চতুর্ভুজ : সময়ের ক্যানভাসে চার শিল্পীর ভিন্ন নির্মাণ

একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এ চলছে এই প্রদর্শনী

কাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর নর্থ, সাউথ আর নিউ সাউথ গ্যালারি জুড়ে চলছে ‘চতুর্ভুজ’ নামের একটি প্রদর্শনী। প্রদর্শনীটি কিউরেট করেছেন দেবদত্ত গুপ্ত, ডিজাইন করেছেন পার্থ দাশগুপ্ত। নামেই বোঝা যাচ্ছে, চারজন শিল্পীর কাজ নিয়ে চতুর্ভুজ প্রদর্শনী। শিল্পী সুশান্ত চন্দ্র কর্মকার, কুন্তল দত্ত, দেবাশিস ধারা এবং প্রদীপ ঘোষের কাজ রয়েছে। অগ্নিভ চৌধুরী এই প্রদর্শনীতে ব্যবহৃত মনোক্রোম্যাটিক ফোটোগ্রাফিগুলি করেছেন। চমৎকারভাবে চার শিল্পীকে পাওয়া যায় এই ফোটোগ্রাফগুলোয়। প্রদর্শনীটি উদ্বোধন করেন রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শ্রী পবিত্র সরকার, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের চলচ্চিত্র বিদ্যার প্রাক্তন অধ্যাপক সঞ্জয় মুখোপাধ্যায়, আইপিএস অমিত পি. জাগলভি। প্রদর্শনী পরিবেশনা করেছেন জয়দীপ ঘোষ (আর্ট ও আর্টিস্টস)। চারজন শিল্পীর কাজ চারটি পথ নির্মাণ করলেও তাঁরা একই পরিবর্তনশীল সময়ের কথা বলছেন। প্রদর্শনীতে শিল্পীদের মনোস্তাত্ত্বিক অস্থিরতাই ক্যানভাসে চার রকম মাইন্ডস্কেপ তুলে এনেছে।

এ প্রদর্শনীতে কুন্তল দত্তের একটি গোলাপি রাত্রের ছবি মায়াভরা রোম্যান্টিক সফরে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দর্শকমনকে। একটা পরিবর্তনশীল নিসর্গকে ধরলেও সেখানে নির্জনতা প্রবল। এখানেও আবার গগন ঠাকুরের সঙ্গে মিল রয়েছে।

কুন্তল দত্তের ছবি

শিল্পী কুন্তল দত্তর ছবি দেখেই প্রথম গগন ঠাকুরের ছবির কথা মনে পড়বে। সেখানে ঐ একইরকম থিয়েট্রিকাল আলোর ব্যবহার, জ্যামিতিক ফর্মে ভেঙে একটা লোকালয়কে ধরার চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু কখনোই পশ্চিমী কিউবিস্ট ছবির মতন কেঠো হয়ে যায়নি। বাংলার আলো, গাছ, ঘর, চাঁদ আঁকলে সেসব মনে রাখলে চলে না। এসব তো বাংলার একান্তই নিজের। ছবির প্রাণটাই সেখানে শেষ কথা। হলুদ রঙের ব্যবহারে ছবির অন্তঃস্থিত আলো যেন বাইরে এসে দর্শকের অনুভূতিজগতকে শান্ত করে। এই রঙের ব্যবহারে আলো নড়েচড়ে একটা অপটিকাল ইলিউশন সৃষ্টি করে। সময় লাগে ছবির প্লেসমেন্টগুলো বুঝে উঠতে। এ প্রদর্শনীতে কুন্তলের একটি গোলাপি রাত্রের ছবি মায়াভরা রোম্যান্টিক সফরে ভাসিয়ে নিয়ে যায় দর্শকমনকে। একটা পরিবর্তনশীল নিসর্গকে ধরলেও সেখানে নির্জনতা প্রবল। এখানেও আবার গগন ঠাকুরের সঙ্গে মিল রয়েছে।

