বস্কো অন হুইলস: সুবিধাবঞ্চিতদের বিনামূল্যে খাবার বিলি করছেন ডন বস্কোর প্রাক্তনীরা

ডন বক্সো পার্কসার্কাস চত্বরে শুরু হয়েছে এই উদ্যোগ

“যদি আপনি অন্তর থেকে এই সমাজ, এই দেশ, এখানকার মানুষদের জন্য কিছু করতে চান, তাহলে পথ নিজে থেকেই বেরিয়ে আসে। আলাদা করে খুঁজতে হয় না।” – বলে ওঠেন ডন বস্কো পার্কসার্কাস-এর প্রাক্তনী অজয় কেজরিওয়াল। প্রসঙ্গ – ‘বস্কো অন হুইলস’ নামে একটি খাদ্য বিতরণ ড্রাইভ। ডন বস্কো স্কুলের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রীদের হাত ধরে পার্কসার্কাস চত্বরে শুরু হয়েছে এই ড্রাইভটি, যার উদ্বোধন হয় এক মাস আগে, একটা চক্ষু পরীক্ষা ক্যাম্পের মাধ্যমে। যেখানে চিকিৎসার পাশাপাশি উপভোক্তাদের জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছিল গরমাগরম খাবারের। আর এভাবেই শুরু হয় ‘বস্কো অন হুইলস’-এর যাত্রাপথ। এঁদের কাজই হল, পার্কসার্কাসের ডন বস্কো স্কুল সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী সামাজিক রূপে অবহেলিত শিশু ও পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে বিনামূল্যে রুটি ও সবজি বিতরণ করা।

প্রথম দফায় সফলভাবে প্রায় ২,০০০টির উপর রুটি বিতরণ করে সাহসের সঙ্গে তাঁরা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন বর্তমান খাদ্য সংকটকে। ডন বস্কো থেকে প্রাপ্ত শিক্ষা, যা মাথায় রেখেই তাঁদের এগিয়ে যাওয়া। নিজেদের উদ্যোগটিকে বিশ্বমানের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য রেখে এর নাম ‘বস্কো অন হুইলস’ রাখবার সিদ্ধান্ত নেন তাঁরা। বঙ্গদর্শন.কম-কে ডন বস্কো প্রাক্তনীদের মধ্যে অন্যতম শাহেনশা মির্জা জানান, “সমাজের অবহেলিত শ্রেণির মানুষেরা বেশিরভাগ দিনই ভরপেট খাবার পান না। আমাদের প্রচেষ্টা ছিল, এই মানুষদের জন্য মাসে অন্তত একবার খাবারের ব্যবস্থা করা। করোনাকালীন প্যান্ডেমিক এঁদের জীবনকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করেছে। আমরা চেয়েছিলাম, এই বিপুল পৃথিবীর কাছ থেকে আমরা যা পেয়েছি, তা-ই সমাজে পুনরায় ফিরিয়ে দেওয়া। আমাদের ক্ষুদ্র সামর্থ্য দিয়েই সচেতনতা গড়ে তুলতে চাই সমাজে। অ্যালুমনির সদস্যরা মিলে পুরো বিষয়টার উপর নজর রেখেছি, যাতে তারাই এই সাহায্য পেতে পারে যাদের সত্যিই তা প্রয়োজন।”

এঁদের কাজই হল, পার্কসার্কাসের ডন বস্কো স্কুল সংলগ্ন এলাকায় বসবাসকারী সামাজিক রূপে অবহেলিত শিশু ও পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে বিনামূল্যে রুটি ও সবজি বিতরণ করা।

ডন বস্কো পার্কসার্কাসের অ্যালুমনি প্রেসিডেন্ট বিকাশ চৌরাসিয়া বলেন, “আমরা আপাতত কেবলমাত্র পার্কসার্কাস চত্বরেই তিলজলা ও চিত্তরঞ্জন হসপিটাল এলাকায় ‘বস্কো অন হুইলস’-এর কাজ শুরু করেছি ঠিকই, তবে আমাদের কিছু সদস্য উৎসাহ দেখিয়েছেন, তাঁদের আয়ত্তের মধ্যে থাকা অন্যান্য এলাকায় এই ড্রাইভ শুরু করার। এর মাধ্যমে ডন বস্কোর নামটাও ছড়িয়ে পড়বে মানুষের মধ্যে। আমরা চেষ্টা করব ভবিষ্যতে যাতে বড়োবাজার, কসবার মতো আরও বেশ কিছু জায়গায় পৌঁছে যাওয়া যায়।”

