ত্রৈলোক্যতারিণী থেকে জুমেলিয়া : বাংলা পাল্প ফিকশনের রোমাঞ্চকর নারী-অপরাধীরা

পাঁচকড়ির দে-র গোয়েন্দা কাহিনিতে নারীরা অবলা নন

লকাতার পথেঘাটে তখন নতুন কিসসা। সহসাই বেশ কিছু ‘রমণী’র নাম লোকের মুখে মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কারও জবানে জুমেলিয়া তো কারও আড্ডায় গল্পের মধ্যমণি রেবতী। কেউ আবার মেতে উঠছেন জুলেখার গল্পে, সঙ্গে নীল বসনা সুন্দরীর আলাপনও চলে ঘরে ঘরে। সেটা তিরিশের দশক। সেই দশকের কলকাতায় একদিকে মানুষ মহাত্মা গান্ধির ডাকে স্বদেশি অভিযানে দলে দলে পা মেলাচ্ছেন, অন্যদিকে মেতে উঠেছেন জুমেলিয়ার আশ্চর্য হত্যা কাহিনিতে। এই সব বিরল চরিত্রের রচয়িতা পাঁচকড়ি দে। তিনি সেই সময়ে এক কাণ্ড করে বসেছেন বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের ময়দানে। বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের আদি পর্বে নারী-অপরাধী-র উপস্থিতি অঙ্কের হিসেবে সীমিত হলেও পাঁচকড়ি দে সেই ধারায় এক ব্যতিক্রমী পথ তৈরি করলেন। তাতেই দেখা গেল একের পর এক তাঁর রচনাতেই সেদিন উঠে আসছে দুর্ধর্ষ সব নারী সিরিয়াল কিলারেরা। সেই থেকেই কলকাতার পথে ঘাটে সেই রমণীদের আলোচনা।

মানুষ বিস্মিত কারণ এই নারীরা কেউই সাধারণ অপরাধী নয়, তারা একই সঙ্গে রহস্যময়ী, যৌনতার ছলাকলায় পারদর্শী, প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং সামাজিক বাস্তবতার এক অন্য জাতের প্রতীক। তবে পাঁচকড়ি দে’র এই চরিত্রগুলির উৎস অনুসন্ধান যদি করা যায় তাহলে দেখা যাবে ঊনবিংশ শতকের এক ঐতিহাসিক নারী অপরাধী—ত্রৈলোক্যতারিণীই হল পাঁচকড়ির ডিটেক্টিভ গল্পের কল্পিত এই হত্যানিপুণ নারীকুলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রোটোটাইপ। বাস্তব অপরাধ থেকে এরা বাইরে কিন্তু সাহিত্যের বিচারে পাল্প ফিকশনের অতিপ্রাকৃত জগতে এরা রূপান্তরিত। রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াই পাঁচকড়ি দে-র সাহিত্যকে লোকের কাছে জনপ্রিয় করেছিল।

সেকালের কলকাতার ঘরে ঘরে পাঁচকড়ি মানেই হল যৌনতা আর হত্যা রহস্যের এক বিচিত্র আলাপন। গৃহকর্তা আড়ালে আবডালে সেই গ্রন্থের পাতায় পাতায় যৌনতার নয়া পাঠ নেন, আর ঘরের রমণীদের মধ্যে আলোড়ন পড়ে যায় অন্য আরেকটি বিশেষ কারণে।

একই সঙ্গে এও দেখা গেল যে পাঁচকড়ি দে হলেন বাংলা গোয়েন্দা সাহিত্যের প্রথম যুগের সেই জনপ্রিয় লেখক যার সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্র দেবেন্দ্রবিজয়কে প্রায়শই শার্লক হোমসের সঙ্গে তুলনা করতে শুরু করল কলকাতার মানুষজন। বিশেষত ১৯০৭ সালে প্রকাশিত হরতনের নওলা উপন্যাসে পাঁচকড়ি যেভাবে যুক্তিবাদের মোড়কে দেবেন্দ্রবিজয়ের চরিত্রকে বুনে দিয়েছেন, তাতে দেবেন্দ্রর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও ছদ্মবেশের ব্যবহার তাকে শার্লক হোমসের সঙ্গে এই তুলনায় দৃঢ় করেছে। স্বভাবতই সেকালের কলকাতার ঘরে ঘরে পাঁচকড়ি মানেই হল যৌনতা আর হত্যা রহস্যের এক বিচিত্র আলাপন। গৃহকর্তা আড়ালে আবডালে সেই গ্রন্থের পাতায় পাতায় যৌনতার নয়া পাঠ নেন, আর ঘরের রমণীদের মধ্যে আলোড়ন পড়ে যায় অন্য আরেকটি বিশেষ কারণে। আসলে পাঁচকড়ির রমণীরা হত্যা নিপুনই শুধু নয় একই সঙ্গে তাঁরা হলেন সমাজের বুকে নারী স্বাধীনতার আরেক মুখ। স্বদেশের দর্পণে নারী ক্ষমতার অন্য বিন্যাস। নারীর অন্য পরিচয়। সমাজের দর্পনে যদিও সেদিন তাঁরা পিশাচীণীও আখ্যা পেয়েছেন বটে। 

