
এবারের কলকাতা বইমেলায় বিশেষ ফোকাস লেপচা উপজাতি
কলকাতা বইমেলা। বাঙালির ১৪তম পার্বণ। আর যেহেতু ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়, বাঙালি এখন বিশ্বনাগরিক, তাই সারা পৃথিবীর সংস্কৃতি এসে কলকাতা বইমেলায় মিশে যায়। প্রত্যেক বছর থাকে একটি থিম দেশ, এবার যেমন গুয়াতেমালা, তার সঙ্গে আরও অনেকগুলো দেশের স্টল নিয়ে বইমেলা এগিয়ে চলেছে তার আন্তর্জাতিক মেজাজে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, গ্রেট ব্রিটেন, জাপান, আর্জেন্টিনা, ভিয়েতনাম, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, বাংলাদেশ সহ মোট ২৬টি দেশ অংশ নিয়েছে এবারের বইমেলায়। তার মধ্যে লাতিন আমেরিকার রয়েছে ১১টি স্টল। আছে কর্ণাটক, হরিয়ানা, তামিলনাড়ু, পাঞ্জাব, দিল্লির মতো ভারতের নানা অঞ্চলের স্টলও। এই বছর থেকে বইমেলার আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে ফোকাস রাখা হবে একটি করে আদিবাসী সংস্কৃতির ওপর। এবারের বিশেষ ফোকাস লেপচা উপজাতি। পরের বছরগুলোতে বোড়ো, রাভা ও খেড়িয়া সংস্কৃতির ওপর জোর দেবেন কলকাতা আন্তর্জাতিক পুস্তকমেলা কর্তৃপক্ষ।
লেপচা সংস্কৃতিকে তুলে ধরার জন্য বইমেলায় আলাদা অনুষ্ঠান তো রয়েছেই, তার সঙ্গে থাকছে ‘পশ্চিমবঙ্গ লেপচা উন্নয়ন পর্ষদ’-এর আলাদা স্টল। নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীর নামাঙ্কিত ১ নম্বর হলের ২০ নম্বর স্টলে দেখা মিলবে এঁদের। সাধারণ মানুষকে লেপচা সংস্কৃতির বিষয়ে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য সেখানে রয়েছেন জুগেন লেপচা, উগেন তোফিতোংমো এবং আরও কয়েকজন সদাহাস্যময় মানুষ। স্টলে আপনি পাবেন ইংরেজি ভাষায় অনূদিত লেপচা সাহিত্য। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মতো সংগ্রহ করতে পারেন তার কয়েকটি। দুর্লভ রত্নের মতো লেপচাদের ওপর কিছু গবেষণাধর্মী বইও রাখা আছে সেখানে। বাঙালিদের জন্য সেখানকার বিশেষ আকর্ষণ লেপচা ভাষায় অনূদিত রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’। আরও বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত সাহিত্যিকের বই সেখানে পাওয়া যাবে লেপচা তর্জমায়।

তবে স্টলটির সব থেকে বড়ো আকর্ষণ লেপচা পুঁথিগুলো। শুধুমাত্র প্রদর্শনের জন্য রাখা কিছু পুঁথি হাজার বছরেরও পুরোনো। বিশেষভাবে তৈরি কাগজে এক ধরনের বিশেষ ঘাস আর টমেটো পাতা মিশিয়ে বানানো কালিতে লেখা হয়েছে পুঁথিগুলো। লেপচা ঐতিহ্য অনুসারে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে পাঠ করা হয় এইসব পুঁথি। যেমন ‘নিওথিং লমফ্রন’ পাঠ করা হয় কেউ মারা গেলে, আবার ডিসেম্বরের শুরুতে লেপচা নববর্ষে পাঠ করা হয় ‘নামসং’।যদিও কারো লেপচা ভাষার সম্পর্কে প্রাথমিক জ্ঞান অর্জনের কৌতূহল হয়, রয়েছে তার ব্যবস্থাও। সংক্ষেপে লেপচা বর্ণমালা আর ভাষা শেখারও কিছু বই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন আগ্রহী মানুষেরা। শুধু বাঙালিরা নয়, বিদেশীরাও লেপচা উন্নয়ন পর্ষদের স্টলে এসেছে পছন্দমতো বই সংগ্রহ করছেন। বইয়ের পাশাপাশি স্টলে রাখা আছে লেপচাদের দৈনন্দিন কাজের জিনিসপত্র। যেমন পাখা, মাছ ধরার সরঞ্জাম, রকমারি সব হাতিয়ার, বাদ্যযন্ত্র। আছে গিটারের মতো দেখতে টুংবুক। গিটারে তার থাকে ছটি, এখানে তিনটি তার। পুন্টাওং পালিট নামের এক বাঁশিও রয়েছে। সাধারণ বাঁশির আটটা ফুটোর বদলে এগুলোতে চারটে ফুটো থাকে। দারুণ নান্দনিকতায় সাজানো স্টলটিতে মানুষের ভিড়ও হয়েছে দেখার মতো।
