বাংলার রাজকন্যা-রাজপুত্র, বেঙ্গমা-বেঙ্গমি, লালকমল-নীলকমলের কাহিনি
ছোটোবেলার স্মৃতি বাক্সের দিনগুলি আজও ঝলমলে একটা সময়ের কথা মনে করিয়ে দেয় আমাদের। আজকের গল্পটা সেরকম একটা সময়ের, গল্পটা রপকথার জগতের। শুধু গল্প বললে ভুল হবে, এ তো আস্ত গল্পের ঝুলি। আমাদের ছোটোবেলার রবিবারগুলোর কথা মনে পড়লে মাংস-ভাত আর ছুটির মেজাজের সঙ্গে মনে পড়ে এই অনুষ্ঠানটির কথাও। ঘড়িতে সকাল দশটা বাজলেই জলখাবারের থালা হাতে নিয়ে টিভির সামনে বসে পড়া। সেদিনের পরিচিত আবহ সংগীত যেন আজও আমাদের কানে বাজে–
“ঠাকুমার ঝুলি খুলবে, মজার গল্প বলবে
পশু-পাখি, রাজা-রানি, ভূত পেত্নি, চোখের সামনে সব হাঁটবে চলবে, কথা বলবে
ঠাকুমার ঝুলি খুলবে…”
শুধু ‘ঠাকুমার ঝুলি’ নয়, ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’, ‘ঠানদিদির থলে’, ‘প্রথম বালক’, ‘খোকাখুকুর খেলা’ ইত্যাদির একের পর এক শিশু সাহিত্য রচনা করেছিলেন তিনি। বাঙালি শিশুদের জন্য তিনি প্রথম লিখেছিলেন ‘চারু ও হারু’ নামের এক কল্পকাহিনি।
পাক ধরা চুল, ক্ষীণদৃষ্টি, অশক্ত শরীর অথচ তীক্ষ্ণ স্মৃতিশক্তি নিয়ে মধ্যমণি হয়ে বসে রয়েছেন ঠাকুমা। সামনে ভিড় জমিয়েছে খুদের দল। ঠাকুমা তার সেই ঝুলি থেকে বের করছেন একের পর এক গল্প। কখনও রাজা-রানি, কখনও কৃষক, কখনও আবার পরীর গল্প। কোনওটা শেখাচ্ছে নির্ভীকতা, কোনওটা আবার নৈতিকতা। শিশুমহলে নিমেষে জায়গা করে নিয়েছিল সেই ঠাকুমা।

টেলিভিশনের পর্দায় জনপ্রিয় প্রাফিক্সের ‘ঠাকুমা’
গ্রাফিক্স অথবা বইয়ের পাতা বলে নয় এ ঝুলির কথা ছিল বাঙালির ঘরের চিরাচরিত ঐতিহ্য। আজকের যান্ত্রিক সময়ে মানুষের গল্প করার ফুরসৎ নেই। হারিয়ে গেছে রকের আড্ডা, হারিয়ে গেছে জমাটি আসর। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন চিত্রটা ছিল অন্যরকম। নিউক্লিয়ার ফ্যামিলির ধারণা তখনও গ্রাস করেনি আমাদের। সেসময়ে ঠাকুমা-দাদুর কোলে বসে এক নিমেষে সাত সমুদ্র তেরো নদী পেরিয়ে রূপকথার রাজ্যে পাড়ি দিতে পারতো আদরের নাতি-নাতনিরা। শিশুমনের কল্পনা ছুটে চলে যেত সেই অসম্ভব অজানার দেশে। অতীতের এই রেওয়াজ ইদানীং কমেছে। পাঠ্যক্রম এবং প্রতিযোগিতার চাপে ছোটোরা আজ বড়োই ব্যস্ত। রোজনামচা থেকে হারিয়ে গেছে সেই গল্পের ঝুলি।
বাঙালির ঘরে প্রথম রূপকথার স্বাদ পেতে শিশুসাম্রাজ্যের আকাশে নীল মলাটের বই ‘ঠাকু’মার ঝুলি’র (Thakumar Jhuli) জুড়ি মেলাভার। তার কাছে বিদেশি জাদু মোহময়ী রহস্যাবৃত কাহিনিও যেন ফিকে হয়ে যায়। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায়, এখনও প্রতিবছর ১০ হাজারের বেশি কপি ছাপা হয় বইটির। অথচ ভাবলে অবাক হতে হয় একদিন নাকি এই বইটিই প্রকাশ করতে চাননি প্রকাশকরা।

