প্রতিটা ম্যারাথন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা বুনে দিচ্ছিল

দৌড়োতে দৌড়তে ক্র্যাম্প ধরল পেটে। তবু দৌড় থামে না…

মাত্র ১১ মাসের প্রস্তুতিতে প্রথম ফুল ম্যারাথন শেষ করলাম, তাও মাত্র সাড়ে চার ঘন্টায়। নিজের মধ্যে অন্যরকম আত্মবিশ্বাস চলে এল। তাই দেখার ইচ্ছে ছিল নিজের লিমিট ঠিক কোথায়, ঠিক কতদূর আমার নিজের শরীর নিতে পারে। ঠিক করলাম, দু’ভাবে এই পরীক্ষা করব। প্রথমত, কত দ্রুত ফুল ম্যারাথন শেষ করতে পারি আর দ্বিতীয়ত কতটা দূর অবধি দৌড়তে পারি। 

প্রথম ঠিক করলাম স্পিড বাড়াতে হবে দৌড়ের। তার জন্য দৌড়ের টেকনিক ঠিক করতে হবে। সহায় হল অনলাইন লার্নিং পদ্ধতি। ইউটিউব দেখে, জার্নাল পড়ে শিখতে থাকলাম। জানলাম, এতদিন যেটা করেছি, সেটাকে জগিং বলে। কিন্তু, দৌড়তে গেলে হাঁটু তুলতে হয়, জোরে পা দিয়ে মাটিতে মারতে হয়। এবার হাঁটু ঠিক কতটা তুলতে হয়, পায়ের ঠিক কোন জায়গাটা মাটিতে আঘাত করে, হাতের ভঙ্গি কেমন রাখতে হয়, পায়ের জোর কীভাবে বাড়াতে হয়, উপরের শরীরকে কীভাবে দীর্ঘক্ষণ ধরে রাখতে হয়, সবই একে একে শিখলাম। সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল কীভাবে দম বাড়াতে হয়, তা জানা। 

আমাদের শরীর ঠিক অক্সিজেন সিলিন্ডারের মত। এক্সারসাইজের মাধ্যমে এই সিলিন্ডারের সাইজ বাড়ানো যায়, কিন্তু এই এক্সারসাইজ হতে হবে এরোবিক। অর্থাৎ, শরীরে এনার্জি তৈরি (ATP burn) যেন অক্সিজেনের উপস্থিতিতে হয়। আর এখানেই ১০০ মিটার দৌড়ের সঙ্গে ম্যারাথনের পার্থক্য। ১০০ মিটার যারা দৌড়োয় তাদের শরীর হয় পেশীবহুল। শক্তি তৈরি হয় অক্সিজেনের অনুপস্থিতিতে, যাকে বলে এনারোবিক প্রসেস। উল্টোদিকে যারা ম্যারাথন দৌড়োয়, তাদের শরীর হয় লিকলিকে। দৌড়োতে দৌড়োতেই প্রয়োজনীয় জল ও খাবার নিয়ে শক্তি তৈরি করতে করতে যেতে হয়। আমার পুরোপুরি এরোবিক এক্সারসাইজের মধ্যে সপ্তাহে একদিন এনারোবিক এক্সারসাইজও ঢোকালাম স্পিড বাড়ানোর জন্য।

নভেম্বরের ভাইজ্যাগ নেভি ফুল ম্যারাথন শেষ করার পরে এবার প্রথম কলকাতায় দৌড়োতে নামলাম। ডিসেম্বরে, টাটা স্টিল ২৫কিমি রেস। খানিক স্পিড তুলেছিলাম, খানিক আস্তে দৌড়েছিলাম। শেষ করলাম ঠিক দুঘন্টা এক মিনিটে। কিন্তু, এতখানি দৌড়নোর পরে যেটা বুঝেছিলাম, ক্রমশ হাটুর উপরে চাপ বাড়ছে, শরীরের উপরের অংশ দুর্বল হচ্ছে। তাই ঠিক করলাম ক্রশ ট্রেনিং শুরু করব। শুরু করলাম লং ডিসট্যান্স সাইক্লিং ও সাঁতার। মাঝে মধ্যেই সাইকেল নিয়ে ৫০-১০০ কিমি পাড়ি দিতাম, নিয়মিত কলেজ বা কাজে যাতায়াত করতাম সাইকেলেই। এরপর এল জানুয়ারিতে কলকাতা পুলিশ হাফ ম্যারাথন, ২১.১ কিমি। ঠিক করলাম ১-৩০ ঘন্টায় শেষ করবো। কিন্তু ৮ কিমি ৩২ মিনিটে শেষ করার পরে পেটে লিভার ক্র্যাম্প হয়ে যায়। আসলে যথেচ্ছ স্পিড বাড়ানোর ফল শরীর নিতে পারেনি, অক্সিজেনের অভাবে যন্ত্রণা শুরু হয়। খানিক হাঁটতে হাঁটতে ভালো করে শ্বাস নিলাম, জল খেলাম। ঠিক সাত মিনিট নষ্ট হল, যা শেষ অবধি মেকআপ দিতে পারিনি। শেষ করলাম ১ ঘন্টা ৩৭ মিনিটে। তবে বুঝলাম ১-৩০ ঘন্টায় হাফ ম্যারাথন শেষ করার ক্ষমতা আমার আছে।

ফেব্রুয়ারিতে কলকাতা ফুল ম্যারাথনে নামার আগে একবার শীতে সান্দাকফুতে ট্রেক করে এলাম প্রায় ৩২ কেজি ওজনের রুকস্যাক নিয়ে। হাই অল্টিচিউড ট্রেনিং-এর নাম শুনেছি, একবার পরখ করতে চাইছিলাম। শুধু পায়ের জোর বাড়ানো নয়, হিমোগ্লোবিন বাড়ানোটাও লক্ষ্য ছিল। যখন ফিরে এলাম, শরীর থেকে প্রায় সব অপ্রয়োজনীয় চর্বি ঝরিয়ে ফেলেছি! এবার নামলাম কলকাতা ফুল ম্যারাথনে, টার্গেট ছিল নিজেকে পুশ করে যতটা দ্রুত সম্ভব শেষ করা। প্রথম ৩৫ কিমি শেষ করলাম ৩ ঘন্টায়। তারপর আবার পেটে ক্র্যাম্প ধরল। সঙ্গে ফুয়েল স্টেশনগুলোতে জল-খাবার না পাওয়ায় অবস্থা আরও খারাপ হতে শুরু করে। কলকাতার গরমে প্রাণ যেন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল। তবে থামিনি কোথাও। মনে হচ্ছিল, যেন নিজের শরীরের কোনওকিছুর উপর নিজের আর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই। সঙ্গে পা, হাঁটু সবই যেন নিস্তেজ হয়ে আসছিল। বারেবারে একটু শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করছিল।

কোনোক্রমে ৪২.২ কিমি শেষ করলাম ৩ ঘন্টা ৫৯ মিনিটে। ফের মাথা ঘুরে পড়ে গেলাম। তবে বুঝলাম আমার ফিনিশিং ঠিক করার জন্য আরও খাটতে হবে। প্রতিটি ম্যারাথন যেন নিজের মত অভিজ্ঞতার ডালি সাজিয়ে দিচ্ছিল। এবার পরের লক্ষ্য ছিল, ঠিক কতদূর আর কতক্ষণ দৌড়তে পারি, সেটার লিমিট জানতে পারা…

(ক্রমশ)

Post Tags
Developed by DXDasia