গড়িয়া হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় : নারীশিক্ষার ভাবনা থেকেই যে স্কুলের জন্ম

সাংবাদিক শিবপ্রিয় দাশগুপ্তের কলামে ‘আমাদের ইস্কুল’ – পর্ব ২০

৯৫৪ সালে গড়িয়া অঞ্চলে সেই অর্থে মেয়েদের পড়ার কোনও স্কুল ছিল না। তাই নারীশিক্ষার ভাবনা থেকে গড়িয়া হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের (Garia Harimati Debi Uchcha Balika Vidyalaya) যাত্রা শুরু ১৯৫৪ সালের ২ জানুয়ারি। বলছিলেন স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালী গোস্বামী। তাঁর কথায়, “তবে ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত এই স্কুলের নিজস্ব কোনও ভবন ছিল না। গড়িয়া বরদা প্রসাদ হাই স্কুল ভবনেই প্রাতঃকালীন বিভাগ হিসাবে হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের ক্লাস চলত। ১৯৫৫ সালের পয়লা জানুয়ারি এই স্কুল সরকারি অনুমোদন পায়। ১৯৫৬ সালে গড়িয়ার এই স্কুলের ছাত্রীরা নিয়মিত ছাত্রী হিসাবে প্রথম স্কুল ফাইনাল পরীক্ষা দেয়।”

এর পর বিভূতিভূষণ ঘোষাল, ললিত মোহন সরকার, রজনীকান্ত নস্কর, চুণিলাল দাশগুপ্তর মতো কিছু শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিরা ভাবলেন হরিমতি দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের একটি নিজস্ব ভবন দরকার, কেন না ইতিমধ্যেই ছাত্রী সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। এই শিক্ষানুরাগীদের উদ্যোগে ১৯৭০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গড়িয়া বরদা প্রাসাদ হাইস্কুল থেকে আলাদা হয়ে সেই  স্কুলের পাশেই, গড়িয়া স্টেশন রোডের উপর হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নতুন ভবনে চলে আসে। সেই থেকে আজ এখনও পর্যন্ত ওই একই ভবনে হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের পঠনপাঠন চলছে।

স্কুলের এই জমিটি দান করেন কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক ব্যক্তি। তাঁর মায়ের নাম ছিল হরিমতী বন্দ্যোপাধ্যায়। মায়ের নামেই কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় আড়াই বিঘা জমিটি দান করেন। এই জমিতেই এখন গড়িয়া হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় দাঁড়িয়ে আছে।১৯৮১ সালের অগস্ট মাসে এই স্কুলে উচ্চতর মাধ্যমিকের কলা বিভাগ চালু হয় প্রথমে, তারপর ১৯৮৫ সালে বিজ্ঞান বিভাগে পড়ানো শুরু হয়। এখন কলা ও বিজ্ঞান, দুই বিভাগেই উচ্চমাধ্যমিকে পঠনপাঠন চলছে। ২০০১ সালে গড়িয়া হরিমতি দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে কম্পিউটার স্বাক্ষরতা প্রকল্প শুরু হয়।

এবছর, অর্থাৎ ২০২৩ সালে স্কুলের মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ নম্বর হয়েছে ৬৭০ (৯৫.৭১%)। ১৯৮ জন পরীক্ষার্থী সবাই পাশ করেছে। ২০২৩-এ উচ্চমাধ্যমিকে সর্বোচ্চ নম্বর হয়েছে ৪৬৬। পরীক্ষার্থী ছিল ১২১ জন, সবাই পাশ করেছে।স্কুলের লেখাপড়ার পাশাপাশি অন্যান্য সব দিকেই স্কুলের ছাত্রীদের উৎসাহদানের কাজ স্কুলের তরফে করা হয়। ২০২২ সালে পরিচ্ছন্নতার জন্য সর্বশিক্ষা মিশন থেকে ‘নির্মল স্কুল পুরস্কার’ পায় গড়িয়া হরিমতি দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়। টেলিগ্রাফ স্কুল অ্যাওয়ার্ড থেকে ‘ইকো ফ্রেন্ডলি ইনিশিয়েটিভ অ্যাওয়ার্ড’ (Eco Friendly Initiative Award) পেয়েছে এই স্কুল। এছাড়া টেলিগ্রাফ থেকে এই বছর ‘স্টুডেন্ট অফ দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় পঞ্চম হয়েছে এই স্কুলেরই ছাত্রী অন্তর্জিতা পাল। 

 

