হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের ‘সঞ্চার’ : উদ্বোধন কার্যালয়ে এক দুর্লভ শিল্প-সফর

প্রদর্শনী: সঞ্চার/ দ্য লাইনস অফ বেঙ্গল অ্যান্ড বিয়ন্ড

“I invent nothing, I rediscover.”– Auguste Rodin

মানব সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ- ছবি। আমরা ছবি আঁকি। যারা পারি না, দেখি। সেই আদি অনাদিকাল থেকে এ চর্চা বিদ্যমান। সুদূর দক্ষিণ আফ্রিকার ব্লোম্বোস গুহা, স্পেনের আলতামিরা অথবা ভারতের ভীমবেটকা- প্রাক-ভাষ্যের যুগে এটিই ছিল যোগাযোগের মাধ্যম। মানুষ তখন শিকার কাহিনি আঁকতো। এতে একদিকে যেমন মনের ভাব প্রকাশ পায়, ঠিক অন্যদিকে সচেতন হত আগামী প্রজন্ম। অর্থাৎ, ছবির নেপথ্যে একটি সচেতন প্রচেষ্টা (conscious attempt) বিদ্যমান।

যত সময় এগিয়েছে আমরা পরিণত হয়েছি। গ্রাম, শহর, জনপদ- জীবনযাত্রার প্রতিটি বাঁকের সঙ্গে জুড়ে গেছে চিত্র। বাংলায় ছবি আঁকার চল কবে থেকে তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। বহু গবেষকের মতে, এর প্রাচীনতম নিদর্শন মেলে বর্ধমান জেলার পাণ্ডু রাজার ঢিবিতে। আজ থেকে আনুমানিক ৩০০০ বছর আগে, সেখানকার আদিবাসীরা মাটির পাত্রে মাছ, পাখি ও বিভিন্ন জ্যামিতিক নকশা এঁকে রাখতেন। একসময় তালপাতায় ছবি আঁকা হত। বিভিন্ন বৌদ্ধ পুঁথিতে আজও দেখা যায়। রাজা প্রথম মহীপালের রাজত্বকালে (৯৮৩ খ্রিষ্টাব্দ) আঁকা ‘অষ্টসাহস্রিকা প্রজ্ঞাপারমিতা’ এর শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। এছাড়াও ছিল পট ও সরার ব্যবহার।

‘সঞ্চার- দ্য লাইন্স অফ বেঙ্গল অ্যান্ড বিয়ন্ড’। অর্থাৎ শুধু বাংলা নয়, ভারত তথা বিশ্ব মানচিত্রের বৃহত্তর আঙ্গিকে বেঙ্গল স্কুলকে পেশ করেছেন দেবদত্ত গুপ্ত। প্রদর্শনীর প্রতিটি দেওয়াল নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজানো।

ব্রিটিশ আগমনের সঙ্গে বাংলার চিত্রকল্পে পরিবর্তন দেখা দেয়। ‘White Man's Burden’, ‘Masculine Men’ অথবা ‘Superior Race’ তত্ত্বের মতোই, তারা বোঝায় ভারতবর্ষের নিজস্ব কোনও শিল্প বা সংস্কৃতি নেই। একপ্রকার জোর করেই চাপানো হয় নীতির পাঠ। জলরঙের ব্যবহার থেকে রেখার টান- পাশ্চাত্য রীতিই হয়ে ওঠে সেযুগের আদর্শ (standard)। এভাবেই দশকের পর দশক জুড়ে ব্রিটিশ নির্ধারিত পাঠ্যক্রম ও একাডেমিক রিয়েলিজমের দাপটে, দেশীয় রীতিগুলো ক্রমশ আবছা হতে থাকে। এ সময়ে বাংলার কিছু কৃতি সন্তান এগিয়ে আসেন। নিজস্ব শিল্পবোধে ভিত্তি করে শুরু হয় দীর্ঘ অনুসন্ধান। বিংশ শতকে এসে ঠাকুর পরিবারের অন্যতম, ‘শিল্পগুরু’ অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে প্রবর্তিত হয় এক নতুন ধারা- দ্য বেঙ্গল স্কুল। শিল্প ঐতিহাসিক দেবদত্ত গুপ্তের তত্ত্বাবধানে ও উদ্বোধন-এর আয়োজনে ‘সঞ্চার- দ্য লাইনস অফ বেঙ্গল অ্যান্ড বিয়ন্ড’, সেই বিপুল ভাবনারই প্রতিরূপ।