‘ঠাকুমার ঝুলি’র নীল মলাটের প্রচ্ছদ
‘ঠাকুমার ঝুলি’র চমকপ্রদ কল্পিত কাহিনির স্রষ্টা ছিলেন বাংলার লোকসাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার (Dakshinaranjan Mitra Majumder)। ঢাকা (Dhaka) নিবাসী রমদারঞ্জন ও কুসুমকুমারী দেবীর কোল আলো করে জন্ম নেন দক্ষিণারঞ্জন। তথাকথিত প্রথাগত শিক্ষায় তার সে অর্থে মনোযোগ ছিল না কোনোদিনই। কিন্তু ব্যক্তিগত জীবনে শিক্ষার প্রতি প্রবল অনুরাগী ছিলেন দক্ষিণারঞ্জন। যুবক বয়স থেকেই তাঁর অবাধ বিচরণ ছিল লোকসাহিত্য ও শিশু কল্পনার জগতে। শুধু ‘ঠাকুমার ঝুলি’ নয়, ‘ঠাকুরদাদার ঝুলি’, ‘ঠানদিদির থলে’, ‘প্রথম বালক’, ‘খোকাখুকুর খেলা’ ইত্যাদির একের পর এক শিশু সাহিত্য রচনা করেছিলেন তিনি। বাঙালি শিশুদের জন্য তিনি প্রথম লিখেছিলেন ‘চারু ও হারু’ নামের এক কল্পকাহিনি। ‘সুধা’ নামক একটি মাসিক পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন দক্ষিণারঞ্জন।
‘ঠাকুমার ঝুলি’র ভূমিকা অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) লিখেছিলেন, “ঠাকুমার ঝুলি’টির মতো এত বড় স্বদেশী জিনিস আমাদের দেশে আর কি আছে?”
পরাধীন ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির রমরমাকে ছাপিয়ে তাঁর দেশীয় সাহিত্যকে কেউ গুরুত্ব দিতে চায়নি। দিনের পর দিন তিনি পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছেন প্রকাশকদের দরজায় দরজায়। অথচ ফিরতে হয়েছে প্রতিবারই। তবে দক্ষিণারঞ্জন ছিলেন প্রকৃতই দূরদর্শী, তিনি জানতেন এ গল্পের আজ কেউ কদর না করলেও, একদিন সবাই ঠিকই এর মাহাত্ম্য বুঝতে পারবে। তাই ঠিক করেন, নিজের উদ্যোগেই প্রকাশ করবেন তাঁর অন্যতম সাহিত্য সৃষ্টি ‘ঠাকুমার ঝুলি’। সেইমতো পিসিমার থেকে টাকা নিয়ে করেছিলেন প্রেসও। অবশ্য পরে ১৯০৭ সালে দীনেশচন্দ্র সেনের (Dinesh Chandra Sen) সংস্পর্শে এসে তাঁর উদ্যোগেই ‘ঠাকুমার ঝুলি’ প্রকাশ করতে রাজি হয় ভট্টাচার্য ও সন্স প্রকাশনী (Bhattacharya & Sons)।

‘ঠাকুমার ঝুলি’র ভূমিকা অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (Rabindranath Tagore) লিখেছিলেন, “ঠাকুমার ঝুলি’টির মতো এত বড় স্বদেশী জিনিস আমাদের দেশে আর কি আছে?” শুধু তাই নয়, বাংলার ঘরের চিরাচরিত গল্প বলার সবটুকু সুর ছিল দক্ষিণারঞ্জনের বইয়ের পাতায়। কোথাও এক ফোঁটা ছন্দপতন ঘটেনি তার। এ বইয়ের পরতে পরতে ছিল রূপকথার (FairyTale) সুর, রসবোধ এবং চিরন্তন স্নেহের পরশ। ভূমিকায় রবিঠাকুর স্বয়ং বলেছেন, তিনি নিজেও এ লেখার সাহস দেখাতে পারতেন না। তিনি লিখেছেন, – “দক্ষিণারঞ্জন বাবুর ‘ঠাকুমার ঝুলি’ বইখানা হাতে পেয়ে তাহা খুলিতে ভয় হইতেছিল। আমার সন্দেহ ছিল, আধুনিক বাংলার কড়া ইস্পাতের মুখে পড়ে ওই সুরটা পাছে বাদ পড়ে।” কিন্তু না, এ ভয় যে তাঁর নেহাতই অমূলক ছিল সে কথাও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
আজকের ইন্টারনেট গেমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হারিয়ে যাচ্ছে বইপড়ার নেশা। কিন্তু কল্পজগতের হাতছানি যদি আমাদের একবার তেপান্তরের মাঠে নিয়ে যায়, তবে আর ফেরার পথ থাকবে না কারোরই। দক্ষিণারঞ্জনের কল্পকাহিনি আজও অনায়াসে আমাদের নিয়ে যাবে কোনো এক নস্ট্যালজিয়ার জগতে। প্রযুক্তি এবং আধুনিকতার টানাপোড়েনের সময়েও বাংলার ঘরে ঘরে মানুষের মনে আনন্দ দিতে পারে তাঁর সাহিত্য। বাঙালির আট থেকে আশি এখনও অবসরে যে দক্ষিণারঞ্জনের সৃষ্ট রূপকথায় মজে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই।
বিদেশি কল্পকাহিনি ‘হ্যারিপটার’ বাচ্চাদের জাদু দুনিয়ায় ঘুরিয়ে নিয়ে এলেও বাংলার রাজপুত্র, রাজকন্যা, রাজ্যপাট, বেঙ্গমা-বেঙ্গমি, লালকমল-নীলকমলের রাজ্যে শিশুদের অবাধ বিচরণকে তা কোনমতেই রুখতে পারেনা। ১৯৫৬ সালের ৩০ মার্চ মৃত্যু হয় প্রতিভাবান সাহিত্যিক তথা কল্পজগতের নায়ক দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের। কিন্তু সারা বাংলায় অমরত্ব লাভ করে তাঁর কীর্তি। সে টিভির পর্দায় হোক কিংবা বই-এর পাতায়, ‘ঠাকুমার ঝুলি’ যে আজও আমাদের হৃদয়জুড়ে রয়েছে, তা হলফ করে বলা যায়।
তথ্যসূত্র –
১। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, উইকিপিডিয়া
২। “ঠাকুমার ঝুলি”, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার, ১৯০৭
৩। দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদার জীবনী, bhugolshiksha.com