ছুটির দিনে শহর সাফাই, উদ্যোগে সৌম্যদীপ-রৌনকরা
কলকাতা এক বৈপরীত্যের শহর। একদিকে এ শহরকে নিয়ে মানুষ গর্ব করেন, ভালোবাসেন, ‘রোমান্টিসাইজ’ করেন আবার অন্যদিকে, শহরের রাস্তাঘাট, মাঠে-ময়দানে জঞ্জাল ফেলে বেড়ান। প্রাক করোনা কালের হিসাব বলছে, ফি দিন কলকাতায় ৪০০০-৪৫০০ টন কঠিন বর্জ্য তৈরি হয়। কেবল কঠিন বর্জ্যই এত! বলা বাহুল্য, দিনে দিনে পরিমাণ বেড়েছে বৈ কমেনি। এই বিপুল পরিমাণ আবর্জনা, জঞ্জালের কিয়দাংশের গতি হয় না। পড়ে থাকে শহরের বুকেই। শহরের বুক থেকে সেই জঞ্জালের বোঝা সরাতে এগিয়ে এসেছেন গুটি কয়েক তরুণ, যুবক। তাঁদের কেউ চাকরিজীবী, কেউ পড়ুয়া। গড়ে তুলেছেন, ‘ক্লিন আপ হেইস্ট’, ‘ক্লিন আপ কলকাতা’র মতো স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা। ময়দান হোক বা গঙ্গার ঘাট, যত্র জমছে আবর্জনা তত্র ঝাঁপিয়ে পড়েন সৌম্যদীপ, রৌনকরা। শহরকে জঞ্জাল মুক্ত করার যেন ব্রত নিয়েছেন তাঁরা। সম্প্রতি শ্রমজীবী নারী দিবসে তাঁরা কলকাতার ময়দানকে আবর্জনা মুক্ত করেছেন।
৮ মার্চ ‘ক্লিন আপ হেইস্ট’, ‘ক্লিন আপ কলকাতা’র প্রায় পঞ্চাশ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবক জড়ো হয়েছিলেন কলকাতা ময়দানে রাজা রামমোহন রায়ের মূর্তির পাদদেশে। দিনভর তাঁরা ময়দানকে আবর্জনামুক্ত করেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই কলেজ পড়ুয়া। এ কাজে সাহায্য করেছিল আরও তিনটি সংগঠন, সেগুলি হল নাইট রাইডার ফ্যান ক্লাব, স্কুল অফ বার্ডস এবং সংকল্প ওয়েলফেয়ার কমিটি।

৮ মার্চ ‘ক্লিন আপ হেইস্ট’, ‘ক্লিন আপ কলকাতা’র প্রায় পঞ্চাশ জনের বেশি স্বেচ্ছাসেবক জড়ো হয়েছিলেন কলকাতা ময়দানে রাজা রামমোহন রায়ের মূর্তির পাদদেশে। দিনভর তাঁরা ময়দানকে আবর্জনামুক্ত করেন। এদের মধ্যে অধিকাংশই কলেজ পড়ুয়া।
বঙ্গদর্শন.কম-এর তরফে যোগাযোগ করা হয়েছিল সৌম্যদীপ চৌধুরীর সঙ্গে, তিনি ‘ক্লিন আপ হেইস্ট’র প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। তিনি জানাচ্ছেন, “ক্লিন আপ কলকাতা তৈরি হয়েছিল ২০২৫ সালের নভেম্বরে। ক্লিন আপ হেইস্ট তৈরি হয়েছে ২০২৬ সালে। আমি ব্যাঙ্গালুরুতে থাকতে ‘প্লগিং’ শুরু করি। আমার একটা স্টার্ট আপ ছিল। তারপর নাসিকে আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। কলকাতায় ফিরে আসি। সব সময় কিছু একটা করতে চাইতাম। তখন আমি ক্লিন আপ কলকাতা উদ্যোগে শামিল হই। আমার একটা রিল ভাইরাল হয় সমাজ মাধ্যমে। তখন মানুষ এই উদ্যোগে শামিল হতে চেয়ে আমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করে। ক্লিন আপ কলকাতা প্রতি মাসে একদিন করে ‘প্লগিং’ করত। তারপর দু’মাস হল আমি কলকাতা হেইস্ট তৈরি করে মাসে দু’টো-তিনটে দিন করে প্লগিং করার চেষ্টা করছি।”
আরও পড়ুন: প্লাস্টিক দূষণের চালচিত্র
উল্লেখ্য, দৌড়ানো বা জগিং করতে করতে অর্থাৎ ছুটতে ছুটতে পথের ধারে বা চারপাশে পড়ে থাকা প্লাস্টিক এবং অন্যান্য আবর্জনা তুলে নির্দিষ্ট জায়গায় জড়ো করার ধারণাই হল ‘প্লগিং’। ‘প্লগিং’-র জন্ম সুইডেনে হলেও এখন ইউরোপের নানা দেশে এবং এশিয়ার জাপান-সহ বেশ কয়েকটি দেশে ও ভারতের মেট্রো শহরগুলিতে ‘প্লগিং’ খুবই জনপ্রিয়। দেশ-বিদেশে ফিটনেস ক্লাবগুলির তরফে ‘প্লগিং’-র আয়োজন করা হয় নিয়মিত।

সৌম্যদীপ জানাচ্ছিলেন, সম্প্রতি কসবার একটি পুকুরকে তাঁরা আবর্জনা মুক্ত করেছেন। তার আগে আহিরীটোলা ঘাটে, সদ্য ৮ মার্চ নারী দিবসে ময়দানে তাঁরা ‘প্লগিং’-র আয়োজন করেছেন। রবিবার, সপ্তাহান্তের দিন দু’টি ও ছুটির দিনগুলিকে সৌম্যদীপেরা বেছে নেন এই কাজের জন্য। গোটা কাজটাই করা হয় স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে। মূলত সমাজমাধ্যম এবং হোয়াটস্ অ্যাপ কমিউনিটির (হোয়াটস্ অ্যাপ গ্রুপ) মাধ্যমে মানুষ সমবেত হন। শহরের ঐতিহ্যবাহী স্থান, গঙ্গারঘাটগুলিকে আবর্জনামুক্ত করে ক্লিন আপ কলকাতা। সৌম্যদীপ, তাঁর ক্লিন আপ হেইস্ট-র বাহিনী নিয়ে শহরের নানান জায়গায় ‘প্লগিং’ করেন। তিনি মানুষের কাছে জানতে চান, বলেন কোনও স্থানে জঞ্জাল, আবর্জনা থাকলে ছবি পাঠাবেন, লোকেশন জানাবেন। সেই দেখে ‘প্লগিং’-র জায়গা নির্বাচন করেন।
সৌম্যদীপ বলেন, “অনেকেই কাজ দেখে এগিয়ে আসেন। অনুপ্রাণিত হন। বলেন ভালো কাজ করছেন। প্রশংসা করেন। স্থানীয়রাও অনেকে এগিয়ে আসেন। আহিরীটোলা ঘাটে প্লগিংয়ের সময়, যাঁরা ওখানে নিয়মিত স্নান করতে আসেন, তাঁরাও আমাদের কাজে একটু সাহায্য করেছিলেন। কসবাতেও অনেকে এসে সাহায্য করেছেন। পৌরসভার সাফাই কর্মীরাও এগিয়ে এসে সাহায্য করেছেন। সবাই চান নিজের এলাকা পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন হোক।”
রবিবার, সপ্তাহান্তের দিন দু’টি ও ছুটির দিনগুলিকে সৌম্যদীপেরা বেছে নেন এই কাজের জন্য। গোটা কাজটাই করা হয় স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে। মূলত সমাজমাধ্যম এবং হোয়াটস্ অ্যাপ কমিউনিটির (হোয়াটস্ অ্যাপ গ্রুপ) মাধ্যমে মানুষ সমবেত হন।

মানুষকে সচেতন করাই তাঁদের আগামী পরিকল্পনা। স্কুল, কলেজে গিয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তোলা, বিভিন্ন মেলায় সচেতনতা শিবির আয়োজন করার কথা ভাবছেন সৌমদীপরা। শহরবাসীর প্রতি তাঁর বার্তা, “আপনারা যদি দায়িত্বশীল হন, তাহলে আমাদের আর ময়দানে যাওয়ার দরকার পড়ে না। একটা চিপস খেয়ে প্যাকেটটা পকেটে ঢুকিয়ে নিন। ডাস্টবিনে গিয়ে ফেলুন। এই ছোট ছোট কাজ করলেই অনেকটা হয়ে যাবে। মনে হবে একা! একজন করে কী বদল আর আসবে? কিন্তু একজন নয়। একজন একজন করে এগিয়ে এলে অনেক বড় সমস্যার সমাধান হবে। দীর্ঘমেয়াদি ফল মিলবে।”
পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, যত্রতত্র আবর্জনা ফেলা যাবে না, এ ভাবনার উপর ভর করে অনুচ্ছেদ, রচনা লিখে পরীক্ষার খাতায় নম্বর পাওয়া যায়। কিন্তু জীবনে ক’জন এর বাস্তবায়ন ঘটাতে পারে? অর্জিত বিদ্যার বাস্তব রূপায়ণ না-ঘটলে জীবনের ষোলোয়ানাই বৃথা হয়ে যাবে। রবি ঠাকুর সহজ পাঠে লিখেছিলেন, ‘আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। সব ছেলেরা দঙ্গল বেঁধে যাবে।’ এ যে কত বড় ‘কমিউনিটি বিল্ডিং’ ও ‘সিভিক সেন্স’ গড়ে তোলার শিক্ষা তা কল্পনাতীত! সৌম্যদীপদের প্লগিংয়ের উদ্যোগ আজকের ‘হাম দো হামারে এক’-র পৃথিবীতে একদিকে জন্ম দিচ্ছে ভ্রাতৃত্ববোধের, অন্যদিকে আবর্জনামুক্ত হচ্ছে শহর। সুন্দর আগামীর সংকল্পে তাঁদের কাজ চলতে থাকুক।