
সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ১১
কলকাতা সংলগ্ন একটা বাংলা মাধ্যম স্কুলে পড়ুয়াদের ড্রোন তৈরি, রোবট তৈরি শেখানো হচ্ছে। এমনই অত্যাধুনিক কম্পিউটার ল্যাবরেটরি আছে হরিনাভি ডি ভি এ এস স্কুলে। এই স্কুলের যেমন ঐতিহ্যবাহী গরিমা আছে তেমনি আছে আগামীর স্বপ্ন। সব সৃষ্টির পিছনেই একটা ইতিহাস থাকে, হরিনাভি ডি ভি এ এস হাইস্কুল সৃষ্টির নেপথ্যেও আছে। সেই ইতিহাসে জড়িয়ে আছেন বাংলার নবজাগরণের মহীরুহরা।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের বন্ধু ছিলেন দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ। তিনি সেই সময় সংস্কৃত কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল। বন্ধু দ্বারকানাথকে চাংড়িপোতায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার পরামর্শ দেন বিদ্যাসাগর। আজ যে জায়গার নাম ‘সুভাষগ্রাম’ ১৮৬৬ সালে সেই জায়গার নাম ছিল চাংড়িপোতা। এখানেই থাকতেন দ্বারকানাথ। পরে সুভাষচন্দ্র বসু’র স্মৃতিতে চাংড়িপোতার নাম হয় সুভাষগ্রাম। দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ প্রথমে হরিনাভি অ্যাংলো সংস্কৃত হাইস্কুল বা ‘হরিনাভি এএস হাইস্কুল’ নাম দিয়ে এই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার ঠিক ১০০ বছর পর অর্থাৎ ১৯৬৬ সালে স্কুলের নাম দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণের নামানুসারে হয় হরিনাভি দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ অ্যাংলো সংস্কৃত হাইস্কুল বা হরিনাভি ডিভিএএস হাইস্কুল। এই স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জ্ঞানচন্দ্র ঘোষের মতো প্রাজ্ঞ ব্যক্তি। আবার এই স্কুলে পড়েছেন প্রখ্যাত গীতিকার, সুরকার সলিল চৌধুরী। এছাড়াও অগনিত মানুষ এই স্কুলে পড়েছেন, যাঁরা ভারতে এবং বিদেশে খ্যাতির সঙ্গে কাজ করে চলেছেন। এক নাগাড়ে এই কথাগুলো বলে গেলেন হরিনাভি ডিভিএএস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বিক্রমজিৎ মণ্ডল। তাঁর মুখে এই স্কুলের কাহিনি শুনতে শুনতে রোমাঞ্চ জাগছিল মনে।

স্কুলের বর্তমান চেহারা
এই কো-এড স্কুলে এখন দু’টো বিভাগ, একটা প্রাথমিক একটা পঞ্চম থেকে দ্বাদশ। প্রাথমিকের ক্লাস হয় সকালে। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ দিবা বিভাগে ক্লাস হয়। পঞ্চম থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত ক্লাস মিলিয়ে এই স্কুলে বর্তমানে ২১৮৯ জন ছাত্র। ক্লাসরুম ৩০টি, শিক্ষক আছেন ৫৭ জন। এছাড়াও স্কুল সংলগ্ন বিশাল মাঠ রয়েছে। প্রধান শিক্ষক বিক্রমজিৎ মণ্ডল জানালেন, “স্কুলের ফলাফল ভালোই হয়। গত বছর মাধ্যমিকে এই স্কুলের এক ছাত্র ৬৬৮ পেয়েছে আর ওই একই শিক্ষক্ষা বর্ষে উচ্চমাধ্যমিকে এই স্কুলের এক পড়ুয়া পেয়েছে ৫০০-র মধ্যে ৪৮৬ নম্বর। প্রথম দশ-এর মধ্যে থাকতে না পারলেও প্রথম ২০ জনের মধ্যে হরিনাভি ডিভিএএস হাইস্কুল থাকেই।”
১৮ জুলাই ২০১৯ সালে হরিনাভি ডিভিএএসস্কুলের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিয়ে আসেন বিক্রমজিৎ মণ্ডল। তিনি বলেন, “চার বছর এই স্কুলে প্রধান শিক্ষক পদে রয়েছি, তবে প্রায় ২ বছর লকডাউন হওয়ার ফলে পরিস্থিতি অনেকটাই জটিল হয়ে উঠেছিল। তখন অনলাইনে আমরা ক্লাস হতো, সবাই সেই ক্লাসে যোগ দিতে পারত না। কারণ, সবার ইন্টারনেট সহ মোবাইল ছিল না। সেই সময় আমরা ইচ্ছে থাকলেও অনলাইন মোডে ১০০% পড়ুয়ার কাছে ভার্চুয়ালি পৌঁছতে পারিনি। এরপর লকডাউনের পর স্কুল খোলার সময় আর একটা ফেজ গেছে। তখন পড়ুয়ারা স্কুলে আসতে ভয় পাচ্ছিল। তবে সেই পরিস্থিতি সামলে নিয়ে এখন সব স্বাভাবিকই আছে, স্বাভাবিক ছন্দেই স্কুল চলছে। স্কুলটা সরকার পোষিত। কাজেই সরকারি সুবিধা এখন যা যা প্রাপ্য, তার সবটাই আমাদের স্কুল পাচ্ছে।”

