অরণ্যের দিনরাত্রে ‘দুটো বন্ধু’

‘চলো অঞ্জন’ অনুষ্ঠানে অঞ্জন দত্ত ও কবীর সুমনের গরুমারা অরণ্যের কথোপকথন

অনেকেই আমাকে বহুদিন বলেছেন ‘চলো অঞ্জন’ অনুষ্ঠানের কবীর সুমনের সঙ্গে অঞ্জনের গরুমারা অরণ্যে কথোপকথন নিয়ে লিখতে। কেন যেন, এ সংলাপ নিয়ে কিছু লিখতে ইচ্ছে করেনি। কারণ, ভীষণ ভালোলাগা লেখা যায় না, হয়তো উচিতও না। কেমন একটা ম্যাজিক আছে দুই বন্ধুর শহর থেকে দূরের কুয়াশা আর অরণ্যঘেরা এই সংলাপে, আছে মায়া, আছে ওম, জীবন আর অনন্তের কাছে সংগীত ও প্রেমের সমর্পণ, একরাশ সত্যি যা সকালের প্রথম আলোর মতোই ব্যাখ্যাহীন-ঈশ্বরপ্রতিম…একটা পাহাড়ের গায়ে মেঘ নেমে আসছে, রোদ সরিয়ে সরিয়ে সরিয়ে বা একটা ফিঙে বসে রয়েছে অদূরে আর তা দেখে কামনা জাগছে। বলছিলেন সুমন। অঞ্জন জানতে চাইছিলেন যখন প্রেম নিয়ে, শুধু ব্যক্তিপ্রেমেই তো বিস্ময় থেমে থাকে না…বাইপাসের ধারে দাঁড়িয়েছিলেন দুই বন্ধু সেই মুহূর্তে…হাইওয়ের গাড়িটার পাশে…সুমন বলছিলেন তাঁর যৌবনের দিনগুলির গল্প।