কোনও স্কুলের অ্যালুমনি বডির তরফে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম; দেশের প্রত্যন্ত কোণে পৌঁছে গিয়ে যেখানে যেখানে ডন বস্কো স্কুল রয়েছে, সেখানে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য এই উদ্যোগ কার্যকরী হবে।

প্রাক্তনী অজয় কেজরিওয়াল বলেন, “সমাজের বঞ্চিত মানুষদের খাদ্য বিতরণ করবার সুযোগ পেয়ে আমি নিজেকে যারপরনাই ভাগ্যবান বলে মনে করছি। যদি আরও অনেক মানুষ এভাবেই আমাদের পাশে এসে দাঁড়ান, তাহলে এই ড্রাইভ একটি এককালীন কার্যকলাপ হয়ে থেমে থাকবে না। স্থায়ী ব্যবস্থা রূপে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। আমার বন্ধু অচলেশ চৌধুরীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাতে চাই। তিনিই গত রবিবার সমগ্র ব্যবস্থার দায়িত্বে ছিলেন, অনুদানও তিনিই দেন। ‘বস্কো অন হুইলস’ নামের এই খাদ্য বিতরণ ড্রাইভের পিছনে তিনিই মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।”

প্রাক্তনী যশপাল মেহরা খাদ্য বিতরণ ড্রাইভটিতে অত্যন্ত উৎসাহের সঙ্গে যোগ দিয়েছিলেন দুদিনই। তিনি বলেন, “স্কুলে পড়তে যে মূল্যবোধগুলি অর্জন করেছি আমরা, সেগুলোকেই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি কেবল। আমি মনে করি, আমার যদি কিছু করে দেখানোর মতো সক্ষমতা থাকে, তাহলে তা যেন সমাজের জন্য করি। উদাহরণ স্বরূপ বলি, আমরা একটা নৈশ বিদ্যালয় পরিচালনা করি, যার গতিবিধি কোভিডের সময়েও অব্যহত ছিল। ওই মহামারিকালীন ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে দাঁড়িয়েও বয়স্ক এবং বঞ্চিতদের সাহায্যার্থে এগিয়ে এসেছিল টিমের সদস্যরা। যখন আমি এই আর্ত মানুষদের ঠোঁটে হাসি ফুটতে দেখি, এক অনাবিল আনন্দে মন ভরে ওঠে। ওরা আমায় প্রশ্ন করে, ‘বস্কো অন হুইলস’ এভাবেই প্রতি সপ্তাহান্তে আসবে কিনা। আপাতত, আমরা প্রতি মাসের প্রথম রবিবার খাবার বিতরণ করি। তবে পরবর্তীকালে যাতে প্রতি সপ্তাহেই তা করা যায়, সে বিষয়ে ভাবনাচিন্তা করছি আমরা। আমাদের স্কুল আমাদের এই শিক্ষাই দেয়। বিলাসবহুল পার্টিতে টাকা ওড়ানোর চাইতে মানুষের জন্য কাজ করলে বেশি ভাল হয় না কি?”

এছাড়াও এ বছরের ২ এপ্রিল ডন বস্কো প্রাক্তনীদের হাতে তৈরি হয়েছে ‘বস্কো কেয়ারস’ – একটি মডেল মাল্টি-স্পেশালিটি স্বাথ্যকেন্দ্র। কোনও স্কুলের অ্যালুমনি বডির তরফে এ ধরনের উদ্যোগ এই প্রথম; দেশের প্রত্যন্ত কোণে পৌঁছে গিয়ে যেখানে যেখানে ডন বস্কো স্কুল রয়েছে, সেখানে স্থানীয় স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানের জন্য এই উদ্যোগ কার্যকরী হবে। ক্লিনিকটির চারটি বিভাগ থাকছে – ক্যান্সার, ইউরোলজি, গ্যাসট্রো-এনটেরোলজি, এবং অর্থপেডিক্স। ভবিষ্যতে আরও কয়েকটি বিভাগ এর সঙ্গে জুড়বার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। এই ফ্রি ক্লিনিকটির ডাক্তাররা প্রত্যেকেই ডন বস্কো পার্ক সার্কাসের প্রাক্তন ছাত্র, যাঁদের প্রত্যেকের লক্ষ্য একটাই – সমাজ থেকে প্রাপ্ত বিশ্বাস, ভরসা এবং দানশীলতাকে সমাজেই ফিরিয়ে দেওয়া।

Post Tags
Developed by DXDasia