শতবর্ষ পেরিয়ে রাজ্যের অন্যতম ‘মডেল স্কুল’ গড়িয়া বরদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ৩০

জ আমরা যাকে দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়া বলি, তখন সেটা ছিল দক্ষিণ ২৪ পরগণার অন্তর্গত একটি গ্রামীণ এলাকা। ঝোপজঙ্গলে ঢাকা এই অঞ্চলে মানুষের বসতি কম ছিল। ছিল গড়িয়া শ্মশান, যেখানে শ্রীমন্ত সদাগরের তৈরি মন্দির আজও স্মৃতি হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। এর বুক চিরেই বয়ে গেছে আদি গঙ্গা, যা বিদ্যাধরী নদীতে গিয়ে মিশেছে। এখন গড়িয়ার এই আদি গঙ্গাকে বলা হয় টালি নালা। এই টালি নালার ওপর দিয়ে এখন কবি সুভাষ থেকে টালিগঞ্জ পর্যন্ত মেট্রো রেলের লাইন, তার ওপর দিয়ে যান চলাচল করছে, শহরের সঙ্গে শহরতলীকে মিলিয়ে দিয়েছে মেট্রো রেল। এই আধুনিক পরিবহণ ব্যবস্থা যখন বিশ বাঁও জলে, আজকের দক্ষিণ কলকাতা শহরতলী ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার সীমারেখায় ১৯১৯ সালে গড়ে উঠেছিল গড়িয়া বরদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয় (Garia Barada Prasad High School)।

জালিয়ানওয়ালাব্যাগ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল। আর গড়িয়া বরদা প্রাসাদ উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ৫ মে ১৯১৯, অর্থাৎ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের ঠিক পরেই। গড়িয়ার বরদা প্রসাদ ঘটক (বিশেষ কারণে তিনি  ঘটক উপাধি পেয়েছিলেন, প্রকৃত নাম বরদা প্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়) এই স্কুল তৈরির জন্য জমি দিয়েছিলেন। এছাড়াও জমি দিয়েছিলেন তাঁর স্ত্রী হরিমতীদেবীর নামে, পাশেই মেয়েদের জন্য একটি স্কুল করার জন্যে। স্কুলটির নাম হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। সেই সময় গড়িয়ায় বসতি তেমন ভাবে গড়ে না উঠলেও, একটু একটু করে মানুষ থাকতে শুরু করেছে। ফ্ল্যাট-সংস্কৃতির নামগন্ধ ছিল না। বাড়ির উঠোন ছিল, ছিল তুলসিতলা, মাটির দাওয়া। উনুনে রান্না হতো। উদার ভাবনাচিন্তার মানুষ ছিলেন, যাঁরা সমাজসেবার জন্য নির্দ্বিধায় জমি দান করে দিতেন, স্কুল তৈরির উদ্যোগ নিতেন। এভাবেই, বরদা প্রসাদ ঘটকের মতো মানুষদের জন্য, এক সময় তৈরি হয়েছে কলকাতা তথা সারা রাজ্যের বহু স্কুল।

স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণালকান্তি মণ্ডল বলছিলেন স্কুলের কথা। তিনি গর্ব করে বললেন, “২০১৯ সালে আমাদের স্কুলের ১০০ বছর পূর্তিতে আমরা ঠিক করেছিলাম, মাধ্যমিক পরীক্ষায় ওই বছর ১০০ জন ফার্স্ট ডিভিশন পাবে। সেটা হয়েছিল। ১০১ জন ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছিল ২০১৯ সালে। ছাত্র ও শিক্ষকদের যৌথ প্রয়াসে আমরা স্কুলকে এই ১০০ জন ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়া ছাত্র স্কুলের ১০০ বছর পূর্তিতে উপহার  দিতে পেরেছিলাম। এটা আমাদের গর্ব, সাফল্য। ঠিক তার আগের বছর আমাদের স্কুলে ৭০ জন মাধ্যমিকে ফার্স্ট ডিভিশনে পাশ করেছিল। এক বছরে ৩১ জন ফার্স্ট ডিভিশন বেড়েছিল।

