ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবির নাম রাখা হল ‘দুর্গা’, কৃতিত্ব ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের

ড. মুখোপাধ্যায়ের সংগ্রামের গল্প দেখানো হয়েছে তপন সিনহার ‘এক ডক্টর কি মওত’ চলচ্চিত্রে

কারণ যাই হোক, আত্মঘাত আদতে দুর্নিবার  অভিমানের বয়ান। কাগজ-কলমে কখনও সে অভিমান লেখা হয় কখনও বা সেটুকুও লেখা থাকে না। ১৯৮১-র  জুনের মধ্য দুপুরে কলকাতা সাক্ষী  থাকে এমনই এক অভিমানী বয়ানের, যেখানে লেখা ছিল হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু পর্যন্ত আর অপেক্ষা করা গেল না। কাজের স্বীকৃতি দূরে থাক, আবিষ্কারকে অস্বীকার করে ক্রমাগত কোণ ঠাসা করে দেওয়া, তীব্র অপমানে লাঞ্ছিত হওয়া এক বাঙালি বিজ্ঞানীকে সমাজ, পরিবেশ পরিস্থিতি এভাবেই ঠেলে দিয়েছিল অতল অন্ধকারে। তাঁর নামটি পর্যন্ত হারিয়ে যেতে বসেছিল। কিন্তু সময় আমাদের ভুলের ক্ষমা এত সহজে করে না বোধহয়। সেই মৃত মানুষটির 'আবিষ্কার'ই একদিন তাই গর্বিত কণ্ঠে উচ্চৈঃস্বরে ঘোষণা করে দিল ১৯ জুন বাঙালি বিজ্ঞানী ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কেবল আত্মঘাতের দিন নয়, আমাদের সমবেত কৃত পাপস্বীকারেরও দিন। 

শুধু ভারতবর্ষে নয়, বিশ্ববিজ্ঞান গবেষণার প্রেক্ষিতে ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায় আদতে এক অবিস্মরণীয় নাম। তাই তো ২০১০ সালে প্রকাশিত ডিকশনারি অফ মেডিকেল বায়োগ্রাফিতে পৃথিবীর ১১০০টি যুগান্তকারী আবিষ্কারের তালিকায় কলকাতা থেকে যে তিনজনের নাম ছিল তাঁরা হলেন রোনাল্ড রস, উপেন্দ্রনাথ ব্রক্ষ্মচারী এবং ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়। সন্তানহীনতার প্রসঙ্গে 'বন্ধ্যা' শব্দটিকে কার্যত ছুঁড়ে ফেলেছিলেন এই মানুষটি, অথচ সমকাল তাঁকে ভুল প্রমাণের খেলায় মেতেছিল। অসম্ভব কর্মনিষ্ঠ ড. মুখোপাধ্যায়ের কেরিয়ার গ্রাফ নিঃসন্দেহেই ঈর্ষনীয়। হাজারিবাগে 'বর্ন্ অ্যন্ড ব্রট আপ' সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১৯৫৫ সালে কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ থেকে ফিজিওলজিতে গ্রাজুয়েশন করেন। ১৯৫৮-তে  মেডিকেল কলেজ থেকেই রিপ্রোডাক্টিভ  ফিজিওলজিতে পিএইচডি পান। এখানেই অ্যাকাডেমিক পড়াশোনা থামিয়ে দেননি মানুষটি। ফলে ১৯৬৭-তে রিপ্রোডাক্টিভ এন্ডোক্রায়োনলজির ওপর গবেষণা করে দ্বিতীয়বারের জন্য ডক্টরেট পান ইউনিভার্সিটি অফ এডিনবরা থেকে। এত উজ্জ্বল কেরিয়ার, বিদেশের মোটা অংকের চাকরির সুযোগ নির্নিমেষ ছেড়ে এসে সুভাষবাবু কলকাতায় নীলরতন সরকার মেডিকেল কলেজে চাকরি শুরু করেন। প্রাইভেট প্র্যাকটিস করে ফুলেফেঁপে উঠতে পারতেন হেলায়, কিন্তু তার পরিবর্তে চাকরি করতে করতেই  ড. মুখোপাধ্যায় তাঁর নিরলস গবেষণা চালিয়ে গেছিলেন। কুষ্ঠ বা এপিলেপ্সি নিয়ে মৌলিক চিন্তাভাবনার পাশাপাশি ড. মুখোপাধ্যায়ের যুগান্তকারী গবেষণা ছিল 'ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন' নিয়ে। আইভিএফ বা টেস্টটিউব বেবি হাজার হাজার নিঃসন্তান দম্পতির কাছে আশীর্বাদ হয়ে এলেও কার্যত ওইটিই পরবর্তীতে ড. মুখোপাধ্যায়ের আত্মহত্যার মূল কারণ হয়ে ওঠে।

ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবি দুর্গা

রিপ্রোডাক্টিভ ফিজিওলজি যেহেতু ছিল তাঁর গবেষণার ভিত্তি, তাই এই বিষয়ে সর্বোচ্চ মৌলিক চিন্তাভাবনায় সবসময়ই মজে ছিলেন তিনি। নিজের ছোটো ফ্ল্যাটটিকে প্রায় ল্যাবরেটরিতে পরিণত করেছিলেন মানুষটি। আর এভাবেই ১৯৭৮ সালে বিজ্ঞানী প্যাট্রিক স্টেপটো ও বিজ্ঞানী রবার্ট এডওয়ার্ডসের গবেষণার ফল হিসেবে পৃথিবীর প্রথম টেস্টটিউব বেবি লুইস ব্রাউনের জন্মের ৬৭ দিন পর বিশ্বের দ্বিতীয় ও ভারতের প্রথম টেস্টটিউব বেবির জন্ম হয় ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কৃতিত্বে। ড. সুভাষ  ও তাঁর সহকারী সুনিত মুখোপাধ্যায় পাঁচটি ভ্রুণকে তরল নাইট্রোজেনে ৫৩ দিন হিমায়িত রাখার পর ১৯৭৮-এর ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি পরপর তিনদিন তিনটি ভ্রুণ জনৈক ভদ্রমহিলা বেলা আগরওয়ালের গর্ভে সংস্থাপন করেন গাইনোকলজিস্ট সরোজ ভট্টাচার্যের সাহায্যে। তারই ফলস্বরূপ বিয়ের ১৬ বছর পর আগরওয়াল দম্পতি এক মেয়ে শিশু সন্তানের জন্ম দেন ১৯৭৮-এর ৩ অক্টোবর। সমস্ত অশুভ, অন্ধকারকে পরবর্তীতে আলোকিত করবে যেন এই মেয়ে। ড. মুখোপাধ্যায় তাই শিশুটির নাম রেখেছিলেন 'দুর্গা'। 

