ছিলেন গিরীন্দ্রশেখর। ভাইবোনদের মধ্যে দাদা রাজশেখরের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠতা সবথেকে বেশি ছিল তাঁর। দ্বারভাঙার প্রশাসনিক কাজ থেকে অবসর নেওয়ার পর চন্দ্রশেখর কলকাতার পার্সিবাগানে বাড়ি তৈরি করে বসবাস করতে থাকেন। তাঁদের পরিবারে ভারতীয় ঐতিহ্যের মননশীল চর্চা হত। যার ফলে, গিরীন্দ্রশেখর ছোটোবেলা থেকেই ভারতীয় দর্শন, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে উঠেছিলেন। তিনি ছিলেন কৃতি ছাত্র। দ্বারভাঙাতেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে রসায়ন এবং শারীরবিদ্যা – দু’টি বিষয়ে প্রথম বিভাগে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবি ডিগ্রি অর্জন করে চিকিৎসকের পেশা গ্রহণ করেছিলেন গিরীন্দ্রশেখর। এরই মধ্যে ১৯০৪ সালে ১৭ বছর বয়সে ৯ বছরের ইন্দুমতী দত্তের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দুই কন্যাসন্তানের জন্ম দিয়েছিলেন তাঁরা।
গিরীন্দ্রশেখর যেমন গরিব-দুস্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা করতেন, তেমনি, প্রফুল্লচন্দ্র রায়, জগদীশচন্দ্র বসুর মতো স্বনামধন্য ব্যক্তিত্বরাও ছিলেন তাঁর পেশেন্ট। এরই মধ্যে গিরীন্দ্রশেখর মনোবিদ্যা সম্পর্কে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯১৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিদ্যা বিভাগ চালু হয়। বিশেষ অনুমতি নিয়ে গিরীন্দ্র ১৯১৬ সালে সেই বিভাগে এমএ পরীক্ষা দেন এবং প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। তিনি এরপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিদ্যা পড়ানোর দায়িত্ব পান এবং এক সময়ে মনোবিদ্যা বিভাগের প্রধানের পদও অলংকৃত করেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়েই ‘মানসিক অবদমন’ নিয়ে গবেষনা করে ডিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ে বিশ্বখ্যাত মনোবিদ সিগমুন্ড ফ্রয়েডের লেখাপত্রের ইংরেজি অনুবাদ ভারতে আসা শুরু করে। গিরীন্দ্র সেগুলো পড়েছিলেন, কিন্তু তিনি ফ্রয়েডের অনুগামী ছিলেন না। ১৯২২ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ভারতীয় মনঃসমীক্ষা সমিতি’। আর্নেস্ট জোনস এবং ফ্রয়েডের সহায়তায় সেই প্রতিষ্ঠান ইন্টারন্যাশান্যাল সাইকোঅ্যানালিটিক অ্যাসোসিয়েশন’-এর স্বীকৃতি লাভ করে। গিরীন্দ্র তাঁর গবেষণাপত্র ফ্রয়েড ও জোনসকে পাঠিয়েছিলেন। ফ্রয়েড তাঁর চিন্তাধারার প্রশংসা করলেও মনোবিদ্যা নিয়ে দু’জনের দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন। ১৯২১ সাল থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত ফ্রয়েডের সঙ্গে গিরীন্দ্রের চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ ছিল। এই চিঠিগুলি পরে ‘বোস-ফ্রয়েড করেসপন্ডেন্স’ নামে প্রকাশিত হয়েছে, যে বইটি সারা বিশ্বে মনোবিদ্যার ছাত্রছাত্রীদের পড়ানো হয়। ফ্রয়েডকে চিঠি লেখার জন্য জার্মান ভাষা শিখেছিলেন গিরীন্দ্র।
১৯৪০ সালে গিরীন্দ্রশেখরের উদ্যোগে চালু হয় লুম্বিনী পার্ক মানসিক হাসপাতাল। এই প্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দিয়েছিলেন রাজশেখর বসু। সাধারণ ‘লুনাটিক অ্যাসাইলাম’-এর থেকে এই হাসপাতালের চিকিৎসাপদ্ধতি ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। এখানে মানসিক রোগীদের ওষুধ দেওয়া হত কম, কথাবার্তা, বেড়ানো ইত্যাদির দিকে জোর দেওয়া হত বেশি। ভারত তথা এশিয়ায় মনোবিদ্যা গবেষণা ও চিকিৎসায় নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন গিরীন্দ্রশেখর।