বর্তমানে স্কুলে ছাত্রী সংখ্যা ১৬০০-র কিছু বেশি। স্থায়ী শিক্ষিকা হিসাবে মোট ৩৮ জন কর্মরত। এছাড়া পার্টটাইম, প্যারা টিচার মিলিয়ে মোট শিক্ষিকার সংখ্যা ৫০ জন। ছাত্রী-শিক্ষিকা অনুপাতও ঠিক আছে বলে জানান প্রধান শিক্ষিকা। বর্তমানে দু’টো দোতলা ভবন মিলিয়ে স্কুলে মোট ২৮টি ঘর আছে। প্রধান শিক্ষিকা বলছিলেন, “এই জায়গা যথেষ্ট নয়। ক্লাস চালাতে কিছুটা সমস্যা তো হয়ই। তাই স্কুল ভবনটি বড়ো করে, তিনতলা করার উদ্যেগ নেওয়া হয়েছে।”স্কুলে পদার্থ, রসায়ন, জীববিদ্যা, ভূগোলের ল্যাবরেটরি আছে। এছাড়া কম্পিউটারের জন্য আলাদা দুটো ল্যাবরেটরিও আছে। এর মধ্যে একটা নবম থেকে দশম শ্রেণির জন্য। অন্যটা একাদশ, দ্বাদশ শ্রেণির জন্য। এছাড়া, ছাত্রীদের কোডিং শেখানোর জন্য আলাদা ল্যাবরেটরি আছে। একটি বেসরকারি সংস্থা এই কোডিং ল্যাবরেটরি তৈরি করে দিয়েছে। গত বছর সপ্তম ও নবম শ্রেণির ছাত্রীদের কোডিং শেখানো হয়েছে। এই বছর ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীদের কোডিং শেখানো হচ্ছে। আর গত বছর সপ্তম ও নবমের ছাত্রীদের কোর্স যতটুকু শেখা বাকি আছে, সেটা সম্পূর্ণ করা হবে।

স্কুলে সরকারের ঠিক করে দেওয়া যেসব অনুষ্ঠান আছে তা পালনের পাশাপাশি, স্কুলে আলাদা করে ৫ জুন পরিবেশ দিবস, ২ জানুয়ারি স্কুলের প্রতিষ্ঠা দিবস উল্লেখযোগ্য ভাবে পালিত হয়। ২০২৩-এর ২ জানুযারি স্কুলে হরিমতী দেবীর একটি মূর্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই বিষয়ে উদ্যোগ নিয়েছেন স্কুলের বর্তমান প্রধান শিক্ষিকা পিয়ালী গোস্বামী।

হরিমতী দেবীর মূর্তি

স্কুলের শিক্ষিকা ইন্দ্রাণী রায় সেনগুপ্ত স্কুলের ছাত্রীদের নিয়ে খুব গর্বিত। তিনি বলছিলেন, “ছাত্রীদের গুণাবলী আমাদের স্কুলের সম্পদ। পড়াশোনা তো আছেই এছাড়া অন্যান্য বিষয়েও আমাদের মেয়েরা পারদর্শী। শুধু তাই নয়, যোগ্যতা ও দক্ষতার স্বীকৃতিস্বরূপ বহু বিজ্ঞান বিষয়ক, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে ওরা বিজয়ীর শিরোপা পাচ্ছে, স্কুলের নাম উজ্জল করছে। মেধা অন্বেষণ পরীক্ষা, আমাদের স্কুলের কোডিং শিক্ষার কোর্স, নাচ,গান, এনসিসি সবেতেই আমাদের মেয়েরা যোগ্যতার ছাপ রাখে। আসলে আমাদের মেয়েদের শেখার আগ্রহ অপরিসীম। অনেকে বলে বাচ্চারা পড়তে চায় না, আমাদের ছাত্রীদের মুখে এই ‘না’ শব্দটা নেই। এই যেমন এখন, গরমের ছুটিতে আমরা দশম ও উচ্চমাধ্যমিকে ছাত্রীদের অনলাইন ক্লাস করাচ্ছি, ওদের আগ্রহ দেখলে অবাক হয়ে যেতে হয়। লকডাউনের সময়ও আমরা ওদের মধ্যে একই জিনিস দেখেছি। ২০০৬ সাল থেকে আমি এই স্কুলে আছি, আমার এমন একটা দিন কাটে নি যেদিন স্কুলে এসে আমার খারাপ লেগেছে। স্কুল বন্ধ থাকলে, ছাত্রীদের সঙ্গে দেখা না হলে, মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রীরা নাচে, গানে পারদর্শীতার পরিচয় দেয়। আমি অর্থনীতির শিক্ষিকা। তবে, স্কুলের অনুষ্ঠানে ছাত্রীদের নাচের প্রশিক্ষণ আমিই  দিই। আর আরেকটা উল্লেখযোগ্য দিক হল, ওরা ভীষণ কৌতূহলী, প্রশ্ন করতে ভালোবাসে। এই জানার ইচ্ছেটাই ওদের পাথেয়।”গড়িয়া অঞ্চলে ‘ভালো স্কুল’ হিসাবে হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে। ছাত্রী-শিক্ষিকাদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা স্কুলকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে বলেই বিশ্বাস ইন্দ্রাণীদেবীর। শিক্ষিকাদের কথায়, ভালো ছাত্রীকে তৈরি করার একটা নির্ভেজাল তৃপ্তি আছে, যে তৃপ্তি তাঁরা পান। এটাই তাঁদের সাফল্য। 

_____________________________________________________
তথ্য সূত্র : পিয়ালী গোস্বামী, প্রধান শিক্ষিকা, গড়িয়া হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়
ইন্দ্রাণী রায় সেনগুপ্ত, অর্থনীতির শিক্ষিকা, গড়িয়া হরিমতী দেবী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়
ছবি: সংগৃহীত
*কলকাতা, শহরতলি বা জেলার কোনও না কোনও স্কুলের সঙ্গে জুড়ে রয়েছে গর্বের ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার বুনিয়াদি গল্প। এবার সেদিকেই ফিরে তাকিয়ে চলছে নতুন ধারাবাহিক ‘আমাদের ইস্কুল’। সমস্ত পর্ব পড়তে
এখানে ক্লিক করুন। চোখ রাখুন প্রতি বুধবার সন্ধে ৬টায়, শুধুমাত্র বঙ্গদর্শনে।

Developed by DXDasia