সুশান্ত চন্দ্র কর্মকারের ছবি

শিল্পী সুশান্ত চন্দ্র কর্মকারের ছবিগুলি নৈসর্গিক। অনন্তের খোঁজ রয়েছে। সেখানে তৈরি হয়েছে কাঁচা উজ্বল ও ম্লান রঙের একটা কালারস্কেপ। দিগন্তরেখা না থাকায় দেশান্তরের যন্ত্রণার প্রকাশ মেলে। শিল্পী যেন অস্বীকার করছেন কাঁটাতারের ভৌগোলিক সীমানাকে। আসলে শিল্পী যা সুন্দর তারই খোঁজ করেন চিরকাল। তাই তো ওঁর ছবিতে সুবিস্তৃত মাঠ, পাথুরে পাহাড়, নীল জল এমনভাবে রয়েছে। একই সঙ্গে উৎখাত, স্থানান্তর, পুনর্বাসন রয়েছে ছবিগুলির পরতে পরতে। সেসব স্মৃতি থেকেই শিল্পীর মাইন্ডস্কেপ একপ্রকার কনভার্সেশন তৈরি করতে চাইছে।

 

প্রদীপ ঘোষের ছবি

শিল্পী প্রদীপ ঘোষের ছবি আকারে বিশাল। সেখানে সমাজের ওপর সময়ের ছাপ সুস্পষ্ট। শক্তিশালী রঙের ভঙ্গুর স্ট্রোকের ব্যবহারে ছবিগুলো দমবন্ধ করে দেয়। ভাবতে বাধ্য করে দূষণের কথা। হাঁপ ছাড়ার অবকাশ মেলে না। ভাবায় আমরা প্রকৃতিকে ছিঁড়ে ধ্বংস করছি, নিজের মনকে বিষময় করে তুলছি। দূষণ তো শুধু বাইরের নয়, মনেরও, সে কথা মনে করায়। প্লাস্টিকময় জলাশয়, কারখানার রাসায়নিক মিশ্রিত জল, একটা ধ্বসে যাওয়া সিস্টেম, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, প্রশাসনিক অক্ষমতা, মানুষের উদাসীনতা ইত্যাদি রয়েছে ওঁর ছবির ছত্রে-ছত্রে। আপনি হাঁপিয়ে উঠবেন এতকিছু একই ছবিতে রয়েছে। রবীন্দ্রনাথের ‘সভ্যতার সংকট’ শব্দবন্ধনী মনে পড়ছে। একটা গোটা ক্ষয়প্রাপ্ত সময়কে ধরতে গিয়ে শিল্পীর কী প্রবল যন্ত্রণা হয়েছে ভাবুন, তাই সে ছবি দেখতে গেলে এটুকু অস্থিরতা তো সহ্য করতেই হবে দর্শকদের।

শিল্পী দেবাশিস ধারার ছবি সবচাইতে বেশি আশ্চর্য করবে দর্শককে। কাঁচা ফ্লুরোসেন্ট পিঙ্ক, টারকুয়াইস গ্রিন, হলুদ, কালো, প্রুসিয়ান ব্লু, লাল পাঁচমেশালি রঙের উজ্বল ব্যবহারে ছবিগুলো অনেক বেশি ঝলমলে। পশ্চিমী অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবির প্রভাব দেখা যায় অনেক জায়গায়।

দেবাশিস ধারার ছবি

শিল্পী দেবাশিস ধারার ছবি সবচাইতে বেশি আশ্চর্য করবে দর্শককে। কাঁচা ফ্লুরোসেন্ট পিঙ্ক, টারকুয়াইস গ্রিন, হলুদ, কালো, প্রুসিয়ান ব্লু, লাল পাঁচমেশালি রঙের উজ্বল ব্যবহারে ছবিগুলো অনেক বেশি ঝলমলে। পশ্চিমী অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবির প্রভাব দেখা যায় অনেক জায়গায়। ওঁর ছবিতে এক অশান্ত সময়, স্তরে-স্তরে রূপক আখ্যান, দুঃখ, চরিত্রের মধ্যে বিভিন্ন সংলাপ দানা বেঁধেছে। ভাঙা লাইন, ভাঙা রঙের স্ট্রোক, ফিগারেটিভ ডিস্টোরশন এসব নিয়ে শিল্পীর রেভোলুশনারি আবির্ভাব যাকে বলে।

চতুর্ভূজ সমমনস্ক চারটি মনের প্রবল প্রকাশ রেখেছে। তাঁদের কাজের ধারা একসঙ্গে মিলে যে চিত্র ভাষার নির্মাণ করেছে — সেখানে জীবনের দেখা, সহ্য করা, শেখা বৃহত্তর সামাজিক বাস্তবতার সামনে দর্শককে দাঁড়াতে বাধ্য করে। প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে গত ২২ মার্চ থেকে, চলবে আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত। বেলা ১২টা থেকে রাত ৮টা।

Developed by DXDasia