প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু নিরুপম। এক কথায় অনন্য। তবে সে প্রসঙ্গে আসার আগে, হে পাঠক, একবার নামটিতে চোখ দিন। ‘সঞ্চার- দ্য লাইনস অফ বেঙ্গল অ্যান্ড বিয়ন্ড’। অর্থাৎ শুধু বাংলা নয়, ভারত তথা বিশ্ব মানচিত্রের বৃহত্তর আঙ্গিকে বেঙ্গল স্কুলকে পেশ করেছেন দেবদত্ত গুপ্ত। প্রদর্শনীর প্রতিটি দেওয়াল নির্দিষ্ট প্যাটার্নে সাজানো।

বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে নন্দলাল বসুর তৈরির নকশা

হলঘরে ঢুকেই বাঁদিকে চোখে পড়বে এক আশ্চর্য ছবি। নন্দলাল বসুর হাতে আঁকা একটি প্রতিলিপি। মা সারদার বাসভবন নির্মাণের জন্য ১৯০৬ সালে তিন কাঠা চার ছটাক জমি দান করেন সেযুগের প্রখ্যাত ব্যবসায়ী কেদারচন্দ্র দাস ওরফে ‘খোড়ো কেদার’। এরপর স্বামী সারদানন্দের দক্ষ পরিচালনায় অবশেষে ১৯০৯ সালে শেষ হয় কাজ। তখনও অলঙ্করণ হয়নি। ১৯৫১ সালে সেই উদ্যোগ নেন মাস্টারমশাই নন্দলাল বসু। ভারতীয় শিল্প ঐতিহ্যের আদলে নানাবিধ নকশা ও ভাস্কর্য সংযোজন করেন তিনি। এই পরিবর্ধনের ফলে শুধু ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে নয়, বরং স্বদেশী শিল্পকর্মের এক অনন্য নিদর্শনের স্থান লাভ করে বাগবাজারের মায়ের বাড়ি। দেবদত্ত গুপ্তের কথায়, এই প্রথম এর নকশাটি (blueprint) জনসমক্ষে আনা হল।

বাগবাজারে মায়ের বাড়িতে নন্দলাল বসু-কৃত নকশার খসড়া

কিছুটা এগোলেই চোখে পড়বে ওকাকুরা কাকুজোর কাজ। প্রথম দেখায় জাপানি ওয়াশ বা জল রং মনে হলেও, ছবিটি আসলে কাঠ খোদাই (Woodcut)। ওকাকুরাকে ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে মিলিয়ে দেন ভগিনী নিবেদিতা। নিজের অজান্তেই উস্কে যায় সম্ভাবনা। উন্মোচিত হয় নতুন দিক। দেবদত্তের কথায়, তিনি নবজাত এই শিল্প আন্দোলনের বন্ধু, দর্শক ও দার্শনিক হিসেবে কাজ করেছিলেন। এরপর ছাপাই কাজে অভ্যস্ত হয় ঠাকুর পরিবার। ১৯২৫ সালে রবীন্দ্রনাথ জাপান থেকে বহু উড-প্রিন্ট ও উড-ব্লক নিয়ে আসেন, যা কলাভবনের ছাপাই-ছবির ধারাকে সমৃদ্ধ করে।

সেকেলে জাপান ছিল নবাগত শক্তি। রুশো জাপানি যুদ্ধে তাদের অপ্রত্যাশিত জয় আলোড়ন সৃষ্টি করে। গোটা বিশ্ব যেন স্তব্ধ। শুরু হয় সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ঢেউ। বাংলায় তখন স্বদেশি আন্দোলন। সমাজ, সংগঠনের পাশাপাশি বৃহত্তর প্রাচ্যের (Pan Asianism) প্রভাব তৎকালীন ছবিতেও আসে। অবন ঠাকুর ও হ্যাভেল সাহেবের হাত ধরে শুরু হয় ‘বেঙ্গল স্কুল’। এরপর ঠাকুর পরিবার ও অসংখ্য ছাত্র-ছাত্রী দ্বারা, সেই প্রবাহ আরও ঋদ্ধ হয়েছে। 

চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

 

একটি আন্তর্জাতিক জার্নালে অবনীন্দ্রনাথের ছবি নিয়ে লিখছেন ভগিনী নিবেদিতা

এক সময়ে ছাপাই কাজে মন দেন কবিগুরু। তিনি কখনোই সাহিত্য, গান বা ছবিকে আলাদা ভাবতেন না। যেন একই সত্তার এপিঠ-ওপিঠ। এই প্রদর্শনীতে তাঁর একটি দুর্লভ লিথোগ্রাফ রয়েছে। বিষয়- কক্ষে বসা রাজা-রানি অথবা যে যেমন ভাবতে চায়। শিল্প, বিশেষত ছবির ক্ষেত্রে এটাই মজা। এর কোনও নির্দিষ্ট ছক, ফর্মুলা নেই।

প্রদর্শনীতে রবীন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথের পাশাপাশি ঠাকুর পরিবারের আরও অনেকেরই কাজ রাখা আছে। চিত্রশিল্পের ইতিহাসে এঁদের সকলের স্বতন্ত্র অবস্থান। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের আঁকায় কবিগুরু, অলোকেন্দ্রনাথের কালবৈশাখী দৃশ্য, নবেন্দ্রনাথ, সুনয়নীদেবীর রেখা মুগ্ধ করে। এছাড়াও আছেন চৈতন্যদেব চট্টোপাধ্যায়, অসিত কুমার হালদার ও রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়।

চিত্রশিল্পী (বাঁদিকে) সুনয়নীদেবী এবং (ডানদিকে) অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

যুগ বদলের তালে তাল রেখে বদলে যাচ্ছে ছবির বিষয় ও ভাবনা। ঘরবাড়ি, টানা দৃশ্যপট, দেবী-চিত্র থেকে আমরা দেখছি রাজনীতির প্রত্যক্ষ প্রবেশ। ১৯৩০ সালের ১২ মার্চ- গান্ধীজীর বিখ্যাত ডান্ডি মার্চকে কেন্দ্র করে লিনোকাট করেন নন্দলাল। এ যেন চির আঁধারের বুকে আলোর চলন। আবার এই গান্ধীই বদলে যাচ্ছেন ’৪০-এ এসে। সেখানে তিনি কঠোরভাবে সমালোচিত। ভারত ছাড়োর বিপন্নতায় গান্ধীকে এবার সরাসরি প্রশ্নের মুখে রাখছেন রামকিঙ্কর। পক্ষের চেয়ে প্রশ্ন বড়ো- শিল্প এখানেই সার্থক। সার্থক বেঙ্গল স্কুল, যার ধারাবাহিক ধারায় জুড়ে আছে একই গান্ধির দুই ভিন্ন রূপ।

শুধু ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক স্মারক হিসেবে নয়, বরং স্বদেশী শিল্পকর্মের এক অনন্য নিদর্শনের স্থান লাভ করে বাগবাজারের মায়ের বাড়ি। দেবদত্ত গুপ্তের কথায়, এই প্রথম এর নকশাটি (blueprint) জনসমক্ষে আনা হল।