পাঁচকড়ি দে তাঁর কাহিনিগুলিকে মূলত যে শৈলীতে কলকাতার জনসমাজের সামনে উপস্থিত করেছিলেন সাহিত্যের সেই ধারাকে বলা হত পাল্প ক্লাসিক ঘরানা। এই ঘরানায় পাঠকের মধ্যে রোমাঞ্চকর অপরাধ, রহস্য, ছদ্মবেশ, যৌনতার ইঙ্গিত এবং সমাজের অন্ধকার দিকের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তৈরি করা হত। সেই হিসেবে দেখতে গেলে কলকাতার পাঠক সমাজ সেই ত্রিশের দশকেই বিশেষ করে ১৩৪১ বঙ্গাব্দ মানে ১৯৩৪ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যেই পাঁচকড়ি দে রচিত উপন্যাসগুলিতে যেভাবে নারী অপরাধী চরিত্রগুলিকে জটিল ও শক্তিশালী হিসেবে পেলেন তাতে বোঝা গেল এই নারী চরিত্ররা কেবল পুরুষের সহযোগী নয়; অনেক ক্ষেত্রে তারাই কাহিনির চালিকাশক্তি। 

আগেই বলা হয়েছে পাঁচকড়ি দে-র কল্পিত নারী খুনিদের পেছনে যে ঐতিহাসিক ঘটনার ছায়া কাজ করেছে, তার প্রধান চরিত্র হল ত্রৈলোক্যতারিণী। প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত গ্রন্থ দারোগার দপ্তর (১৮৯২–১৯১০)–এ বর্ণিত রয়েছে এই চরিত্র, যাকে কলকাতার প্রথম নারী সিরিয়াল কিলার হিসেবে ইতিহাসে পাওয়া যায়।

ত্রৈলোক্যতারিণীর নিজ নাম: ত্রৈলোক্য রাঁড় যিনি বর্ধমান জেলার এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। অল্প বয়সে বিধবা হয়ে তিনি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শিকার হন এবং শেষ পর্যন্ত সোনাগাছিতে বেশ্যাবৃত্তিতে প্রবেশ করেন। শেখান থেকেই অপরাধের জগতে প্রবেশ। দপ্তরের নথিতে জানা যাচ্ছে যে জনৈক কালীবাবু নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে মিলিত হয়ে লুটপাট ও অপরাধের জগতে যুক্ত হন ত্রৈলোক্যতারিণী। কালীবাবুর ফাঁসির পর ত্রৈলোক্যতারিণী একাই অপরাধ চালিয়ে যান। অর্থলোভে পাঁচজন সহবেশ্যাকে গয়নার প্রলোভন দেখিয়ে পুকুরে নিয়ে গিয়ে ডুবিয়ে হত্যা করেন (১৮৮০–১৮৮৫ নাগাদ)। শেষ পর্যন্ত তিনি ধরা পড়েন এবং রাজদণ্ডে দণ্ডিত হন। কিন্তু এই ঘটনা কেবল একটি অপরাধের ইতিহাস নয়; এটি ঔপনিবেশিক বাংলার দারিদ্র্য, বেশ্যাবৃত্তি, নারীর সামাজিক অবনমন ও অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বাস্তব দলিল। তুলনায় পাঁচকড়ি দে-র উপন্যাসে যদি নারী খুনিদের বিশ্লেষণ করা যায় তবে দেখা যাবে ত্রৈলোক্যের তুলনায় অর্থাৎ বাস্তবের তুলনায় এই মেয়েরা অনেক বেশি নাটকীয় ও মায়াবী। তাঁদের অপরাধ কেবল অর্থের জন্য সংগঠিত নয়। এঁদের অপরাধের কারণ হিসেবে সাহিত্যিক বেছে নিয়েছেন প্রেম, প্রতিহিংসা, ক্ষমতা ও যৌনতার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এক একজন নারীর মনকে। যে কারণে জুমেলিয়া চরিত্রটি পাঁচকড়ি দে-র নারী অপরাধী নির্মাণের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সেখানে তিনি কেবল খুনি নন একই সঙ্গে প্রেমিকা, প্রতিদ্বন্দ্বী, মায়াবিনী এবং একান্তভাবে সক্রিয় এক যৌন মুখর নারী সত্তা।

