দেশের প্রথম পাতালরেলের ইতিহাস ও বিবর্তন নিয়ে প্রদর্শনী
“কলকাতার বুকে আমরা জুড়ে দিতে চাই সেই ডানা, যার আর এক নাম গতি”
পূর্ণেন্দু পত্রী এই কবিতার লাইনে মেট্রোরেলের কথাই যেন বলতে চেয়েছেন। মহানগরের গণপরিবহণ ব্যবস্থায় বিপ্লব এসেছে মেট্রো পরিষেবার হাত ধরে, একুশ শতকে যা কলকাতার লাইফ লাইন হয়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে শহরবাসীকে তাল মিলিয়ে চলতে শিখিয়েছে মেট্রো, জীবনে এনেছে গতি। আগামী ২৪ অক্টোবর কলকাতা মেট্রোর ৪০তম জন্মদিন।

মেট্রোর জন্য সুড়ঙ্গ খনন, লাইন পাতা, রেক বয়ে আনা, প্রথম দিনের সফর, টিকিট কাউন্টার, মানুষের ভিড়… মেট্রো স্টেশনে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের আগমন ইত্যাদি নানান মুহূর্তের ছবি শোভা পাচ্ছে প্রদর্শনীতে।
১৯৪৯ সালে শহরে সমীক্ষা চালিয়ে মেট্রোপথ নির্মাণের সম্ভাবনা বাতিল করেছিল একটি ফরাসি সংস্থা। তার পরে রুশ এবং জার্মান প্রযুক্তিবিদদের সাহায্য নিয়ে ১৯৬৯ সালে ফের প্রকল্প তৈরি হয়। তার ভিত্তিতেই ১৯৭২ সালের ২৯ ডিসেম্বর পার্ক স্ট্রিট লাগোয়া মেয়ো রোডের কাছে দেশের প্রথম মেট্রো প্রকল্পে শিলান্যাস করেন ইন্দিরা গান্ধি। নির্মাণকাজ শুরুর পরেও নানা বিপত্তির মুখে পড়েছিল কলকাতা মেট্রো। কখনও সুড়ঙ্গের জন্য তোলা বিশালাকৃতি মাটির স্তূপ চাপা পড়ে দুর্ঘটনা ঘটেছে, কখনও মেট্রোর সুড়ঙ্গ তৈরির জন্য পাইপলাইন ফেটে পুরো দক্ষিণ কলকাতা জলহীন হয়েছে। সে সময়ে সুড়ঙ্গ নির্মাণের জন্য বিপুল পরিমাণ মাটি তুলে ফেলার পরে রাস্তার দু’ধারের অজস্র বাড়ির ভিতের মাটি আলগা হয়ে ফাটল ধরার সমস্যা দেখা দিয়েছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রযুক্তিবিদেরা (রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ার অজিত চক্রবর্তী এবং মি. থার্নিস ও তাঁর টিম) মাথা খাটিয়ে মাটি খোঁড়ার কাজ শুরুর আগে নির্মাণের এলাকার দু’পাশে কংক্রিটের ডায়াফ্রাম ওয়াল তৈরি করার উপায় খুঁজে বার করেন। পরে সেই পদ্ধতিই নরম মাটিতে নির্মাণকাজ করার ক্ষেত্রে স্বীকৃত পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায়।

প্রতি বারই বিপত্তি কাটিয়ে উঠে ঘুরে দাঁড়িয়েছে কলকাতার গর্ব মেট্রোরেল। ১৯৮৪ সালের ২৪ অক্টোবর ভবানীপুর (নেতাজি ভবন) থেকে এসপ্ল্যানেডের মধ্যে কলকাতা মেট্রোর যাত্রা শুরু হয়েছিল। দেশে প্রথম। একেবারে প্রথমে মেট্রোর যাত্রাপথ ছিল মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার। এখন শহরে চালু মেট্রোর রুটের সংখ্যা চার, আরও সম্প্রসারণের কাজ চলছে। চার দশকের এই সফরে নানান বদল এসেছে, স্টেশনে থেকে রেক, টিকিট থেকে স্মার্ট কার্ড; মেট্রোর বিবর্তনের সাক্ষী কলকাতা।
৪০ বছর আগে কীভাবে যাত্রা শুরু হয়েছিল, কীভাবে কলকাতা শহরে গণপরিবহণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং জীবনরেখা হয়ে উঠল মেট্রো, তা তুলে ধরতেই ১৮ অক্টোবর থেকে ২৪ অক্টোবর, সপ্তাহব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন মেট্রো কর্তৃপক্ষ। চার দশক পূর্তির অনুষ্ঠানকে স্মরণীয় করে রাখতে মেট্রোর পক্ষ থেকে বিশেষ লোগো প্রকাশ, প্রদর্শনী, হেরিটেজ ওয়াক, ওয়াকাথন-সহ বিভিন্ন কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