নন্দলাল বসুর হাতের ছাপ

তবে মনে রাখা দরকার, বেঙ্গল স্কুল পশ্চিমী বিরোধী ধারা নয়। বরং সমস্ত ভালো গ্রহণের মাধ্যমে (synthesis) আত্মনির্মাণ প্রচেষ্টা। এতে উদারতার পাশাপাশি বৈচিত্রের সম্ভাবনা বাড়ে। এ সাপেক্ষে নন্দলাল বসুর কোলাজ সিরিজটি লক্ষণীয়। বহু পরীক্ষা নিরীক্ষার পর এই অভিনব পর্বটি তিনি শুরু করেন। নন্দলালের প্রভাবে তাঁর ছাত্রকূলের অনেকেই এতে আগ্রহী হন। যেমন বিনোদবিহারী মুখোপাধ্যায়। দৃষ্টি আবছা হয়ে আসার দিনগুলোয়, এই নব নির্মাণে নিজেকে খুঁজে পান শিল্পী।

কাগজ কাটাইয়ের সঙ্গে নন্দলালের আরেকটি দিক ছিল পোস্টকার্ড অঙ্কন। এখানে ছোটো ছোটো কার্ডে খুব দ্রুত স্কেচ করা যেত। তাঁর ছাত্র শিশির কুমার ঘোষের স্মৃতিচারণা থেকে জানা যায়, ‘মাস্টারমশাই’ প্রায়শই কার্ডে আঁকতেন। তা দেখাদেখি কলাভবনের অনেকেই কার্ড-স্কেচ শুরু করে। পৌষমেলার দিনগুলোয় ছোটো দোকান খুলে, ছাত্ররা সেগুলো বিক্রিও করতো।

প্রদর্শনীর একেবারে শেষাংশে রয়েছে দুই রায়ের ছবি- যামিনী ও দেবীপ্রসাদ রায়। যামিনী রায় বলতে আমরা অনেকেই কিছু প্রথাগত ছবির কথা ভাবি। যেমন সাঁওতাল রমণী, যিশু খ্রিষ্ঠ সিরিজ অথবা তিন পূজারিনী। তবে এই-ই সব না। এখানে একটি বিরল ছবি রয়েছে। বাংলার দুর্ভিক্ষ কবলিত এক পরিযায়ী পরিবারকে তুলে ধরেছেন শিল্পী। সেখানে রেখার মাঝে পৃষ্ঠা-শূন্যতা যেন সম্যক হাহাকারের প্রতীক।

দেবদত্ত গুপ্তের তত্ত্বাবধানে চলছে এই প্রদর্শনী

সবমিলিয়ে চিত্রপ্রদর্শনীটি নান্দনিক ও বিশদীকৃত। একটু খুঁটিয়ে দেখলেই ধরা পড়ে চলমান যুগের স্রোত। অথবা ঠিক কীভাবে শিল্পীদের মনস্তাত্ত্বিক প্রবাহ বিকশিত হয়েছে। ‘সঞ্চার’ হতে সঞ্চারিত বোধ ছড়িয়ে যাক। শেষ করা যাক দুটি ছবির কথা বলে। একটি, নন্দলাল বসুর হাতের ছাপ। সেযুগে ইন্টারনেট বা অ্যাস্ট্রো-অ্যাপ নেই। ফলত কারও হাত দেখাতে হলে তাঁরা ছাপ নিয়ে পাঠিয়ে দিতেন গনৎকারের কাছে। আরেকটি ছবি ঠিক ছবি নয়, বরং কিছু অক্ষর। বিনোদবিহারী ততদিনে দৃষ্টি হারিয়েছেন। চোখে আর দেখতে পান না। তবু কম্পিত টানে ফুটে আছে শব্দ। যেন পুকুরে ভাসা পদ্ম। এই জেদ, সাহস ও অদম্য তাড়না- আসলে ছবি তো এভাবেই হয়!

______________ 
প্রদর্শনীটি শুরু হয়েছে ৯ মার্চ থেকে উদ্বোধন কার্যালয়ের সারদানন্দ হলে, চলবে ২১ মার্চ পর্যন্ত। সময় প্রতিদিন দুপুর ১টা থেকে সন্ধে ৭টা। প্রবেশ অবাধ।

Developed by DXDasia