বলছিলেন, নকশাল আন্দোলন থেকে ফ্রান্সের অভ্যুত্থান। এইট-বি মোড়ে চাকরি করতে যাওয়ার সময় তাঁর হেনস্থা থেকে জঁ পল সার্ত্রেকে দেখা। পিট সিগার-নোম চমস্কি-মায়া এঞ্জেলুদের সাথে মেশা। পাওলো ফ্রেইরি থেকে লেরয় জোন্সদের দেখার কথা। প্রথম বিদেশে বব ডিলান শুনে অন্ধকার রক্তাক্ত সত্তরের কলকাতার সাথে রিলেট করতে পারা। জীবনের প্রথম পড়শি নদী কাঠজুড়ির গল্প, প্রথম বন্ধু কচ্ছপের গল্প, হরিণের চোখের বিস্ময়। বদলে বদলে যাওয়া জীবন…বদলে বদলে যাওয়া নাম-ধর্ম-সম্পর্ক-দেশ-হিসেবনিকেশ…তারপর সন্ধ্যা গড়ালে ক্যাম্পফায়ারের আগুনের সামনে দুই বন্ধুর গেয়ে ওঠা এলভিস প্রেসলি-র বর্ন ইন দ্য ঘেটো থেকে সুমনের ‘ভালোবাসা শত যুদ্ধেও জেতা যায় না…’। কখনও সুমন গাইছেন ‘আমার সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বলবে আঙিনায়’ থেকে ‘রাস্তার নাম পালটায় একদিন/ ধারা পাল্টায় মাও সে তুঙের চিন/ প্রেম পালটায় শরীরও পাল্টে যায়/ ডাকছে জীবন আয় পাল্টাবি আয়…’।এরপরেই অঞ্জন জানতে চান মৃত্যু নিয়ে সুমনের ভাবনা, জানান তাঁর এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্টর কথাও, সুমন জানান এই দুনিয়া ছেড়ে গেলে প্রিয় সুরগুলো গুনগুন করা যাবে না, তা ভেবেই কষ্ট হয়…খারাপ লাগে…তাই এখন-এই মুহূর্তটা ছাড়া আর কিছুই ভাবতে ইচ্ছে করে না, কিচ্ছু না। ভালোবাসতে ইচ্ছে করে শুধু, এই এখনটাকেই। জাবাতিনি যেমন বলেছিলেন ‘টুডে টুডে এন্ড টুডে…’।দু’জন আধুনিক ইন্ডিভিজুয়াল আন্তর্জাতিক মানুষের খোলাখুলি সংলাপের এই অনুষ্ঠান। এই সংলাপ শহরে বা চেনা পরিসরে সম্ভব ছিল না। তাই অচেনা অরণ্য বা মধ্যরাত নগ্ন সত্যের সামনে হাত পাততে বাধ্য করে তাঁদের। এখানে তাঁরা আর ‘পরিচিত’ নন, বরং বড্ড যাচ্ছেতাইরকম নিজেদের, একার…তাই আপনমনে যেন কথা বলে গেলেন আমাদের বড় হওয়ার এই দুই চেনা মুখ দিনমান।অরণ্যের রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে কখনও সুমন বলেন, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের আরণ্যক লেখার জন্যেই অন্তত ৬টা নোবেল পাওয়ার কথা, শুধু বাংলায় লেখার জন্য তা হল না বা কখনও বলেন ফেলিনির অবসিনিটি ভালোলাগা বা ফারেনহাইট ফোর ফিফটি ওয়ান ভালোলাগার কথাও। অঞ্জন অকপটেই জানান তাঁর খ্রীষ্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার ইচ্ছের কথা। জানান, সুমনের ভেতরেও খ্রিশ্চানিটি খুঁজে পান তিনি আর উত্তরে সুমন জানান, দু’হাত পেরেক গাঁথা করুণাময় মানুষটিকে কি করেই বা এড়িয়ে যাওয়া যাবে! যাবে না…তাই হয়তো কোথাও তাঁর ভেতরেও রয়ে গেছে অবশ্যই ক্রিশ্চানিটি…এম্প্যাথি…যেমন আছেন তথাগত, প্রফেট মহম্মদ তেমনি প্রফেট সুকুমার রায়ও। তবে, জীবনের সমস্তরকম ডগমা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে…হবেই।আর, আজ তুলনামূলক অল্প লোকের সামনে গান গাইতে তাই তাঁর বেশি ভালোলাগে কারণ তাঁরা জানেন স্টেজে একজন প্রেমিক তাঁর প্রিয় গানগুলি গাইছেন নিজের ছন্দে, আর কনজিউমড হতে হচ্ছে না তাঁর শিল্পকে আগের মত, সেভাবে। বলেন, তোমাকে চাইয়ের আড়ালে কীর্তনের কথা বা কসমস বা ব্রহ্মান্ডই আসলে তাঁর বাড়ি। একমাত্র সেখানেই তাঁর ঠিকানা রাখা।যদি দ্বীপান্তরে যান তবে নিয়ে যাবেন অভিধান, পি জি উডহাউস আর বার্ট্রান্ড রাসেলের বই। বার্গম্যান-ত্রুফো থেকে ‘গল্প হলেও সত্যি’ ভালোলাগার কথাও জানান সুমন। জানান পরের জীবনে শিক্ষক হতে পারলে ভালোলাগবে, কারণ তাঁর ভেতরে কোথাও একজন শিক্ষক আছেন যিনি কিশোরদের জীবনের পথে রাস্তা বাতলে দিতে চান…এ কথায় আমার মনে পড়ে, বেশ কয়েকটা প্রজন্মকে তো তাঁর কাজ দিয়ে বারবার রাস্তা দেখালেন সুমন। মঞ্চই তো তাঁর ক্লাসঘর এক রকম। রাগী সত্তার আড়ালের প্রেমিক সত্তা নিয়েও কথা বলেন তাঁরা। বলেন ইন্দ্রিয়ময়তা নিয়ে। সুমন বলেন তাঁর লেখা উপন্যাসের কথা, তাঁর অভিনয়ের কথাও। বলেন, সপ্তাহান্তে একবার যদি এমন একটা ভ্রমণ হয় তো বেশ হয় কিন্তু হোটেলে টিভি থাকলেই বিপদ। সুমন আর অঞ্জন একসাথে একটি এলবাম করেছেন, তাঁদের বন্ধুত্বের আদলে নির্মিত হয়েছে একটি ছবিও তবু এ সংলাপ কোথায় যেন আলাদা।

হায়ার কনশাসনেসে বাঁধা আসলে এ সংলাপ। ছোটবেলায় আমরা বুঝতাম না, সুমন শুনে কেন বদলে যেতাম রোজ একটু একটু করে। আজ, অন্যরকম একটা মানুষ হয়ে উঠে এবং এ দুনিয়ার সাথে অনেককিছুতেই মানাতে না পেরে মনে হয়, ছোটবেলায় শোনা এ সংলাপ আমাকে বদলে দিয়েছিল অজান্তেই। তখন বুঝিনি। আজ বুঝি, এ সব কথা শহরে হয় না কারণ সুমনের গানেই তো আছে ‘শহরে জোনাকি জ্বলে না…’।আজ প্রকৃতিকে বিনষ্ট করে আমরা একটা অভিশপ্ত সভ্যতা পেলাম আর এ সংলাপ আমাকে ডেকে নিয়ে যাবে আবাল্য আদিমতায়-আধ্যাত্মে-অরণ্যে…যেখানে খোলা আকাশ, দুনিয়া গঠনের কাজে হাত দেননি বিধাতা। আমি শিখব সভ্য-আধুনিক হয়ে ওঠার বীজমন্ত্র একইসাথে শিখব টব ফেটে বেরনো শেকড়ে শিল্পের সত্য ও রোদ এসে পড়া, অদূরে বসে থাকা ফিঙে বা মাছরাঙাকে নতুন চোখে দেখা আবার, যেখানে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়…

 

ছবি সৌজন্যে: 

কলকাতা টিভি-র ‘চলো অঞ্জন’ অনুষ্ঠান।

Developed by DXDasia