১৯৪৯ সালে শহরে সমীক্ষা চালিয়ে মেট্রোপথ নির্মাণের সম্ভাবনা বাতিল করেছিল একটি ফরাসি সংস্থা। তার পরে রুশ এবং জার্মান প্রযুক্তিবিদদের সাহায্য নিয়ে ১৯৬৯ সালে ফের প্রকল্প তৈরি হয়।
নতুন এসপ্ল্যানেড মেট্রো স্টেশনের (গ্রীন লাইন, যেখান থেকে হাওড়া ময়দানগামী মেট্রো ছাড়ে) কাছে চলছে বিশেষ প্রদর্শনী। প্রদর্শনীর একটা অংশে রয়েছে ফটো গ্যালারি। সেখানে কলকাতা মেট্রোর নানান স্মরণীয় মুহূর্ত, ইতিহাস, ঐতিহ্যকে তুলে ধরা হয়েছে ফটোগ্রাফের মাধ্যমে। মেট্রোর জন্য সুড়ঙ্গ খনন, লাইন পাতা, গাড়ি করে রেক বয়ে আনা, প্রথম দিনের সফর, টিকিট কাউন্টার, মানুষের ভিড়, মেট্রো স্টেশনে সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনের মতো বরেণ্য ব্যক্তিদের আগমন ইত্যাদি নানান মুহূর্তের ছবি শোভা পাচ্ছে ফটো গ্যালারিতে। রয়েছে এ সময়ের নানান কর্মযজ্ঞের ছবিও।
সংগ্রাহক সৌভিক রায়ের ব্যক্তিগত সংগ্রহের মাধ্যমে প্রদর্শনীর আরেকটি অংশ সেজে উঠেছে। সেটিই সবচেয়ে আকর্ষণীয়। সেখানে মেট্রোর টিকিটের বিবর্তন দেখিয়েছেন সৌভিক রায়। ম্যাগনেটিক স্ট্রিপড টিকিট থেকে হালের কিউআর কোড টিকিট, টোকেন টিকিট থেকে মেট্রোর কর্মচারীদের জন্য বিশেষ কার্ড। প্রথম দিনের টিকিট, হলদে পিচবোর্ডের টিকিট, ব্ল্যাক টোকেন টিকিট, বিধায়কদের মেট্রোয় যাতায়াত করার জন্য ইস্যু করা স্পেশাল এমএলএ পাস, সাতের দশকে শহরবাসীর উদ্দেশ্যে মেট্রো কর্তৃপক্ষ নব কল্লোল পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছিল, রাজপথের পাঁচালি শীর্ষক দুর্লভ সেই বিজ্ঞাপন… কী নেই প্রদর্শনীতে! সবই সৌভিকবাবুর ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে ঠাঁই পেয়েছে। 
সৌভিকবাবু জানালেন, টিকিট কীভাবে তৈরি হয়, কারা বানায় ইত্যাদি নিয়ে প্রায় দেড়’শো পৃষ্ঠার সংগ্রহ তাঁর। তিনি বলছিলেন, “১৯৭৪ সালে যেদিন প্রথম (ভূ-গর্ভস্থ পথ তৈরির জন্য) ভবানীপুর থেকে এক্সাইড অবধি ব্যারিকেড করা হয়, মা আমাকে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলেন। ১৯৮৪ সালে প্রথম দিনই মেট্রো চড়েছিলাম। আজকে চল্লিশ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রদর্শনী করছি, এটা আমার কাছে একটা বড়ো ব্যাপার।”