গড়িয়া বরদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে এই মুহূর্তে ১২৫০ ছাত্র-ছাত্রী পড়ছে। উচ্চ মাধ্যমিকে কলা, বিজ্ঞান ও বাণিজ্য পড়ানো হয়। তিনতলা স্কুল ভবনটিতে ২৪টি ক্লাসরুম রয়েছে। রয়েছে ফিজিক্স, কেমিস্ট্রি, বায়োলজি, জিওগ্রাফি, কম্পিউটার এবং ফিজিক্যাল এডুকেশন-এর ল্যাবরেটরি। প্রথাগত শিক্ষার বাইরে এই স্কুলের নিজস্ব সাংস্কৃতিক শাখাও আছে। স্কুলের শিক্ষকরাই আলাদা আলাদা করে এই বিষয়ে শিক্ষা দেন। কেউ আঁকা, কেউ আবৃত্তি, কেউ গান, নাচ শেখান। এছাড়া ফুটবল, ক্রিকেট, ভলি খেলা হয়। ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে পুরস্কার পেয়েছে ও পাচ্ছে।

 

স্কুলের প্রধান শিক্ষক বললেন, “আমাদের স্কুলে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের রেজাল্ট ভালোই হয়। লটারির জন্য ক্লাস ৫-এ বেছে ছাত্র ভর্তি নেওয়া সম্ভব হয় না। তবে উচ্চ মাধ্যমিকে বেছে ছাত্র ভর্তি করা হয়, তাই মাধ্যমিকের তুলনায় উচ্চ মাধ্যমিকে ফল ভালো হয়। উচ্চ মাধ্যমিক বিভাগ কো-এড। আমাদের স্কুলে চারটা হাউস আছে, বিদ্যাসাগর হাউস, টেরেসা হাউস, নেতাজি হাউস এবং টেগোরে হাউস। মিড ডে মিল থেকে শুরু করে শিক্ষাশ্রী, ঐক্যশ্রী, কন্যাশ্রী সমস্ত সরকারি প্রকল্প এই স্কুলে চালু আছে। তবে, প্রথম প্রজন্মের পড়ুয়া, নিম্নমধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে-মেয়েরাই বেশিরভাগ এই স্কুলে পড়তে আসে। যাঁদের অর্থনৈতিক অবস্থা ভালো, তাঁরা এখন বাংলা মাধ্যমে পড়াতে চান না সন্তানদের। আমরা খুব ভালো ছাত্র-ছাত্রী হয়তো পাই না, তবে আমাদের স্কুলে ভর্তির পর তাদের তৈরি করে নিই।

কবি নজরুল মেট্রো স্টেশন থেকে নেমেই একটু এগোলে এই স্কুল। কলোনি আছে আশেপাশে। বেশিরভাগ পড়ুয়ারা সেখান থেকেই আসে। স্কুলে “অনুধ্বনি” নামের ওয়াল ম্যাগাজিনে আছে। তাতে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা লেখে, আঁকে। শিক্ষকরাও লেখেন। “আরাত্রিক” নামের একটি প্রিন্ট-ম্যাগাজিন বের হয় প্রতি বছর, স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবসের দিন। বরদা প্রসাদ ঘটক   প্রতিষ্ঠিত এই স্কুল ২০২২ সালে মডেল স্কুলের তকমা পায়। ভালো রেজাল্ট, উপযুক্ত স্কুল ভবন, ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা, মেয়েদের স্যানিটারি অ্যাওয়ার্নেস, খেলাধুলায় সাফল্য ইত্যাদির জন্যই এই স্বীকৃতি। বরদা প্রসাদ উচ্চ বিদ্যালয়ে আগে গড়িয়া দীনবন্ধু এন্ড্রুজ কলেজ বা গড়িয়া কলেজের ক্লাস হতো। অনেক কৃতি ছাত্র এই স্কুলের প্রাক্তনী। স্কুলটি মডেল স্কুলের পুরস্কার পাওয়ার ফলে মানুষের ও শিক্ষা দফতরের নজর কেড়েছে। আগামী দিনে স্কুলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার শপথ নিয়ে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী-শিক্ষকরা শ্রম দিয়ে চলেছেন। 

তথ্যসূত্র:- 
স্কুলের প্রধান শিক্ষক মৃণালকান্তি মণ্ডল, 
পিয়ালী গোস্বামী, প্রধান শিক্ষিকা, গড়িয়া হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়
ছবি :সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia