গান দিয়ে যে তোমায় খুঁজি : রবীন্দ্র-গানের ব্যতিক্রমী বিশ্লেষণ

সংকলন সাজিয়েছেন মৈনাক চক্রবর্তী

বীন্দ্রনাথ ভারতীয় সংস্কৃতির যে সব ধারাকে প্রতিভাত করেছেন, তার মধ্যে বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য হলো তাঁর গান; আবিশ্বের লোক যাকে রবীন্দ্রসংগীত বলে জানে। রবীন্দ্রনাথের গান বাঙালিদের জীবনে মাতৃভাষার মতোই অবিচ্ছেদ্য, একুশ শতকেও। রবীন্দ্রগান সাধনার সঙ্গে মনুষ্যত্বের পূর্ণতার সাধনার একটা যোগ আছে, যা জীবনের প্রতিটা মুহূর্তে জড়িয়ে থাকার। মুখস্থ নয়, আত্মস্থ করার। বহুস্তরীয় দর্শনে ডুব দিয়ে নতুন দিগন্ত খুলে দেওয়ার। সুচিত্রা মিত্র যেমন তাঁর ছাত্রীদের বলতেন, ‘রবীন্দ্র-দর্শন না জেনে শুধুমাত্র স্বরলিপি অনুযায়ী রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে কী হবে?’ এ কথা শুধু গাইয়ে নয়, শ্রোতাদের জন্যেও প্রযোজ্য। রবীন্দ্রসংগীতের তাৎপর্য কার চেতনায় কীভাবে বিস্ময়ের বিচ্ছুরণ জাগাবে, তা অননুমেয়। তাই, রবীন্দ্রগানের বিভিন্ন দিক, নেপথ্য ভাবনা নিয়ে অন্বেষণ ফুরবার নয়। এর অন্যতম উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে মৈনাক চক্রবর্তী’র লেখা ‘গান দিয়ে যে তোমায় খুঁজি’ গ্রন্থটি।

‘ডাক পড়েছে ওই’, ‘আপনি জাগাও মোরে’, ‘প্রাণ ভরি প্রকাশে’ – রবীন্দ্রনাথের গানের পথে বাইশটি নির্বাচিত বিষয়ের বিশ্লেষণ নিয়ে এই সংকলন সাজানো হয়েছে। রবীন্দ্র-দর্শনের সমস্ত তত্ত্বগুলি নিজের অনুভবে মেশাতে চেয়েছেন লেখক।

রবীন্দ্রনাথের গানের উৎসস্থল, গান-সম্বন্ধীয় আত্মসংলাপ, গানের মাধুর্য, নিরালা যাপন অথবা স্বপ্নিল, বাঙময় সৃষ্টি – এই সবকিছু নিয়েই মৈনাক চক্রবর্তী’র এই বই। গান দিয়ে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথকেই নয়,নিজেকেও খুঁজেছেন তিনি। রবীন্দ্রনাথই লিখেছিলেন, “আমার এ গানও জগতের গানে/ মিশে যায় নিখিলের মর্ম মাঝখানে;” পেশায় প্রযুক্তিবিদ এবং হৃদয়ে এক নিবেদিত ‘ঠাকুর’ভক্ত মৈনাক, রবীন্দ্রগানের ভেতর দিয়ে একজন মহামানবের পৃথিবীকে ছুঁয়ে দেখতে চেয়েছেন। এবং সেই দেখার সূক্ষ্মতম অনুভূতিকে ভাষায় অনূদিত করে পাঠকের সঙ্গে তা ভাগ করে নিতে চেয়েছেন। ‘ডাক পড়েছে ওই’, ‘আপনি জাগাও মোরে’, ‘প্রাণ ভরি প্রকাশে’ – রবীন্দ্রনাথের গানের পথে বাইশটি নির্বাচিত বিষয়ের বিশ্লেষণ নিয়ে এই সংকলন সাজিয়েছেন। রবীন্দ্র-দর্শনের সমস্ত তত্ত্বগুলি নিজের অনুভবে মেশাতে চেয়েছেন।

আমার ব্যথা যখন আনে আমায় তোমার দ্বারে
তখন আপনি এসে দ্বার খুলে দাও, ডাকো তারে।।

অথবা,

ডাকিল মোরে জাগার সাথি
প্রাণের মাঝে বিভাস বাজে, প্রভাত হল আঁধার রাতি।।

‘ডাক’ শব্দটি ফিরে ফিরে এসেছে রবীন্দ্রগানে। সে ডাক কখনও আহ্বান, কখনও ফেরার ডাক। কখনও সোচ্চার, কখনও নীরব। আবার, হঠাৎ ও অকারণ শব্দ দুটি সুনির্দিষ্ট এক চালচিত্রে সেজে ওঠে রবীন্দ্রনাথের গানে। “সারাদিন আঁখি মেলে/ দুয়ারে রব একা।/ শুভক্ষণ হঠাৎ এলে/ তখনই পাবো দেখা।” আলো-আঁধার, আনন্দ-বেদনা, অকারণ করুণা- হঠাৎ খুশি, অকারণ ডাকে হঠাৎ সাড়া- সব পূর্ণতা পায় অমোঘ এক গানে। সে গানে হঠাৎ কখনও আকস্মিক, কখনও অতর্কিত, আবার কখনও প্রার্থিত।

এভাবেই রবীন্দ্রগানে ব্যবহৃত শব্দ বা বাক্যের অনুষঙ্গ খোঁজার চেষ্টা করেগেছেন মৈনাক। ড. শৈবাল বসু যথার্থ বলেছেন, “রবীন্দ্রগানের টেক্সট ঘিরে মৈনাক খুঁজে নেন একাধিক আত্মকথন ও দ্বিরালাপ, পড়তে পড়তে আমাদেরও ইচ্ছে হয় ভেতরের “আমি”—চার দিকে ফিরে তাকাবার। পথও পন্থা, ভাঙন ও উত্তরণ, আকার ও অরূপ, বেদনা ও বিদ্যা, চৈতন্য-অচৈতন্য সবকিছুর আপাত বিরোধ কীভাবে দ্রব হয়ে যায় গান পাঠের বিরল সেই কিনারে, মৈনাক অত্যন্ত সহজ চলনে তা প্রকাশ করেছেন এই নিবন্ধগুলিতে।”  p /> p

রবীন্দ্রনাথের গানে বারবার ব্যবহৃত ‘জাগা’ বা ‘জাগরণ’ শব্দটি নিয়েও মৈনাক এই বইতে আলোচনা করেছেন। রবীন্দ্রনাথের “জাগরণ” উপপর্যায়ে গানের সংখ্যা ছাব্বিশ। মৈনাক লিখেছেন, রবীন্দ্রনাথের জাগরণ বিমল আনন্দে জাগা, তাই তো তিনি বলতে পারেন—আনন্দ রয়েছে জাগি ভুবনে তোমার। জাগার বড়ো প্রয়োজন আজ আমাদের সার্বিকভাবে। জাগতে হবে গানে, অন্তরে, সমাজে, চিন্তায়-চেতনায়।

___________________
গান দিয়ে যে তোমায় খুঁজি – মৈনাক চক্রবর্তী | প্রকাশক- পেনপ্রিন্টস্‌ | মূল্য- ৩৯৯
প্রাপ্তিস্থান | Amazon India –
https://www.amazon.in/dp/8198471936
অফলাইনের জন্য যোগাযোগ | ৯৮৩০৬ ৮৩৬৫৫

 

Developed by DXDasia