জুমেলিয়া চরিত্রটি পাঁচকড়ি দে-র নারী অপরাধী নির্মাণের শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। সেখানে তিনি কেবল খুনি নন একই সঙ্গে প্রেমিকা, প্রতিদ্বন্দ্বী, মায়াবিনী এবং একান্তভাবে সক্রিয় এক যৌন মুখর নারী সত্তা।

ত্রৈলোক্যতারিণীর অপরাধ পদ্ধতি ছিল সরাসরি ও বাস্তব—ডুবিয়ে শ্বাসরোধের অন্তরালে যার মূল প্রেরণা অর্থলোভ। তিনি একজন সেক্স ওয়ার্কার, যাঁর অপরাধ বিচারে দেখা যায় এর পিছনে সক্রিয় ছিল সামাজিক বঞ্চনা ও দারিদ্র্যের ফল। অন্যদিকে, পাঁচকড়ি দে-র নারী খুনিরা অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা, ছদ্মবেশ ও যৌনতার শক্তিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন। জুমেলিয়ার খুন সেই কারণেই পাঁচকড়ির কলমে প্রেম ও প্রতিহিংসা দ্বারা চালিত, কোনও ভাবেই অর্থ দ্বারা নয়। ত্রৈলোক্য যেখানে ধরে ধরে খুন করেন, পাঁচকড়ির জুমেলিয়া সেখানে আরব জাদুবিদ্যা বলে সমাধিস্থ হন আবার তা থেকে জেগে ওঠেন। সব মিলিয়ে উপন্যাসে জুমেলিয়া একটি একটি অলৌকিক সত্তা হয়ে ওঠেন। এই রূপান্তরের মধ্যেই বাস্তব অপরাধ কল্পনার জগতে প্রবেশ করে। দারোগার দপ্তর–এর কঠোর বাস্তবতা পাঁচকড়ি দে-র হাতে পাল্প ফিকশনের মায়াবী নাটকীয়তায় রূপ নেয়।

ত্রিশের দশকের বাংলা সমাজ যে সমাজ ছিল গভীরভাবে পিতৃতান্ত্রিক, সেই সমাজের বুকে পাঁচকড়ি দে অঙ্কন করলেন এক অদ্ভুত প্রকৃতির নারী অপরাধীর চরিত্র। এই চরিত্র সেই সমাজে একদিকে ভয় ও যৌনতার নানা দিকের প্রতি পাঠক সমাজের আকর্ষণ তৈরি করল। তখন দেখা গেল পাঁচকড়ি দে-র নারী খুনিরা ‘অবলা নারী’ ধারণাকে ভেঙে দিচ্ছেন চোখের নিমেষে। তাঁরা যৌনতাকে ক্ষমতায় রূপান্তর করেছেন। যে কারণে সেডাক্টিভ ছদ্মবেশ, প্রেমের সম্পর্ক, শরীরী ভাষাই হয়ে উঠেছে তাঁদের অপরাধের হাতিয়ার। যে কারণে জুমেলিয়ার সঙ্গে গোয়েন্দা দেবেন্দ্রবিজয়ের প্রেম–ঘৃণা–আকর্ষণের সম্পর্ক যেভাবে পাঁচকড়ি দে বুনেছেন তাতে আসলে নারীর মনস্তাত্ত্বিক গভীরতাই প্রকাশ পায়। নারী এখানে নিজে কোনও ভাবেই পুরুষের শিকার নয়; পরিবর্তে সে নাগিনী, সে ভয়ঙ্করী, সে বুদ্ধিমান প্রতিদ্বন্দ্বী। এই চিত্রণ সমাজের দমন ও আকাঙ্ক্ষার দ্বন্দ্বকে নগ্নভাবে সামনে নিয়ে এসেছিল সেদিন। এই যুক্তিতে দেখতে গেলে পাঁচকড়ি দে-র বাংলা গোয়েন্দা কাহিনিতে নারী সিরিয়াল কিলারদের চিত্রণ বাংলা পাল্প সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। ত্রৈলোক্যতারিণীর মতো ঐতিহাসিক অপরাধী থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি এমন সব নারী চরিত্র নির্মাণ করেছেন, যারা বাস্তব ও কল্পনার সীমানা ভেঙে দিয়েছিল সেদিন। এই চরিত্রগুলি আমাদের দেখায়—নারী কেবল সমাজের ভোগের পন্য নয়, প্রয়োজনে সে সমাজের সবচেয়ে ভয়ংকর প্রতিবিম্বও হতে পারে।

