‘দ্য লুমিনাস বিয়ন্ড’ আ ট্রিবিউট টু জে.এম.ডব্লিউ. টার্নার’ শীর্ষক প্রদর্শনী
শিল্পী-সৌমিত্র দাস
২নং ক্যাথিড্রাল রোড, একাডেমি অফ ফাইন আর্টস-এর নর্থ গ্যালারিতে হয়ে গেল, ‘দ্য লুমিনাস বিয়ন্ড: আ ট্রিবিউট টু জে.এম.ডব্লিউ. টার্নার’ (The Luminous Beyond: A Tribute to J.M.W. Turner), এই শিরোনামে এক প্রদর্শনী। যার কিউরেটর ছিলেন শ্রী শমীন্দ্রনাথ মজুমদার। জোসেফ মালর্ড উইলিয়াম টার্নার (Joseph Mallard William Turner), ইংরেজ চিত্রকরের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছিল প্রদর্শনীটি। ইন্ডিয়ান কলেজ অফ আর্টস এন্ড ড্রাফ্টম্যানশিপ-এর পনেরো জন প্রাক্তনীকে নিয়ে এই প্রদর্শনী। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজের মতো করে টার্নারকে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের গোড়ায় কাঁচের স্লাইডে রেখে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তার থেকে আলো নিয়ে ছবি এঁকেছেন।
দ্য লুমিনাস বিয়ন্ড আ ট্রিবিউট টু জে.এম.ডব্লিউ. টার্নার
টার্নারকে জানতে গেলে রঙের মনস্তত্ত্ব বা কালার সাইকোলজির প্রাথমিক ধারণা থাকা প্রয়োজন। বিভিন্ন রং মানুষের মনকে ভিন্ন-ভিন্ন রূপে আন্দোলিত করে। টার্নার স্তরে-স্তরে কালার সাইকোলজিকে নেচারের ডেপিকশনে, শান্ত ও উগ্র এই দুই প্রাচীন ক্রনোলোজিতে দেখিয়েছেন। যার মধ্যে ‘হারমনি’ কখনো আঘাতপ্রাপ্ত হয়নি। এ প্রদর্শনীতেও এর অন্যথা হয়নি। টার্নারের ছবির আকাশে বায়ুমন্ডলীয় আলো ও ঘনত্ব মিলেমিশে যায়, অন্যদিকে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ল্যান্ডস্কেপগুলি পরিবেষ্ঠিত আলো এবং স্থিরতার মধ্য দিয়ে রূপ পায়, যা সময় আর দু’টি মহাদেশের মধ্যে সেতু। প্রদর্শনীতে ভারতীয় সমসাময়িক দৃষ্টিকোণ থেকে টার্নারকে পুনর্গঠন করার চেষ্টা করেছেন শিল্পীরা।
জোসেফ মালর্ড উইলিয়াম টার্নার, ইংরেজ চিত্রকরের ২৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আয়োজন করা হয়েছিল প্রদর্শনীটি। ইন্ডিয়ান কলেজ অফ আর্টস এন্ড ড্রাফ্টম্যানশিপ-এর পনেরো জন প্রাক্তনীকে নিয়ে এই প্রদর্শনী।
কিউরেটর শমীন্দ্রনাথ মজুমদারের কথায়, “কোথাও একটা অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে টার্নারের একটা সংযোগের জায়গা রয়েছে। বিশেষত, অবনীন্দ্রনাথ ওয়াশ পেইন্টিং-এ আবহের যে আলো তৈরি করেছেন, টার্নারও একই আলোময় আবহ তৈরির চেষ্টা করেছেন। দু’জনের গন্তব্য পৃথক হলেও তাঁদের যোগ রয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।” অর্থাৎ দুই ভিন্ন সময়ের, পৃথিবীর দুই প্রান্তের শিল্পীর মনস্তাত্বিক যোগ রয়েছে কিনা খুঁজে দেখেছেন কিউরেটর শমীন্দ্রনাথ মজুমদার। সেখানে শৈলীগত ও পদ্ধতিগত বৈসাদৃশ্য থাকলেও দুই শিল্পীর ছবির মধ্যে ‘আলো’-কে ধরার প্রবণতায় মিল রয়েছে। আজকের শিল্পীরা এই দুই প্রতিতযশা শিল্পীর থেকে আলো নিয়ে নিজের ভাব মিশিয়ে গ্যালারি সাজিয়েছে, কথা বলেছে নিজের ডায়ালেক্ট-এ। সেগুলি একে অন্যের থেকে পৃথক ও অনুপম।

সৌমিত্র দাসের কাজ সরল। কেজো মানুষ কেন্দ্রিক হলেও তাতে পুতুলের ফর্ম রয়েছে। সৌমিত্র দাস জে. এম. ডব্লিউ. টার্নারের অতীন্দ্রিয় আলোকে তার খেলনা-সদৃশ মূর্তির বাস্তব জগতে স্থাপন করেছেন। একটি আসন্ন ট্রেনের হেডলাইট দৃশ্যের মধ্য দিয়ে কেটে যায়, স্থানীয় জনতাকে ফেরার আশায় আলোকিত করে।
শিল্পী মানিক সরকার টার্নারকে সায়ানোটাইপের নীল রঙের মধ্যে দিয়ে দেখেছেন। এই নীল রং আবার প্রশান্তি, আস্থা ও স্থিতিকে ধরে কালার সাইকোলজিতে। সূর্যের আলোকে ব্যবহার করেছেন ছবির উপকরণ হিসেবে। টার্নারের বারোটি ঐতিহাসিক ছবির আলোর প্রেক্ষাপটে আজকের বৈদ্যুতিক আলোকময় শহুরে মেজাজকে ধরেছেন। যেখানে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তাদের অবসর, কর্মময় যাপনের কথা বলা হয়েছে। টার্নারের ছবির থেকে উত্তরণ হয়ে এ ছবি ভারতীয় জীবনের খুব কাছাকাছি এসেছে।
