যেখানে সমাধিস্থ আছেন লখনৌয়ের শেষ স্বাধীন নবাব

কলকাতার বুকে এক টুকরো লখনৌ

কলকাতার বুকে অযোধ্যার নবাব ওয়াজিদ আলি শাহ বানিয়েছিলেন এক টুকরো ছোট্ট লখনৌ। ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশরা দখল করে নেয় তাঁর রাজ্য। সিংহাসন ছাড়লেও তাকে কলকাতায় স্বাগত জানানো হয়েছিল একুশ বার তোপ দেগে। তবে এই গান সেল্যুটই ছিল তাঁর জীবনের শেষ গান সেল্যুট। লখনৌয়ের তখত ছাড়ার পর শেষ জীবনটা তিনি কাটালেন কলকাতার মেটিয়াবুরুজে। সুলতানখানায় ছ’হাজার প্রজা নিয়ে তৈরি করলেন এক নকল রাজত্ব। আইনি ব্যাপার ছাড়া সেখানে নাক গলাতেন না ইংরেজ শাসকেরাও। মাসিক একলক্ষ টাকা পেনশন পেতেন নবাব। তা দিয়ে পুষতেন আমির-ওমরাহ, পাইক-বরকন্দাজ, খিদমতগার, গাইয়ে-বাজিয়ে, নর্তকী। বানিয়েছেন নিজস্ব চিড়িয়াখানা, আলিপুর চিড়িয়াখানার অনেক আগেই। সেখানে ঘুরে বেড়াতো বাঘ, সিংহ, চিতা। তাঁর দরবার হয়ে উঠেছিল সংস্কৃতি চর্চার এক আশ্চর্য মিলনক্ষেত্র। ১৮৮৭ সালে তিনি প্রয়াত হন। মৃত্যুর পর তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয় সিবতাইনবাদ শাহি ইমামবাড়াতে।

মেটিয়াবুরুজে নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের সব থেকে বড়ো স্মরণচিহ্ন এই সিবতাইনবাদ শাহি ইমামবাড়া। লখনৌয়ের বড়া ইমামবাড়ার অনুকরণে একটু ছোটো আকারে এটা তৈরি হয়েছিল ১৮৬৪ সালে। আক্ষরিকভাবে ‘ইমামবাড়া’ মানে ইমামের বাড়ি। তবে শিয়া মুসলিম পরম্পরা অনুযায়ী ইমাম হাসান এবং ইমাম হোসেনের স্মরণে তৈরি করা স্থাপত্যকে ইমামবাড়া বলা হয়। এই বাড়িগুলো আসলে শিয়া সম্প্রদায়ের মানুষদের একসঙ্গে মেলামেশার জায়গা। মসজিদের মতোই এখানে নামাজ আদায়, মিলাদ মাহফিলের ব্যবস্থা থাকে, তবে ইমামবাড়াকে ঠিক সরাসরি উপাসনার জায়গা বলা যায় না। মহরমের জিনিসপত্র রাখা থাকে ইমামবাড়াতে। প্রথা হল, ইমামবাড়ার প্রধান ঘরে থাকে তাজিয়া। কারবালার যুদ্ধে নিহত হজরত মহম্মদের নাতি ইমাম হোসেনের সমাধির প্রতিকৃতিকে তাজিয়া বলে।

সিবতাইনবাদ ইমামবাড়ার প্রধান ফটকের মুখেই সাজানো লখনৌয়ের অস্ত্রশস্ত্র, আর ওপরে হাতের চেটোর একটা চিহ্ন। এটাকে ‘হামসা হাত’ বলা হয় এবং শিয়া পরম্পরায় এটি ইসলামের সবথেকে পবিত্র পাঁচ ব্যক্তির প্রতীক। একটি শ্বেতপাথরের ফলকে লেখা আছে, “অযোধ্যার শেষ দুই রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ (১৮৪৭-৫৬) এবং বির্জিস কাদের (১৮৫৭-৫৮)-র সমাধিস্তম্ভ”। এই সালগুলো করে লখনৌতে তাঁদের শাসনকালকে বোঝায়। ভেতরে ঢুকে একটা উঠোনের দুদিকে সিঁড়ি। ডান দিকে রয়েছে একটা অসমাপ্ত স্মৃতিস্তম্ভ, সেটা নিজের স্ত্রী বেগম হজরত মহলের স্মরণে তৈরি করতে চেয়েছিলেন ওয়াজিদ আলি, তবে সেটার কাজ শেষ হবার আগেই নবার মৃত্যু ঘটে। ইমামবাড়ার প্রধান হল ঘরের পুব দিকে কাচ আর লোহার শিকে ঘেরা ঘরটায় কবরস্থ আছেন ওয়াজিদ আলি এবং তাঁর ছেলে বির্জিস কাদের। ঘেরা জায়গাতেই রাখা আছে কয়েকটা তাজিয়া।

ইমামবাড়ার দেওয়াল নবাবের ছবি, তাঁর লেখা কবিতার লাইন, শিয়া ইসলামের উপদেশ দিয়ে সাজানো। সেই ঘেরা জায়গার মধ্যেই কয়েকটা তাজিয়া রাখা। ছাদ থেকে ঝুলছে রংবেরং-এর ঝাড়বাতি। দক্ষিণের দেওয়ালে কুলুঙ্গিতে আরও কয়েকটি তাজিয়া, যারা লখনৌ ঘুরে এসেছেন, তাদের কাছে সেগুলো খুবই পরিচিত মনে হবে। ঘরের পশ্চিম দিকে দর্শনার্থীদের জন্য রাখা আছে নবাবের ব্যবহৃত নানা জিনিস, তার মধ্যে সেই কোরাআনও রয়েছে যেটা ওয়াজিদ আলি নিজেই অনুলিপি করেছিলেন। আরেকটি দেখার জিনিস হল নবাবের ইনসিগনিয়া – একটি বিশাল সূর্যের মতো ব্রোঞ্জের ঢালের উপর সিংহ, সূর্য , সঙ্গে জোড়া ফেরেস্তার ছবি। এই শাহি সিবতাইনবাদ ইমামবাড়ার ঠিক পশ্চিমে রয়েছে আরেকটা ইমামবাড়া। বেগম ইমদা মহল ইমামবাড়া।

ছবি সূত্র – দেবরাজ ঘটক 

Post Tags
Developed by DXDasia