ঐতিহাসিক অপরাধ যখন কল্পনার মাধ্যমে নতুন ভাষা পায়, তখনই সাহিত্য হয়ে ওঠে সমাজ–মনস্তত্ত্বের এক গভীর দলিল। মায়াবিনী উপন্যাসে যেমন জুমেলিয়া ডক্টর ফুল সাহেবের কাছ থেকে আরব ফকিরদের ভেষজ ও সমাধিস্থ বিদ্যা রপ্ত করে এক অতিপ্রাকৃত ক্ষমতাসম্পন্ন নারীতে পরিণত হন। ছদ্মবেশ ধারণ করে তিনি হত্যাকাণ্ড ঘটান এবং একই সঙ্গে গোয়েন্দা দেবেন্দ্রবিজয়ের প্রতি আকর্ষণ ও ঘৃণার দ্বন্দ্বে আবদ্ধ থাকেন। প্রেমিকা ও শত্রু—এই দ্বৈত সত্তার টানাপোড়েন তাঁর চরিত্রকে গভীর মনস্তাত্ত্বিক মাত্রা দেয়। শেষ পর্যন্ত তাঁর আত্মহত্যা এই চরিত্রের ট্র্যাজিক পরিণতিকে চিহ্নিত করে।

জুমেলিয়ার পাশাপাশি মায়াবী উপন্যাসের মোহিনী চরিত্রটি প্রতিহিংসাপরায়ণ, চতুর ও নিষ্ঠুর এক নারী অপরাধীর প্রতিচ্ছবি। মোহিনীর ক্ষেত্রে অপরাধের মূল চালিকা শক্তি প্রতিশোধ নেওয়ার লালিত প্রবনতা, যা তাঁকে নির্মম করে তোলে। সেলিনা সুন্দরী উপন্যাসের জুলেখা আবার এক ভিন্ন ধরনের নারী খুনি—তিনি ষড়যন্ত্রে পারদর্শী, নাগিনীর মতো ছলনাময়ী এবং পরোক্ষ কৌশলে শত্রুকে ধ্বংস করেন। 

অন্যান্য উপন্যাসের মতোই মায়াবিনী-র শেষেও কয়েকটি পাতায় রয়েছে পাঁচকড়ির বিভিন্ন উপন্যাসের বিজ্ঞাপন। প্রথম দর্শনে মূল কাহিনির বাইরে অবস্থান করলেও, আসলে সেগুলি বইটির সাংস্কৃতিক জগৎকে একটা পূর্ণতা দেয়। কারণ এই বিজ্ঞাপনগুলি কেবল মাত্র প্রকাশকের ব্যবসায়িক প্রয়োজনে বইগুলিতে সংযোজিত হয়নি। এই বিজ্ঞাপনগুলি সেই সময়ের পাঠক, পাঠাভ্যাস এবং জনপ্রিয় সাহিত্যচেতনার একটি নির্ভরযোগ্য দলিল। এখানে যে বইগুলির প্রচার দেখা যায়, তার অধিকাংশই রহস্য, অপরাধ, সামাজিক অন্ধকার, নারী-পুরুষ সম্পর্কের টানাপোড়েন এবং নিষিদ্ধ যৌন আকর্ষণের ইঙ্গিত বহন করে। ফলে মায়াবিনী বা বাকীরা এখানে একা নয়—তাঁরা সকলেই একটি বড়ো অপরাধ-রোমাঞ্চমূলক সাহিত্যপরিবারের অংশ হয়ে ওঠে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে।

অপরাধ সাহিত্য এখানে পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এক ধরনের বিকল্প সামাজিক পাঠ। যে পাঠের পথ কেটেছিলেন পাঁচকড়ি দে।

