বাংলার দুশো বছরের শিল্প-উদযাপনে ইতি! আপাতত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ‘ঘরে বাইরে’

ড্যাগ মিউজিয়ামের সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের

লকাতার অন্যতম ব্যস্ত অঞ্চল বিবাদি বাগ। অফিসযাত্রী থেকে মাঝারি ব্যবসায়ীদের ঠাসা ভিড় চোখে পড়ে বছরের প্রত্যেকটা দিন। তবে গত দুই বছর ধরে ওই অঞ্চল হয়ে উঠেছিল শিল্পপ্রেমী মানুষ আর নবীন-প্রবীণ শিল্পীদের প্রিয় ‘ঠেক’। কারণটা বুঝতে অসুবিধা হয় না। ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিং-এর ‘ঘরে বাইরে’ মিউজিয়াম। কলকাতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ডেস্টিনেশান। তবে দু’বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আচমকা এক ঘোষণায় হতবাক রাজ্যের শিল্পপ্রেমীরা। দু’বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই আচমকা এক ঘোষণায় হতবাক রাজ্যের শিল্পপ্রেমীরা। গত রোববারেই বন্ধ হয়ে গেছে ঘরে বাইরের সদর দরজা।

মানচিত্রে পুরোনো কলকাতা

সংস্কৃতি মন্ত্রকের অধীনে থাকা আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া ও ন্যাশনাল গ্যালারির মিলিত প্রয়াসে ‘ঘরে বাইরে’ মিউজিয়ামে প্রদর্শনীর আয়োজন করে ড্যাগ মিউজিয়াম নামক এক সংস্থা। ২০২০ সালের ১১ জানুয়ারি ঘটা করে উদ্বোধনও করতে আসেন খোদ প্রধানমন্ত্রী, নরেন্দ্র মোদি। মাঝে করোনার জন্য কিছুদিন বন্ধ থাকলেও আনলক পর্বে ফের খুলে দেওয়া হয়।

বিকাশ ভট্টাচার্য চিত্রিত

এখানকার প্রদর্শনী ছিল দেখার মতো। বাংলার সেরার সেরা কাজগুলো একমাত্রায় তুলে ধরাই ছিল এই মিউজিয়ামের লক্ষ্য। বাংলার প্রায় দুই শতাব্দীর চিত্রকলা, ভাস্কর্য দেখে বিস্মিত হয়েছে কলকাতা এবং বাইরের শিল্পপ্রেমীরা। ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায়, ১৮৩৩ সালে ইতালীয় স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছিল কারেন্সি বিল্ডিং। সেখানে এক ব্যাংকের অফিস তুলে দিয়ে নির্মিত হয় ‘ঘরে বাইরে’ প্রদর্শনীশালা। ১৮-২০ শতকের শিল্পীদের সৃষ্টিকর্ম দেখতে ভিড় জমত বেশ। কে না নেই সেখানে! রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে অবনীন্দ্রনাথ-গগনেন্দ্রনাথ, নন্দলাল বসু থেকে যামিনী রায়-রামকিঙ্কর বেইজ, সত্যজিৎ রায় থেকে বিনোদবিহারী কিংবা লালুপ্রসাদ সাউ, সোমনাথ হোর, বিকাশ ভট্টাচার্য— চমৎকার ভাস্কর্যের সম্ভার— সবকিছু মিলিয়ে দেখার মতো ছিল এই তিনতলা বাড়িটি। দেওয়ালে ফ্রেমবন্দি করে রাখা তিলোত্তমার নানান সময়-মূহূর্ত-স্মৃতি।

গ্রাফিক্সে কলকাতা

কিন্তু গত বৃহস্পতিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় ড্যাগ মিউজিয়ামের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ২৮ নভেম্বর বন্ধ হয়ে যাচ্ছে ‘ঘরে-বাইরে’-র প্রদর্শনী। আবার কবে চালু হবে তা জানানো হয়নি। তবে জানা গিয়েছে, গত বছরেই ড্যাগ মিউজিয়ামের সঙ্গে চুক্তি শেষ হয়ে গিয়েছিল কেন্দ্রীয় সরকারের। মন্ত্রকের তরফে পুনর্নবীকরণ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত এই পদক্ষেপ নেওয়া হল। ড্যাগের তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, “এই প্রদর্শনীতে ভারতের পাশাপাশি বিভিন্ন বিদেশি শিল্পীদের ছবি, আলোকচিত্র প্রদর্শিত হচ্ছে। রবিবার এই প্রদর্শনী বন্ধ করা হলেও আশা করব খুব তাড়াতাড়ি আমরা আবার নতুন ডালি নিয়ে সংস্কৃতির রাজধানীর বুকে ফিরে আসব।”

শর্মিলা ঠাকুর – ছবিঃ নিমাই ঘোষ

কিন্তু কবে কখন তা কেউ জানে না। আশা করব, ওল্ড কারেন্সি বিল্ডিং আবার ফিরে পাবে তার আভিজাত্য। আবার বাংলার ঐতিহ্য আর শিল্প নিয়ে নতুনভাবে ফিরে আসবে তিনতলার ঘরগুলো। এখন শুধুই অপেক্ষা আর অপেক্ষা।

প্রসঙ্গত, ‘ঘরে বাইরে’ (The Home and the World) রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত একটি উপন্যাস। যেখানে স্বদেশী আন্দোলনের পটভূমিতে লিখিত ছিল জাতিপ্রেম ও সংকীর্ণ স্বাদেশিকতার সমালোচনা। ছিল সমাজ ও প্রথা দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নারী পুরুষের সম্পর্ক; পরস্পরের আকর্ষণ-বিকর্ষণের বিশ্লেষণ। এই একই নাম দিয়ে পরবর্তীতে সত্যজিৎ রায় পরিচালনা করেন একটি সিনেমা। 

দেওয়াল-জুড়ে কালীঘাটের পটচিত্র

তিনতলার গ্যালারি

Post Tags
Developed by DXDasia