December 22, 2016 | 3:27 PM

ইট ইজ মাই সঙ

গভীর বেদনাবোধ দিয়ে গওহরজান বাংলায় একটি গান লিখেছিলেন ও গেয়েছিলেন

গান গাওয়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরও যখন শ্রোতা সেই রেশের মধ্যে থেকে যেতেন, তখনই মাদকতাপূর্ণ কণ্ঠে গায়িকা বলতেন ‘মাই নেম ইজ গওহরজান’। সেসব শুনে গান রসিকরা পাগল হলেন আর কলকাতার সমাজপতিরা হলেন রুষ্ট। তাঁরা বললেন এই বারে বেশ্যার নাচা-নাচি বন্ধ করতে হবে। শহরে সঙ বের হল। গায়ক কবি গোপাল দাস খেউড় লিখলেন- ‘রাইচাঁদ বড়াল আদি করে/ বড় বড় ভাইরে ধরে/ রেখেছে ভাই বন্ধ করে/ কলেতে ভরে/ আবার রেখেছে এক মেয়েকে ধরে/ তার নাম গহরজান বাই/ ধনদৌলত টাকাকড়ি/ জুড়ি ঘোড়া ঘর বাড়ি/ কলেতে গিয়াছে সব/ কিছু বাকি নাই/ এখন কলের গানে/ মাতিয়ে প্রাণে ন্যাংটা করতে চায়’। এই ছিল কলকাতায় সেদিনের গওহরজানি কেচ্ছা।

ওদিকে গ্রামোফোন কোম্পানির তকমা আটা ‘ফার্স্ট ডান্সিং  গার্লের’  জীবন তখন উথাল-পাথাল। ভালোবাসার যে মানুষটিকে সঙ্গে নিয়ে গওহর বেনারসে চলে এসেছিলেন সেই ছগনলালজীর সঙ্গে তখন সম্পর্ক ভাঙনের মুখে। এর পর থেকে গওহরের জীবন অন্য খাতে বইতে থাকে। জীবন ভোর একটি প্রাণের মানুষ খোঁজ করেছিলেন তিনি। কিন্তু ভাগ্য তাঁকে সাথ দেয় নি। পরের দিকের ভালোবাসার মানুষটিকেও চিনলেন নিষ্ঠুর পরিণতিতে। যখন  প্রেমিক আব্বাস গওহরের ধনসম্পত্তি সব কেড়ে নিলেন শুধুমাত্র ভালোবাসার অভিনয় করে। সেই সময় গওহরজান কলকাতায়। চলছে একাধিক মামলাপাতিও।

এ হেন গওহরজান ছিলেন স্বয়ং কবি ও গান লিখিয়ে। খুব কম মানুষই হয়তো খোঁজ রাখেন যে বিখ্যাত ‘রসকে ভরে তোরে নয়ন’ ঠুমরিটি গওহরজান এর-ই লেখা।

কোন সভায় গেলে বিভিন্ন ভাষা-ভাষির শ্রোতাদের জন্য নানা ভাষাতেই গান শোনাতেন গওহরজান। যে কারণে জলসায় বাঙালি শ্রোতা পেলে বাংলা ভাষাতেই গান শোনাতেন। মা মালকাজানও ছিলেন বড় কবি। তাঁর রচিত বাংলা গানও শোনাতেন জলসাতে। এ রকমই এক দু’বার শ্রোতাদের শুনিয়েছেন রবিবাবু মানে রবীন্দ্রনাথের গানও। তাছাড়া নিজের লেখা গানও আছে। সেরকমেই একটি নিজের লেখা গান এল রেকর্ডে। লেবেলে আশ্চর্য ভাবে লেখা হল গানের প্রথম লাইনের বদলে গানের বিষয়। যা বলতে গেলে রেকর্ডের ইতিহাসে বিরল। রেকর্ড লেবেলে ‘ফার্স্ট ড্যান্সিং গার্ল’ ইনফরমেশনের ঠিক তলায় লেখা গানের বিষয়টি হল ‘পরকে দিয়া প্রাণ’। তার পর গান শুরু রেকর্ডে। ‘ফাঁকি দিয়ে প্রাণের পাখি উড়ে গেল আর এল না’। নিজের ভালোবাসার ব্যার্থতাই যেন গভীর ভাবে রূপক হিসেবে ছায়া ফেলল গানে। নিজের আত্মজীবনকে গানে এমন ভাবে মিশিয়ে দেওয়া একজন স্বার্থক জীবন বোধের কবির পক্ষেই  সম্ভব। তাই গানের শেষে নিজের নাম বললেন। বললেন গানটি বাংলা ভাষার, স্বরচিত বলে নিজের গভীর বেদনাবোধ মিশিয়ে নিয়ে এও বললেন ‘ইট ইজ মাই সঙ’। সেই বোধ রেকর্ডে নথি হয়ে রইল। প্রতিধ্বনির মতো রয়ে গেল  মাত্র দু'টি  কথা ‘মাই সঙ’।

Developed by DXDasia