এই বিজ্ঞাপনগুলির ভাষা লক্ষ করলে বোঝা যায়, সেখানে পাঠককে যুক্তিবাদী পাঠক হিসেবে নয়, বরং কৌতূহলী, উত্তেজনা-পিপাসু ও গোপন অভিজ্ঞতার অনুসন্ধানী হিসেবেই ধরে নেওয়া বা কল্পনা করা হয়েছে। ‘রহস্য’, ‘ভয়ংকর’, ‘অদ্ভুত’, ‘নারী’, ‘খুনি’, ‘প্রেম’, ‘লালসা’ জাতীয় শব্দ ও ইঙ্গিতগুলি সরাসরি এবং পরোক্ষভাবে বারবারেই ফিরে আসে বিজ্ঞাপনে। এই শব্দচয়নই বুঝিয়ে দেয় যে সেই সময়ের জনপ্রিয় বাংলা সাহিত্য নারীকে প্রায়শই রহস্য ও বিপদের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থাপন করেছে। তাই বলাই যায় বইগুলির শেষ পাতার বিজ্ঞাপন আসলে পাঠক কে কিভাবে দেখা হচ্ছে সেই দৃষ্টিভঙ্গিকেই আরও প্রসারিত করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হল, এই বিজ্ঞাপনগুলিতে সাহিত্যের সঙ্গে নৈতিকতার সম্পর্ক যেভাবে নীরবে পুনর্গঠিত হয়। এখানে অপরাধকে শুধুই নিন্দনীয় বলে দেখানো হয় না; বরং তাকে পাঠযোগ্য, উপভোগ্য ও রোমাঞ্চকর করে তোলা হয়। বিজ্ঞাপনগুলি পাঠককে আশ্বাস দেয় যে এই বইগুলি তাকে সমাজের অন্দরের সত্য দেখাবে, যে সত্য মূলধারার ‘ভদ্র’ সাহিত্যে ধরা পড়ে না। ফলে অপরাধ সাহিত্য এখানে পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যম নয়, বরং এক ধরনের বিকল্প সামাজিক পাঠ। যে পাঠের পথ কেটেছিলেন পাঁচকড়ি দে। একই সঙ্গে এই বিজ্ঞাপনগুলির আরেকটি তাৎপর্য হল, সেগুলি প্রকাশনা জগতের ধারাবাহিকতা ও নেটওয়ার্ককে দৃশ্যমান করে। একটি বইয়ের শেষে অন্য আরেকটি বইয়ের বিজ্ঞাপন থাকা মানে পাঠককে একটি ধারাবাহিক ভোগের পথে আহ্বান জানানো। একটি উপন্যাস শেষ করলে পরের রহস্য অপেক্ষা করছে এরকম একটা বার্তা দেওয়া। স্বভাবতই এই প্রবাহ পাঠককে এক ধরনের সিরিয়ালাইজড মানসিকতায় অভ্যস্ত করে, যেখানে সাহিত্য এককালীন অভিজ্ঞতা নয়, বরং ধারাবাহিক উত্তেজনার উৎস। মায়াবিনী-র শেষের বিজ্ঞাপনগুলিও তাই উপন্যাসের সমাপ্তি নয়, বরং পাঠকের কাছে নতুন কৌতূহলের সূচনা।

সব মিলিয়ে বলা যায়, পাঁচকড়ির উপন্যাসগুলির শেষ পাতার বিজ্ঞাপন আসলে বইটির বাইরের সংযোজন হয়েও তার অন্তর্গত অর্থবৃত্তকে গভীর করে। এগুলি দেখায় যে পাঁচকড়ি দে-র লেখা একটি বিচ্ছিন্ন সাহিত্যকর্ম নয়, বরং সেই সময়ের জনপ্রিয় অপরাধ-সাহিত্যের বৃহৎ সাংস্কৃতিক অর্থনীতির অংশ। উপন্যাসের কাহিনি যেমন নারী, অপরাধ ও সমাজের অন্ধকার দিককে উন্মোচিত করে, আবার একই সঙ্গে বিজ্ঞাপনগুলি তেমনই পাঠকের চাহিদা, ভয়, আকর্ষণ এবং নৈতিক দ্বন্দ্বকে নীরবে নথিবদ্ধ করে। এই দুই মিলেই এই লেখাগুলি শুধুমাত্র এক একটি গল্প নয়, বরং একটি সময়ের পাঠ্য-সংস্কৃতির সম্পূর্ণ প্রতিচ্ছবি।

Developed by DXDasia