বাংলার দুই নিজস্ব লোকপ্রযুক্তির হালহকিকত
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত আটপৌরে যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বাংলার সমাজ-সংস্কৃতি-চর্যার শিকড়ে মিশে আছে ঘন হয়ে। আজ থাকল দেলকো ও লটকানের কথা।
দেলকো
দেলকোর আরেক পরিচিতি দীপবৃক্ষ বা কাঠের পিলসুজ নামে। কোথাও একে দেরকো, আবার কোথাও বা দেরখোও বলা হয়ে থাকে। অভিধান বলছে, গ্ৰামীন শব্দ ‘দীপরক্ষক’ থেকে এই শব্দের উৎপত্তি। গ্ৰাম-বাংলায় রান্নাঘরে এই বস্তুটির দেখা মেলে। মাটির উনুন বা কাঠের উনুন যে উচ্চতায় থাকে তার থেকে আরো খানিকটা উপরে রাখা থাকে দেলকো। এর ব্যবহার হয় রাতে। দেলকোর উপর প্রদীপ, কুপি বা লম্ফ রাখা হয়। লম্ফের আলো গোলাকার ভাবে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বৈদ্যুতিন আলো আবিষ্কারের আগে গ্ৰামের মহিলারা এভাবেই দেলকোর উপর কুপি জ্বেলে রান্না করতেন।
আরও পড়ুন
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি: ঝুড়ি
সাধক বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী তার আত্মজীবনীর ‘জন্ম-বাল্য জীবন ও শিক্ষা’ অধ্যায়ে দেলকোর কথা উল্লেখ করেছেন। “আমার বয়স যখন বার বৎসর সেই সময় আমার বাল্যসঙ্গীর মৃত্যু হয়। ইহার সঙ্গে আমি একত্র খেলা করিতাম। ঐ সময় আমি আমাদের গৃহে মেটে দেলকোয় প্রদীপ রাখিয়া পড়িতাম। সঙ্গীটির মৃত্যুর পর একদিন ঐ দেলকো দেখিয়া হঠাৎ আমার মনে হইল ‘এই মাটির জিনিসটা আছে আর সে নাই, ইহা হইতে পারে না।’’’ এই উল্লেখ থেকে জানা গেল, দেলকো মাটিরও তৈরি হত। পরে পুড়িয়ে নেওয়া হত। ঠাকুর বাড়িতেও যে দেলকোর ব্যবহার ছিল তা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা থেকে তা জানা যায়। ধর্মীয় প্রয়োজনে পিলসুজ পিতলের বা সোনার তৈরি করা হয়েছিল। কিন্তু একটা সময় এই বস্তুটি বাঙালির রান্নাঘরেও স্থান পায়। বনেদি রান্নাঘরে পিতলের পিলসুজের দেখা মিলত। কিন্তু, নিম্ন-মধ্যবিত্ত ঘরে কাঠের দেলকোই ব্যবহার হত।
দেলকোর গঠনটি উল্লেখযোগ্য। মোটা ৫”-১০” ব্যাসার্ধের গোলাকার কাঠ নিয়ে উপর দিকটা সরু ও নিচের দিকটা মোটা রাখা হয়। এর গায়ে গোলাকার স্তম্ভের মত নকশা খোদাই করা হয়। উপর দিকে গোলাকার গর্ত করা থাকে তেলের কুপি বা লম্ফ বসানোর জন্য। অতীতে পিতল বা কাঁসা দিয়েও তৈরি হত দেলকো। কিন্তু এঁটোকাটার জন্যে একে ধুতে হত বারবার। ফলে, ক্রমে কাঠ দিয়েই তৈরি হতে লাগল দেলকো। কারণ, কাঠের তৈরি হলে বারবার জলে ধোয়ার থেকে বাঁচানো যাবে একে।
হুগলী জেলার বলাগড়, গুপ্তিপাড়া, নদীয়ার চাকদহ, রানাঘাট, কলকাতার মহাত্মা গান্ধি রোড, বর্ধমানের সাতগেছে ইত্যাদি জায়গায় দেলকো এখনো দেখা যায় এবং তৈরি হয়।
লটকান
লটকান হল তিনটে পা-যুক্ত একধরনের উঁচু-আধার। অভিধানে উল্লেখ রয়েছে, ‘ত্রিপদ ক্ষুদ্র আধার; নৈবেদ্যাদি রাখার ত্রিপদ অবলম্বন’। বাঙালির পুজো-পার্বনের মধ্যে ও রয়েছে প্রযুক্তির ছোঁয়া। কাঠ দিয়ে তৈরি ঘরোয়া প্রযুক্তির উদাহরণ হল এই লটকান। হিসাব-মতো বলা যায়, ৬টি পদযুক্ত কাঠের যন্ত্রবিশেষ। কারণ, যেদিক থেকেই ঘোরানো যাক মাটিতে তিনটে পা-ই থাকবে। সাধারণত, মাটিতে থালার উপর পুজোর ফলাদি-মিষ্টান্ন রাখলে পোকামাকড় বা ধুলোবালির হাত থেকে সেগুলিকে রক্ষা করার জন্যে এই যন্ত্রের উৎপত্তি হয়েছিল। লটকানের উপরে বারকোষ বা থালায় রাখলে ফল, মিষ্টিতে ধুলো বা পোকামাকড় পড়ে না। এই যন্ত্রটির সৃজন-ভাবনা মূলত নারীকেন্দ্রিক মানস থেকেই উঠে আসা।
লটকান তৈরির পদ্ধতিটি উল্লেখের দাবি রাখে। একটি ৮-১০ ইঞ্চি দীর্ঘ কাঠ নিয়ে তার মধ্যিখানে চারদিকে চারটে ফুটো করা হয়। পরে চারদিকে সমান পরিমাপের কাঠের টুকরো ঐ ফুটো বরাবর আটকে দেওয়া হয়। তার ওপরে কাঠের পালিল বা রং করা হয়।
নদীয়া জেলার ফুলিয়া, চাকদহ, কল্যাণী এবং হুগলি জেলার পান্ডুয়া, বলাগড়, খামারগাছি, মহানাদ ইত্যাদি জায়গায় লটকান তৈরি হয়। এছাড়া গ্ৰামীণ মেলায় কাঠের তৈরি জিনিসের স্টলেও পাওয়া যায়।
গ্ৰন্থঋণ: জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, সাহিত্য সংসদ; অবনীন্দ্র রচনাবলী, প্রথম খণ্ড, প্রকাশ ভবন।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ১. দেলকোর ছবিটি দিয়েছেন ইন্দুলেখা ঘোষ।
২.আত্মজীবনী-সাধক বিজয় কৃষ্ণ গোস্বামী