দাদু-দিদা ক্লাব : নতুন প্রজন্মকে জীবনবোধের শিক্ষা দিতে রাজ্য সরকারের নয়া পদক্ষেপ

ষাটোর্দ্ধদের নিয়ে ছ’হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি হতে চলেছে দাদু-দিদা ক্লাবের জন্য

‘গল্প দাদুর আসর’ অথবা ‘ঠাকুমার ঝুলি’ ছোটোবেলার স্মৃতি ঘিরে রয়েছে আস্ত একটা সোনালি সময়। খাওয়া, ঘুম সবেতেই ছিল পরিচিত গল্প শোনার বায়না। যুগ বদলেছে। তাল মিলিয়ে বদলেছে অভ্যাসও। আজকাল শিশুরা গল্প শোনে না, স্মার্ট ফোনের মোহে গোটা প্রজন্মটা যেন বুঁদ হয়ে আছে। আধুনিকতার রঙচঙা মোড়কে অবসাদ গ্রাস করছে অজান্তেই। নতুন প্রজন্ম গল্প শোনে না, গল্প পড়ে না! প্রাণ খুলে আড্ডা দেওয়ার সময়ের এখন খুবই অভাব। রকের আড্ডা, সান্ধ্য চায়ের আড্ডা এসব এখন পুরোনো অ্যালবামে তুলে রাখা ছবির মতোই। এর ফলও হচ্ছে মারাত্মক। এ চিত্রটা কেবল এই রাজ্যের নয়, গোটা দেশেই ক্রমশ বাড়ছে আত্মহত্যাপ্রবণতা, বাড়ছে মানসিক রোগ। অধিকাংশ মনোবিদ বলছেন, আনুষঙ্গিক কারণ তো আছেই, তার সঙ্গে আছে যান্ত্রিক সময়ের দম বন্ধ করা পরবেশ। নতুন প্রজন্ম গল্প করতে ভুলে যাচ্ছে, মাঠে খেলতে যেতে ভুলে যাচ্ছে, ফলে একাকিত্ত্ব বাসা বাঁধছে সহজেই। 

সপ্তাহের নির্দিষ্ট দু'দিন প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কেবল জমাটি আড্ডা, হাসি, খোসগল্প। প্রবীণদের সঙ্গে নবীনদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আসর। মুখোমুখি মনের কথা বলার আসর। এখানে নতুন প্রজন্ম তাদের আনন্দ, দুঃখ, সফলতা, ব্যর্থতা ভাগ করে নেবে দাদু-দিদাদের সঙ্গে।

এই সমস্যার কথা মাথায় রেখেই পশ্চিমবঙ্গ সরকারের নয়া পদক্ষেপ, দাদু-দিদা ক্লাব (Dadu Dida Club)। রাজ্য সরকারের এই প্রকল্পের নাম আনন্দধারা (Anandadhara)। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আধুনিক প্রজন্মকে গল্প শোনাবেন একদল প্রবীণ মানুষ। রূপকথা-রাজপুত্র-দৈত্য-দানবের গল্প নয়। প্রবীণ নাগরিকদের কাছ থেকে জীবনের পাঠ নেবে তারা। সমাজ-সংসার থেকে সঞ্চিত বিস্তর জীবন-অভিজ্ঞতার কথা কচিকাঁচাদের সঙ্গে ভাগ করে নেবেন তাঁরা। যারা গল্প শুনতে কিংবা গল্প করতে ভুলে যাচ্ছে, তাদের নতুন করে স্বপ্ন দেখানোর কাজ করবেন এই মানুষগুলি। আধুনিকতার দিকে ধাপে ধাপে যত এগিয়েছে সভ্যতা, ততই যেন ‘ব্যাকডেটেড’ হয়ে গেছেন পুরনো মানুষগুলো। কিন্তু ওই, পুরনো চাল যে ভাতে বাড়ে এই অমোঘ সত্য তো সকলের জানা। তাই জীবনের মণিকোঠা থেকে সঞ্চয় করা অভিজ্ঞতা দিয়ে তরুণ প্রজন্মের আগামীকে আরও উজ্জ্বল করে দেবে রাজ্য সরকারের অভিনব দাদু-দিদা ক্লাব, এমনটাই জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)।  

প্রকল্পটির মাধ্যমে তৈরি হতে চলেছে ষাটোর্দ্ধদের নিয়ে ছ’হাজার স্বনির্ভর গোষ্ঠী। আজকাল প্রায়ই শোনা যায়, অবসাদে আত্মহত্যা বা পারিবারিক কোন্দলে ব্যাহত শৈশব। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েদের মোবাইল ফোনে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি। হঠাৎ মাদকাসক্ত হয়ে পড়া। একাধিক সমস্যায় ভুগছে বর্তমান সময়। এইসব সমসা সমাধানের লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের নয়া পদক্ষেপ। রাজ্য জুড়ে গল্পদাদুর আসর বসাবেন প্রবীণরা। নতুন প্রজন্ম নিজের অভাব-অভিযোগ-স্বপ্ন-স্বপ্নভঙ্গ-আকাঙ্ক্ষা ভাগ করে নেবে অসমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে।

সপ্তাহের নির্দিষ্ট দু'দিন প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কেবল জমাটি আড্ডা, হাসি, খোসগল্প। প্রবীণদের সঙ্গে নবীনদের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আসর। মুখোমুখি মনের কথা বলার আসর। এখানে নতুন প্রজন্ম তাদের আনন্দ, দুঃখ, সফলতা, ব্যর্থতা ভাগ করে নেবে দাদু-দিদাদের সঙ্গে। যেসব কথা বাড়ির বাবা-মায়ের সঙ্গে বলা যায় না, অনায়াসে তা বলে ফেলা যাবে দাদু-দিদাদের ক্লাবে। জানা গেছে, যাঁরা গল্প শোনাবেন, তাঁদের আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নেবে রাজ্য সরকার। এই কাজে রাজ্য সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে ‘হেল্প এজ ইন্ডিয়া’ নামে একটি সংস্থা। নারী ও শিশু উন্নয়ন এবং সমাজ কল্যাণ দফতরের পরিকাঠামো দিয়েই চলবে প্রকল্পের কাজ।

ইতিমধ্যেই প্রায় ৪০০টির মত এই ধরনের স্বনির্ভর গোষ্ঠী রয়েছে। কোচবিহারে প্রায় তিন বছর আগে পাইলট প্রজেক্ট হিসেবে বয়স্কদের প্রথম স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করা হয়। এবার রাজ্যের প্রতিটি জেলাতেই নেওয়া হতে চলেছে এই উদ্যোগ। ৫৬৫ টি গোষ্ঠীর টার্গেট দেওয়া হয়েছে কোচবিহারকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা, বীরভূম, পুরুলিয়া, পূর্ব মেদিনীপুর পশ্চিম মেদিনীপুর জেলায় তৈরি হবে ৪০৭টি করে গোষ্ঠী। বাকি জেলাগুলিতেও ২০০টি করে এই ধরনের স্বনির্ভর গোষ্ঠী হবে বলে জানিওয়েছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। মনের সমস্যার সমাধানের লক্ষ্যে এ পদক্ষেপ সত্যিই নতুন স্বপ্নের দিশারী, পাশাপাশি দাদু-দিদা এবং নাতি-নাতনিদের মধ্যে ‘জেনারেশন গ্যাপ’ দূর করার অনবদ্য উপায়।

(প্রতীকী ছবি)

Developed by DXDasia