এরপরের দীর্ঘ সময়টা কেবলই যেন অন্ধকারের, অপমানের, অসম্মানের, অপমৃত্যুর। আর এইসব একদিন বিনাশ হবে ওই 'দুর্গা'র হাতেই এ যেন ছিল ভবিতব্য। ইউরোপ আমেরিকার উন্নত গবেষণার নয়, কলকাতার বাড়িতে বসেই গবেষণা চালিয়েছিলেন। সমাজকে অহেতুক আনুগত্য না দেখানো ড. মুখোপাধ্যায়। এর সঙ্গে ছিল সহকর্মীদের ঈর্ষা ও তাঁকে ক্রমাগত ভুল প্রমাণের চেষ্টা। ফলে বিদেশের জার্নালে নিজের গবেষণা প্রকাশ ও বিদেশে কনফারেন্সে যোগদান করতে না পারা, এমনকি তাঁর বিদেশযাত্রায় সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েন সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তাঁর গবেষণা ঠিক না ভুল তা প্রমাণে সরকারি নির্দেশে তদন্ত কমিটি বসে রিপ্রোডাক্টিভিটি নিয়ে আদৌ পড়াশোনা না করা সম্পূর্ণ অন্য বিষয়ে বিশেষজ্ঞ কয়েকজন ডাক্তারের অধীনে। ভুল প্রমাণের চেষ্টা চলে বিস্তর, মিথ্যে গবেষণার তকমা দিয়ে কলকাতা থেকে প্রথমে বাঁকুড়া মেডিকেল কলেজ, পরে আরজিকর এবং সবশেষে ওঁর গবেষণাকে সম্পূর্ণ স্তব্ধ করে দিতে রিজিওনাল ইন্সটিটিউট অফ অপথ্যালমোলজিতে স্থানান্তরিত করা হয় ড. মুখোপাধ্যায়কে। এত অপমান আর নিতে পারেননি মানুষটি, ১৯৮১-র আজকের দিনে নিজের বাড়িতেই সব যন্ত্রণা ভুলতে নিজেকে শেষ করে দেন তিনি।

সমাজ তার এই ভুলের শাস্তি পেয়েছিল। তাই ১৯৮৬-র ১৬ অগাস্ট ভারতের আরেক বিজ্ঞানী টি.সি আনন্দকুমার সরকারি স্বীকৃতিতে টেস্টটিউব বেবি হর্ষবর্ধন রেড্ডির জন্ম দিলে তাঁকে নিয়ে যখন হইহই শুরু হয়, তখন কলকাতায় এক কনফারেন্সে এসে টি.সি আনন্দের হাতেই পড়ে কয়েকবছর আগে ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের নিগৃহীত গবেষণার সেসব ডক্যুমেন্ট। আনন্দ বুঝতে পারেন ভারতবর্ষ কত বড়োপ ভুল করে ফেলেছে, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তিনি নিন্দা করেন ১৯৭৮ সালের তদন্ত কমিটির ওই রিপোর্টকে। ভারতে প্রথম ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের গবেষকের স্বীকৃতির মুকুট এক লহমায় ড. মুখোপাধ্যায়ের মাথায় তুলে দেন আনন্দ কুমার। আর এরপরেই ২০০৩ সালে নিজের ২৫ বছরের জন্মদিনে ড. মুখোপাধ্যায়ের সেই 'দুর্গা' কানুপ্রিয়া আগরওয়াল তার এই জন্মের কারণ হিসাবে ওই ক্ষণজন্মা বিজ্ঞানী ড. সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাফল্যকে জনসমক্ষে প্রকাশ করেন।

ড. মুখোপাধ্যায়ের জীবন নিয়ে নির্মিত তপন সিনহার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবি ‘এক ডক্টর কি মওত’

২০১০ সালে এই কাজের জন্য ড.ববার্ট এডওয়ার্ডস  নোবেল পেলে আরও একবার প্রমাণিত হয় সুভাষবাবুর প্রতি আমলাতন্ত্র ও সমাজের অন্যায়। ড. মুখোপাধ্যায়ের স্মরণে তাঁরই কর্মক্ষেত্র এনআরএসে ২০১৯ সালে 'আইভিএফ সেন্টার' চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। মৃত্যুর এতদিন পর কাজের কিছুটা স্বীকৃতি এভাবে পেলেও ড. মুখোপাধ্যায়কে আসলে হয়তো তা ছুঁতেও পারেনি। সমাজের ঐতিহাসিক ভুলের শিকার, হতভাগ্য এই মানুষটির বয়ান লেখার চেষ্টাটা কেবল ধরা থাকে পরিচালক তপন সিনহার 'এক ডক্টর কি মওত' চলচ্চিত্রে।

তথ্যঋণ — দ্য টাইমস অফ ইন্ডিয়া এবং আনন্দবাজার আর্কাইভ।

Developed by DXDasia