ডোভার লেন সংগীত সম্মেলন : সাত দশক ধরে শাস্ত্রীয় সংগীতের উদযাপন, ঐতিহ্য ও পরম্পরা

কবার এক সংবাদপত্রের কলামে শুভা মুদগল লিখেছিলেন, “সবচেয়ে নামকরা হাতে-গোনা যে কটা শাস্ত্রীয় সংগীতের সম্মেলন হত সারা ভারতে, তার মধ্যে কলকাতায় হত অনেকগুলোই। সারা রাত বসে বিশ্বের তাবড় শাস্ত্রীয় সংগীতের উস্তাদদের সংগীতের রস যেমন নিয়েছে বাঙালি, তেমনই পিট সিগার-এর জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েছে।”

বাঙালির কাছে সংস্কৃতিচর্চা সত্যিই অনেক বড়ো ব্যাপার। শুধু নিজের নয়, বাঙালি যেকোনও সংস্কৃতির প্রতিই উৎসুক। কলকাতার বুকে দীর্ঘ সাত দশক ধরে ঘটে চলা ডোভার লেন সংগীত সম্মেলন (The Dover Lane Music Conference) তার দৃষ্টান্ত। ১৯৫২ সালে দক্ষিণ কলকাতার ডোভার লেন ও তৎসংলগ্ন এলাকার কয়েকজন সংগীতপ্রেমীর নিরলস উৎসাহে আয়োজিত হয়েছিল, তিন রাত্রি ব্যাপী এক বহুমুখী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ডোভার লেন সংগীত সম্মেলনের অঘোষিত সূচনা হয়ে গেছিল সে বছরই। এই সম্মেলন এখনও এদেশের সমৃদ্ধশালী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলে, বৈচিত্র্যময় ভারতের কথা বলে, Harmony বা সম্প্রীতির কথা বলে। বলে, ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা/ তো সুর বানে হামারা’।

 

পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায়

এই সম্মেলন এখনও এদেশের সমৃদ্ধশালী সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা বলে, বৈচিত্র্যময় ভারতের কথা বলে, সম্প্রীতির কথা বলে। বলে, ‘মিলে সুর মেরা তুমহারা/ তো সুর বানে হামারা’।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের হেন কোনও উস্তাদ বা পণ্ডিত বোধহয় নেই, যিনি এই সম্মেলনে সামিল হননি। বড়ে গুলাম আলি থেকে শুরু করে তারাপদ চক্রবর্তী, চিন্ময় লাহিড়ী, আমির খাঁ, ভীমসেন যোশী, নাজাকাত ও সালামাত খান (পাকিস্তান), বালমুরালি কৃষ্ণ, নিসার হুসেন খান, মানস চক্রবর্তী, অজয় চক্রবর্তী, রাশিদ খান, কিশোরী আমনকর, পারভীন সুলতানা, বিসমিল্লাহ খান, আলী আকবর খান, রবি শঙ্কর, বিলায়ত খান, নিখিল ব্যানার্জি, এম.এস. গোপালকৃষ্ণন, হরিপ্রসাদ চৌরাসিয়া, শিব কুমার শর্মা, পণ্ডিত যসরাজ-সহ আরও অনেকেই। সমতা প্রসাদ, কেরামতুল্লাহ খান, আনোখিলাল, কিষেণ মহারাজ, আল্লা রাখা খান, শঙ্কর ঘোষ, স্বপন চৌধুরী, জাকির হুসেনের মতো কিংবদন্তি তবলা বাদকেরাও একাধিকবার মঞ্চ মাতিয়েছেন। সময় বদলেছে, এসেছে নতুন প্রজন্ম, তবু বদলে যায়নি এই অনুষ্ঠানের পরম্পরা। এ বছর ২২ থেকে ২৫ জানুয়ারি রবীন্দ্র সরোবরের নজরুল মঞ্চে বসেছে ৭৪তম ডোভার লেন সংগীত সম্মেলনের আসর। পরের বছরই প্ল্যাটিনাম জুবিলি।

আরমান খান

সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা সহজ কাজ নয়। শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে ও নতুন প্রজন্মকে সুযোগ করে দিতে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে চলেছে ডোভার লেন সংগীত সম্মেলন। প্রতিবারের মতো এবারও এই সম্মেলনের মঞ্চে উঠবেন স্বনামধন্য কৃতী শিল্পীরা এবং অপেক্ষাকৃত নবীন শিল্পীরা। এ বছরের বার্ষিক সম্মেলনে ২৪ জন প্রধান শিল্পী-সহ মোট ৫২ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করছেন। চারদিনের এই উৎসবে প্রতিদিন চারজন শিল্পী পরিবেশনা করছেন।

শাস্ত্রীয় সংগীতের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে ও নতুন প্রজন্মকে সুযোগ করে দিতে এক সেতুবন্ধন তৈরি করে চলেছে ডোভার লেন সংগীত সম্মেলন।

মীরা সন্তোষ আইয়ার

অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেছেন পণ্ডিত বুধাদিত্য মুখোপাধ্যায় (সেতার), হরিশ তিওয়ারি (ভোকাল), রুচিরা দেদার (ভোকাল), রাশিদ-পুত্র আরমান খান (ভোকাল), নির্মাল্য দে (ধ্রুপদ), অভয় রুস্তম সপরি (সন্তুর), সিরাজ আলি খান (সরোদ), পূর্বায়ন চট্টোপাধ্যায় (সেতার), রূপক কুলকার্নি (বাঁশি), তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (সরোদ), মীনাক্ষী শেষাদ্রি ও মীরা সন্তোষ আইয়ার (ভরতনাট্যম), সুলগ্না ভট্টাচার্য (ওডিশি) প্রমুখ। এই সম্মেলনে প্রথমবার কত্থক পরিবেশন করলেন পণ্ডিত বিরজু মহারাজের নাতনি শিঞ্জিনী কুলকার্নি। এ বছর ডোভারলেন সংগীত সম্মান পুরস্কার পেলেন পণ্ডিত শ্রী অজয় পোহানকর। ‘কেয়ারিং মাইন্ডস ইন্টারন্যাশনাল ইয়ং ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ পেলেন ২০ বছর বয়সী তরুণ সারঙ্গী-শিল্পী আমান হুসেন।

কলকাতা এবং সারা দেশ থেকে বিপুল সংখ্যক সংগীতপ্রেমী অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়েছেন। এই আকালেও চার দিনের এই উৎসব দর্শকদের ভারতীয় মার্গ সংগীতের গভীরতা এবং বৈচিত্র্য অনুভব করার সুযোগ করে দিচ্ছে। কণ্ঠসংগীত, যন্ত্রসংগীত, তালবাদ্যের নানা উপচারে এ বারও উষ্ণ হয়ে উঠছে মাঘ-শীতের রবীন্দ্র সরোবর।

Written by