সেকালে গেরস্ত বাড়ির ভাঁড়ার ঘরে থাকত সমুদ্রের ফেনা থেকে বাঘের নখ!

এমনকি থাকত কুমিরের দাঁত, সজারুর কাঁটা, অর্জুন গাছের ছাল, ধূপের মশলা

আজ আবার ফিরে যেতে ইচ্ছা করছে কল্যাণী দত্তের বিখ্যাত বই থোড় বড়ি খাড়া-র দুনিয়ায়। তাঁর স্মৃতিকথায় আর পূর্ণেন্দু পত্রীর চিত্রণে এক অদ্ভুত কোলাজ তৈরি হয়েছে। পাঠক বছরের পর বছর রীতিমতো গোগ্রাসে গিলেছে এই গ্রন্থ।

সেকেলে কলকাতার বড়ো বড়ো সব বাড়ির রান্নাঘরের দাওয়ায় পড়ে থাকত ভাঙা ফুটো সব জিনিস। এই যেমন পুরোনো লোহার কড়া বা শিক, বালিভরা হাঁড়িতে কাঁঠাল বিচি, বিভিন্ন ওষুধ, বালতি বালতি জল, দড়িবাঁধা নারকোল ছোবড়া, মাটির গেলাস আরও কত কি! থাকত অন্ততপক্ষে তিনটি শিলনোড়া — একটিতে শুকনো মশলা পেষা, একটিতে জল-বাটনা, আরেকটিতে নারকোল বা ছানা ক্ষীর বাটা। পাশে থাকত একখানা পাথর, যাতে পেঁয়াজ আর মাছ বাটা হত। কল্যাণী দত্ত বিশ শতকের শুরুর দিকের রান্নাঘরের এই ছবি বলতে গিয়ে বলছেন, "চওড়া চোখ আঁকা খাঁড়ার মতো আঁশবটিতে দশসেরি মাছের মুড়ো স্বচ্ছন্দে কাটা যেত, তাছাড়া তরকারি ফল আর সরু আলুভাজা কাটার বঁটি থাকত৷ 'বীরভদ্দর' জাঁতার ওপর তামার ঘড়ায় গঙ্গাজল, ছোটো জাঁতার ওপর পেতলের ঘড়ায় নিত্যিকার খাবার জল বা 'কূপজল' থাকত। কল থেকে ভরে নিয়ে প্রসাদী ঠাকুর 'ভ্যালা রে বড়ো বউ, ভ্যালা রে মেজো বউ' বলতে বলতে অক্লেশে দুই দুই ভারি ঘড়া তুলে আনত।"

রান্নাঘরের পাশেই অন্ধকার ভাঁড়ার ঘর। সেখানে নানারকম কাচের বয়াম। সিন্দুকে তিন রকমের চাল, বোয়েমে আমসি, আমচুর, আমসত্ত্ব, বড়ি। থাকত রসকুল, কুলচুর, গোলা তেঁতুল। আর ড্যালা পাকানো ঘি তো অবশ্যই থাকবে। আর কী কী থাকত জানেন? সমুদ্রের ফেনা, হরিণের শিং, বাঘের নখ, কুমিরের দাঁত, সজারুর কাঁটা, অর্জুন গাছের ছাল, উনুনের পোড়া মাটি, ধূপের মশলা। গোটা বিশ্ব যেন ভাঁড়ার ঘরে আটকে। 

সে এক সময় ছিল বটে। যখন ভেজাল নামক শব্দটির উৎপত্তি হয়নি। নিম্নবিত্ত আর উচ্চবিত্তের বিভাজন কি খুব বেশি ছিল! তবুও বিশ শতকের গোড়ার এইসব কালজয়ী ছবি এখনও আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। এখনও মা-ঠাকুমাদের ভাড়ার ঘর উপচে পড়ে কাচের বয়ামে। সেখানে হরেকরকম আচার। আজ আর উনুনের রেওয়াজ নেই। সেকেলে কলকাতায় নাকি মেয়েদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ ছিল কুটনো কাটা।

এখন এইসব নারী-পুরুষ বিভাজন রেখা অনেকখানি চলে গেছে। উনিশ শতকীয় ধ্যানধারণা পাল্টে মানুষ রঙিন হয়েছে, সচেতন হয়েছে। রাজনীতি বোধ জেগেছে ধীরে ধীরে। তাই রান্নাঘর আর শুধুমাত্র মেয়েদের একমাত্র ঠিকানা হয়ে থাকেনি, সেখানে ঢুকে পড়েছে পুরুষরাও। ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্যি, বিশ্বের সেরা সেরা শেফ কিন্তু পুরুষ। নারী মানেই তাঁর হাতে রান্নার একটা আলাদা গন্ধ আছে— এই ধরনের প্রাচীন ধারণাগুলি ভেঙে আজ আমাদের নিজেদের সবকটি শাখা প্রসারিত করার সময়। এই আকালে আরও একবার ফিরে যাবার সময় কল্যাণী দত্তের এসব অনবদ্য লেখায়। আর এই কোভিড-১৯ এর লকডাউন তো নারী-পুরুষ বিভাজন রেখা অনেকখানি সারিয়েও তুলল। এখন বাড়ির সমস্ত কাজ ভাগ করে নেওয়া হচ্ছে। রান্নাঘর হয়ে উঠেছে নারী-পুরুষ-শিশুদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র।

ঋণ : কল্যাণী দত্ত, থোড় বড়ি খাড়া, থীমা প্রকাশনী | গ্রন্থচিত্রণঃ পূর্ণেন্দু পত্রী

Post Tags
Developed by DXDasia