বাংলার সাবেক প্রযুক্তির হালহদিশ
বাংলার মায়েদের প্রযুক্তি বলতে কী বুঝছি? বুঝছি, সেইসমস্ত আটপৌরে যন্ত্রের বা প্রযুক্তির ব্যবহার যা সাবেক বাংলা থেকে এখনো অবধি চলে আসছে। আর সেইসব প্রযুক্তির ব্যবহার করছেন মূলত বাংলার মায়েরা তথা গৃহিণীরাই। এইসব প্রযুক্তি বাংলার সমাজ–সংস্কৃতি–চর্যার শিকড়ে মিশে আছে ঘন হয়ে। আজ থাকল চ্যাঙারি আর চালুনির কথা।
চ্যাঙারি
বাংলার প্রবাদে আছে ‘এক মুষ্টি উপস্থিত বুদ্ধি, এক চাঙারি বিদ্যার সমতুল’। হিন্দি শব্দ ‘চঙ্গেরি’ থেকে ‘চাঙারি’ শব্দটি এসেছে। যদিও ঈশাণচন্দ্র ঘোষ তাঁর ‘জাতক’ গ্ৰন্থে বলেছেন, পালি শব্দ চ্যাঙ্গটক থেকে চ্যাঙ্গাড়ি এবং তার থেকেই পরে চাঙারি শব্দটির জন্ম। অনেকে অবশ্য চ্যাঙুড়িও বলেন। সাধারণত বাঁশের তৈরি পাত্রবিশেষ বা ঝুড়িকেই চাঙারি বলে। বাঁশের চাঁচলা দিয়ে তৈরি শক্তপোক্ত বেড় দেওয়া ঝুড়ি বলা যায়। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ‘শ্রীকান্ত’ উপন্যাসে লিখেছেন, ‘বাউরিয়া বেতের কাজ এবং মজুরি করে এবং ডোমেরা চাঙ্গারি, কুলা, চুপরি প্রভৃতি প্রস্তুত করিয়া পোড়ামাটি গ্ৰামে বিক্রয় করিয়া জীবিকা নির্বাহ করে।’ এই উল্লেখ থেকে আমরা জানতে পারি, অতীতে কোন জাতি বা বর্ণের লোকেরা চাঙারি বোনার কাজ করত।
চাঙারির বুনন পদ্ধতিটি উল্লেখযোগ্য। বোনার পদ্ধতি প্রথমে কিছুটা চ্যাটাই-র মতো। কখনো ++ যোগচিহ্নের মতো, একটার পর একটা বাঁশের চাঁচাড়ি উপর-নিচে রেখে বুনতে হয়। আবার ×× গুণচিহ্নের মতো পরপর বাঁশের চাঁচাড়ি উপর-নিচে রেখে বোনে। প্রায় বড়ো গোলা আকারের বোনা হয়ে গেলে, এর পর একটু শক্ত বাঁশের চাঁচাড়ি দিয়ে ধারে গোলাকার বেড় দেওয়া হয়। শক্ত দড়ি দিয়ে টান করে বাঁধা হয়। বাঁধাকে একপ্রকার সেলাই বলা হয়। গ্রামবাংলার নারীরা এই চাঙারি বোনার কাজে দক্ষ। এই প্রযুক্তির ব্যবহার তাঁদের হাতেই বেশি।
চাঙারি বাঁশের চাঁচাড়ি দিয়ে প্রস্তুত হয় বলে শক্ত হয়। ধান, গম, কুড়ো প্রভৃতি রাখার বা অন্যত্র নিয়ে যাওয়ার জন্য এটি ব্যবহার করা হয়।
চালনা/চালুনি
‘জাতে ডোম আকুড়্যা সর্দার আমি বংশ
নিরন্তর তণে আমার মদ-মাংস।।
নিজ বৃত্তি নিবেদি চ্যাটাই বুনি-ছাতি
কুলা চালা চালুনি চাঙ্গারি ঝুড়ি পাতি।।’
নরসিংহ বসুর ‘ধর্মমঙ্গল’ কাব্যে চালুনির উল্লেখ রয়েছে। বস্তুত, নরসিংহ বসুর লেখায় রাঢ়বঙ্গের ছবি যেন ফুটে ওঠে। এখানকার নানা জাতি, সম্প্রদায় ও তাদের কর্মধারা ধর্মমঙ্গলে উঠে এসেছে। রাঢ়ের অন্তজ্য শ্রেণির মানুষদের খেটে খাওয়ার ছবি উঠে এসেছে। এখানেও আমরা ডোম সম্প্রদায়দের পেলাম, যাদের কাজ ছিল চালা, চালুনি, চাঙারি, ঝুড়ি ইত্যাদি বোনা।
হিন্দি শব্দ ‘চালনা’ থেকে ‘চালনি’ শব্দটি এসেছে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস তাঁর ‘বাঙ্গালা ভাষার অভিধানে’ উল্লেখ করছেন- ‘যদ্বারা শস্যাদি বা তাহার চূর্ণ চালা বা ঝাড়া হয়; বহুছিদ্র বংশ শলাকা বা তারনির্মিত পাত্র; ছাঁকনি।’ কোথাও কোথাও একে চালুনও বলা হয়ে থাকে। জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস আরো বলছেন, ‘চালিয়া পরিষ্কার করিবার জন্য বাঁশে প্রস্তুত পাত্র।’ বাংলা প্রবাদে রয়েছে- ‘চালুনি বলে তোর মার্গে কেন ছেদা।’
চালুনি চাঙারির মতো একই পদ্ধতিতে বোনা হয়। কখনো ++ যোগচিহ্নের মতো, একটার পর একটা বাঁশের চাঁচাড়ি উপর-নিচে রেখে বুনতে হয়। আবার ×× গুণচিহ্নের মতো পরপর বাঁশের চাঁচাড়ি উপর-নিচে রেখে বোনে। তবে, প্রত্যেকটি কাঠির মাঝে মাঝে কিছুটা ছেড়ে ছেড়ে মানে ফাঁক রেখে বুনতে হয়। যখন গোলাকার বোনা হয়ে যায়, দেখতে অনেকটা জালিদার নকশার মতো লাগে। চাঙারি শক্ত হয়, কিন্ত চালুনি খুব নরম। চালুনির বেড় খুব শক্ত হয়। পরে শক্ত দড়ি বা তার দিয়ে টান করে বাধা হয়।
চাঙারি ভারি কাজে ব্যবহৃত হলেও চালুনি হালকা কাজে ব্যবহৃত হয়। মূলত চালুনি কোনো কিছু বাছতে বা ঝাড়তে ব্যবহৃত হয়। যেমন-মুড়ি, চিড়ে খই ইত্যাদি। অনেক সময় চালুনির উলটো দিকটাও কাজে লাগে। যেমন উৎসব বা পার্বণে লুচি বেলে চালুনির উপরে রাখা হয়। পরে তেলে ভাজা হয়।
তথ্যঋণ : বাঙ্গালা ভাষার অভিধান, জ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস, সাহিত্য সংসদ, জুলাই, ১৯৯৪; ‘শ্রীকান্ত’, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ধর্মমঙ্গল, নরসিংহ বসু।