শিল্পী সুমন দাস টার্নারের ছবির বিশালতা ও তার থেকে বিচ্ছুরিত আলোকে একটি সীমিত পরিসরে নিয়ে এসে পরাবাস্তব মনোজাগতিক চিত্রকল্পকে তুলে ধরেছেন। ওঁর ছবি শূন্যতা প্রধান। সুমন সময় ও স্থানকে আটকে রেখে দর্শকমনের সংবেদনকে আলোকিত করেন। ফলে দর্শকমন যতক্ষণ না ঐ নিয়ন্ত্রিত স্থান থেকে সহজাত মনসংযোগ হারিয়ে ফেলে শূন্যতায় ভেঙে পড়ে, ততক্ষণ দর্শককে একটি ধ্যানবিন্দুর দিকে আমন্ত্রণ জানায়।
শিল্পী শুভেন্দু কর্মময় টার্নারের ছবির রোমান্টিক মায়াময় বাস্তবতার সামনে দাঁড় করিয়েছেন। তবে একথা সত্যি এই শহুরে ধোঁয়া ও মায়ার সেই কুয়াশা দৃশ্যত একইরকম হলেও তার অন্তর্নিহিত অর্থ বিপরীত। শুভেন্দুর ধোঁয়াময় শহর, দমবন্ধ করা মৃত বাস্তবতার ছবি। সেখানে টার্নারের ছবির অসীম চিত্রপটে কুয়াশা সুন্দরের যে প্রতিফলন ঘটায়, এখানে ঠিক তার উল্টো।
টার্নারের বারোটি ঐতিহাসিক ছবির আলোর প্রেক্ষাপটে আজকের বৈদ্যুতিক আলোকময় শহুরে মেজাজকে ধরেছেন। যেখানে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, তাদের অবসর, কর্মময় যাপনের কথা বলা হয়েছে। টার্নারের ছবির থেকে উত্তরণ হয়ে এ ছবি ভারতীয় জীবনের খুব কাছাকাছি এসেছে।
শিল্পী-সুমন দাস
শিল্পী সাগ্নিক রায় তাঁর চিত্রপটকে বিমূর্ত ও বায়বীয় করেছেন। এখানে ল্যান্ডস্কেপ থেকে সরে এসে ছবিগুলি মাইন্ডস্কেপ হয়ে উঠেছে। রংগুলি এখানে ঘর্ষণপ্রাপ্ত হয়ে মুছে গিয়েছে অনেক জায়গায়। সেখানেই পেপার হোয়াইট বা ছবির নিজের আলো বেরিয়ে এসেছে। শিল্পী মৌলিক মনোজাগতিক চিন্তার উত্থান-পতন ঘটিয়ে দৃশ্যকল্পে বিমূর্ততার অস্বচ্ছ আবরণে ঘিরে ফেলেছে দর্শকমনকে।
শিল্পী দেবজ্যোতি দাস টার্নারকে ল্যান্ডস্কেপ-এর অতিপ্রাকৃত চেতনাকে মোহিত করতে দক্ষ শিল্পী হিসেবে দেখেন। একটি স্বচ্ছ কাঁচের আস্তরণ, যাতে একটা টিউবলাইটের প্রতিফলন কিংবা বসার ঘরের ঝাড়বাতির প্রতিচ্ছবি দেখা যাচ্ছে মাত্র। সামনে বহির্জাগতিক বিশালতা। যেন একটি কাঁচের জানলার ওপারের বিশালতাকে ছুঁতে দিচ্ছে না, অথচ দেখতে দিচ্ছে, সম্মোহিত করছে, মায়াময়তা অস্থির করছে, কিন্তু স্পর্শতীত দূরত্ব রাখছে। অদ্ভুত কাব্যময় এই ছবি। এতেও বিমূর্ত চিন্তার গন্ধ রয়েছে।
শিল্পী মিঠুন দাস টার্নারকে ভেঙে শুধু নির্যাসটি নিয়েছেন। ওঁর ছবিতে অস্থিরতার মাঝে একটি স্থির সত্য রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের মধ্যে ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি জাহাজের অংশ দেখা যাচ্ছে ছবিতে। সেখানে অন্ধকার, আলোকে ঢেকে দিচ্ছে। অস্থায়ী বিষন্নতা থাকলেও তাতে রয়েছে আসন্ন আশার আলো।
শিল্পী-সাগ্নিক রায়
শিল্পী প্রীতম জানা টার্নারের স্টিল লাইফে অঙ্কিত মৃত প্রাণদের নিজের ছবিতে রেখেছেন। যেখানে পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে হারিয়ে যাওয়া মৃত পাখির দেহ রয়েছে। কাজগুলি প্রকৃতির সৌন্দর্য্যর আড়ালে লুকোনো বাস্তবতার দৃঢ় এক প্রশ্নকে তুলে আনে। যেখানে বিধ্বংসী হিংসার বাস্তবতার সামনে দর্শককে দাঁড়াতে আহ্বান করে।
এছাড়া সুমন পাত্র, সুরেশ কুমার সিংহ, সৌভিক মজুমদার, সৌমিত্র দাস, রাজেশ বর্মন, রিমি আদক, সন্দীপন মান্না, শালিনী কুণ্ডু প্রত্যেকেই এই প্রদর্শনীতে নিজের মতো করে টার্নারের আলোকে বিভিন্ন পরিভাষায় ধরেছেন। তাঁদের প্রতিটি ছবিই নতুন করে টার্নারকে মনে করায়। টার্নারের প্রতি আমাদের আকর্ষণ বেড়ে যায়।