স্কুলের পুরোনো চেহারা
হরিনাভি জায়গাটা পুরোপুরি শহর বলা চলে না। এই এলাকায় বিভিন্ন পেশা, আয়ের, শিক্ষার, সংস্কৃতির মানুষের বাস৷ তাই বেশিরভাগ মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবার থেকেই ছাত্ররা এই স্কুলে পড়তে আসে। তাই পড়াশোনায় অতিরিক্ত যত্ন নেন স্কুলের শিক্ষকরা। এখানে, একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান, বাণিজ্য ও কলা বিভাগ পড়ার ব্যবস্থা আছে। এই স্কুলের আর একটা ভালো দিক সেটা হচ্ছে, সব বিষয়ের জন্য শিক্ষক এখানে রয়েছেন।
২০১৬ সালে হরিনাভি ডি ভি এ এস হাইস্কুল ১৫০ বছর পার করে এখন ১৫৭ বছরে পড়েছে। শতাব্দী প্রাচীন স্কুলটিকে যত্ন করে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্কুলের শিক্ষকরা।
“আমাদের স্কুল কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তায় ‘Atal Tinkering Labs’ নামের অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি পেয়েছে। এই ল্যাবরেটরিতে স্কুলের পড়ুয়াদের ড্রোন তৈরি, রোবট তৈরি শেখানো হচ্ছে”, বলে জানালেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
খেলাধুলা তো হয়ই এই স্কুলে। এখানকার ছাত্ররা রিলায়েন্স কাপ সহ অন্যান্য খেলায় অংশ গ্রহণ করে।


২০১৬ সালে হরিনাভি ডিভিএএস হাইস্কুল ১৫০ বছর পার করে এখন ১৫৭ বছরে পড়েছে। বয়সে প্রবীন হলেও এখনও স্কুল ভবন, স্কুলের নিজস্ব মাঠ, ক্লাসরুম সবই নবীন। শতাব্দী প্রাচীন স্কুলটিকে যত্ন করে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্কুলের শিক্ষকরা।

দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ এক সময় স্কুলের জন্য যে পরিশ্রম করেছিলেন, তাঁর ভাগিনেয় শিবনাথ শাস্ত্রী রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ গ্রন্থে তাঁর মাতুল সম্পর্কে লিখেছেন,
“রাত্রি ১১টার সময় শয়ন করিতে যাইবার পূর্বে দেখিয়াছি তিনি কার্যে মগ্ন আছেন, রাত্রি ৪টার সময়ে উঠিয়া দেখিয়াছি তিনি কার্যে মগ্ন আছেন। আমার বয়সের মধ্যে প্রত্যূষে উঠিয়া তাহাকে কখনো ঘুমাইতে দেখিয়াছি এরূপ মনে হয় না।”
এছাড়াও দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ যখন সংস্কৃত কলেজে অধ্যয়ন করেন ও পরে অধ্যাপক হিসাবে নিযুক্ত হন, তখন নিজের গ্রাম চাংড়িপোতা, বর্তমানে যা সুভাষগ্রাম, সেখান থেকে কলকাতায় যাবার কোনো যানবাহন ছিল না। ১৮৬২ সালে চালু হয় মাতলা রেল। সেটা ছিল শিয়ালদহ-ক্যানিং শাখা। রেল চালু হবার আগে তিনি পায়ে হেঁটেই কলকাতায় যাতায়াত করতেন। সেকালে অনেক পদস্থ ব্যক্তি একরকম ছক্কর গাড়িতে চেপে সোমবার রাজপুর-হরিনাভি থেকে কলকাতায় যেতেন। আবার শনিবার কলকাতা থেকে ঐ গাড়িতে বাড়ি ফিরতেন। দ্বারকানাথকে কখনো ঐ গাড়িতে চড়তে দেখা যায়নি।

২০২২-এ স্কুলের হস্তশিল্প প্রদর্শনী
তিনি মনে করতেন শ্রমের কোনও বিকল্প নেই। শিক্ষাজীবনে শ্রমই পরবর্তী জীবনে মানুষকে সাফল্যের দরজা পৌঁছে দেয়। তার প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে শিক্ষকরা সেই আদর্শেই ছাত্রদের পড়াচ্ছেন। দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ নিজে ছিলেন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও সমাজসেবক। তাঁর হাতে তৈরি এই স্কুলের পড়ুয়ারা তেমন হবে, এটাই সবার আশা।
__________________
তথ্যসূত্র:- বিক্রমজিৎ মণ্ডল, প্রধান শিক্ষক, হরিনাভি ডিভিএএস হাইস্কুল
ছবি:- সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।