তিনি আরও বললেন, “প্রথমে টিকিট হাতে লেখা হত, এডমন্ডসন টিকিট অর্থাৎ যাকে আমরা কার্ড বোর্ডের টিকিট বলি। ১৯৮৯-’৯০-’৯১; এই সময়টাতে নানান ধরনের টিকিট আনা হয়েছিল। প্রচুর রকমের কাগজে টিকিট ছাপা হয়েছিল। সেলফ প্রিন্টেড টিকিট বলা হয় এগুলোকে। এরপরে আসে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপড টিকিট। যুদ্ধবিমান রাফাল নির্মাণকারী সংস্থা দেসো অ্যাভিয়েশন এই টিকিট ও গেটগুলো বানিয়েছিল। প্রায় পনেরো বছর ওটা চলেছিল। স্মার্ট কার্ডের ধারণা এল ২০১১-তে। ১৯৯৭ থেকে স্মার্ট কার্ড চালু করার উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, যা তদানিন্তন মেট্রো-কর্মীদের দেওয়া হয়েছিল।” এই যাবতীয় বিবর্তন তিনি দেখিয়েছেন প্রদর্শনীতে।

সংগ্রাহক সৌভিক রায়

প্রসঙ্গত, সৌভিকবাবুর সংগ্রাহক জীবনের বয়স পঞ্চাশ বছর। পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াকালীন ডাকটিকিট জমানোর মাধ্যমে এই নেশা শুরু হয়েছিল ১৯৭৫ সালে। তারপর নানাবিধ জিনিসের সংগ্রহ শুরু করেন ২০০৯ থেকে, বছর তিনেক হল টিকিট সংগ্রহ শুরু করেছেন। তাঁর কথায়, “যা ভালো লাগে তাই জমাই। যতদিন শরীর সঙ্গ দেবে কাজ চালিয়ে যাবো।” এ জন্যে জাতীয় ও অন্তর্জাতিকস্তরে পুরস্কৃত হয়েছেন তিনি। তাঁর ‘ডিজাইন’ করা ডাকটিকিট চারটি দেশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর সুবিশাল সংগ্রহ রয়েছে। বুদ্ধকে নিয়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তিন সংগ্রাহকের মধ্যে তিনি অন্যতম। তাঁর সংগ্রাহক জীবনের অনুপ্রেরণা তাঁর বাবা, মা। দু’জনেই সংগ্রহ করতেন। সৌভিকবাবুর স্ত্রীও একজন সংগ্রাহক, সম্ভবত তাঁরাই কলকাতার একমাত্র দম্পতি, যাঁরা দু’জনেই সংগ্রাহক। এর আগে বাস এবং ট্রামের টিকিটের বিবর্তনের প্রদর্শনী করেছেন সৌভিকবাবু। তাঁর কথায়, “কলকাতার গণপরিবহণের টিকিট নিয়ে এটা আমার তৃতীয় প্রদর্শনী। বাস, ট্রাম করেছি। মেট্রোটা বাকি ছিল। এটা করে আমি সন্তুষ্ট। আট বা নয়ের দশকে কী ছিল, তা তো সবার পক্ষে জানা সম্ভব নয়। লোক আসছে… দেখছে।”

প্রদর্শনীতে প্রবীণ, মধ্য বয়সীদের সঙ্গে সঙ্গে তরুণ প্রজন্মের অনেক মুখ চোখে পড়লো। তাঁরা লেন্স বন্দি করছেন ইতিহাস। সৌভিকবাবু বোঝাচ্ছিলেন, মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছেন। মেট্রোর এই চল্লিশ বছরের সফর যেন কলকাতার চলমান ইতিহাস। এই সময়টাতে দ্রুত পাল্টে গিয়েছে দিনকাল, ইন্টারনেট সভ্যতার দখল নিয়েছে, বিশ্বায়ন এসেছে। এ প্রদর্শনী ফেলে সেই আসা সময়কে মনে করায়, ইতিহাসকে ফিরে দেখার সুযোগ দেয়।