গোরুর হাটে আজব হিসেব

গোরু ব্যবসায়ীদের গোপন সাংকেতিক ভাষা

নামে গো-হাট হলেও এখানে পাওয়া যায় হাঁস, মুরগি, ছাগল, ভেড়া, এমনকি উটও। অনেকে তাই গো-হাট না বলে পশুর হাটও বলে থাকেন। তবে গোরু কেনা-বেচাটাই প্রধান এখানে। বাংলা তথা গোটা দক্ষিণ এশিয়াতে গোরু একটি প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ। তাই বাংলার সমাজে সংস্কৃতিতে গো-হাটগুলোর বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। গো-হাট সম্পর্কে বহু মানুষেরই ভুল ধারণা রয়েছে যে সেখানে কেবল মাংসের জন্যই গোরু বিক্রি হয়। তবে বাস্তব হল, মাংসের জন্য গোরুর চাহিদা তো আছেই, তার পাশাপাশি দুধেল গাইয়ের চাহিদাও কম নয়। ধর্মীয় কাজে অনেকে কিনে থাকেন গোরু সহ অন্যান্য পশু। কেনা-বেচায় যাতে সুবিধে হয়, তার জন্য গোটা হাটকে রাখা হয় কয়েকটা ভাগে ভাগ করে। একদিকে দুধেল গাই থাকে তো অন্য দিকে বলদ। আরেক কোনোদিকে থাকে মাংসের জন্য বিক্রি করতে আনা গোরুগুলো। বিভিন্ন জেলার গো-হাটগুলো তো বটেই, কলকাতার মেটিয়াবুরুজ, কলকাতার আশেপাশে সোনারপুর আর হাওড়ার উলুবেড়িয়াতেও বড়ো গো-হাট রয়েছে। 

গোরুর হাটের কিছু নিজস্ব পরিভাষা রয়েছে। যারা গৃহস্থদের থেকে গোরু কিনে ব্যবসায়ীদের কাছে পৌঁছে দেন, তাদের বলা হয় ব্যাপারী। অনেক সময় ব্যাপারীরা ব্যবসায়ীদেরকে না বিক্রি করে সরাসরিই খদ্দেরকে গোরু বিক্রি করেন। এই ব্যাপারী আর গোরু-ব্যবসায়ীরা নিজেদের মধ্যে গোরুর দাম সংক্রান্ত যে ভাষা ব্যবহার করেন, তা এক গোপন সাংকেতিক ভাষা। সংখ্যাগুলোকে তারা ডেকে থাকেন অন্য নামে। আবার সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে যখন গোরু-ব্যবসায়ী আর ব্যাপারীরা কথা বলেন, তখন ব্যবহার করেন প্রচলিত কথ্য ভাষাই। এর ফলে সাধারণ খদ্দেররা ধরতে পারেন না যে গোরুর আসল দাম কী। 

এবার দেখা যাক, কীভাবে সংখ্যাগুলোর নাম পাল্টিয়ে ডাকা হয়। ‘এক’-কে বলা হয় ‘মির’, ‘দুই’ হয়ে যায় ‘বারিয়া’, ‘তিন’ থেকে হয় ‘পিয়া’, ‘চার ‘থেকে ‘পুনিয়া’, ‘পাঁচ’ হয়ে যায় ‘মুরে’, ‘ছয়’ থেকে ‘তুরুই’, ‘সাত’ হয় ‘ঝাল’, ‘আট’ হয় ‘বোসু’, ‘নয়’ থেকে ‘খোঁটলো’, ‘দশ’ থেকে হয় ‘ঢালা’। এইভাবে ‘এক টাকা’ হয়ে যায় ‘মির টাকা’, বা ‘দশ টাকাকে বলা হয় ‘ঢালা টাকা’। একটা সময়ে বাংলার গ্রামীন সমাজের কুড়ি দিয়ে হিসেব করার একটা রীতি ছিল। গোরুর হাটে এখনও রয়ে গেছে তার রেশ। সে অনুযায়ী ‘একশো’ হয়ে যাবে ‘মুড়ে কুড়ি’, কিংবা ‘তালা কুড়ি’ বলা হবে ‘দুশো’কে। একইভাবে ‘তিন হাজার চারশো’ হবে ‘পিয়া হাজার পুনিয়া শো’।  

তথ্য সূত্র – গো-হাটের গোপন ভাষা, দীপক বিশ্বাস, লোকবার্তা; কলকাতার সবচেয়ে কাছের গোরুর হাটে একদিন, রূপায়ন ভট্টাচার্য, এই সময়।  

Developed by DXDasia