ব্রিগেডের তালকাটা ঐক্য

রাজনীতিতে অপটু আব্বাস সিদ্দিকিকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে

ব্রিগেডে গত রবিবার সংযুক্ত মোর্চার নির্বাচনী সমাবেশ হয়ে গেছে। আগামীকাল আসছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গত রবিবারের সভাটি এই রাজ্যের রাজনীতির পরিপ্রেক্ষিতে নানাদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

এই সভা তৃণমূল এবং বিজেপি-বিরোধী একটি বিকল্প মঞ্চের সন্ধান দিতে চেয়েছে। বিগত দশ বছর ধরে বামফ্রন্ট ব্যাপক মঞ্চ তৈরি করার জন্য সতেরোটি ছোটো-বড়ো বামদলকে একত্রিত করেছে বিভিন্ন আন্দোলনে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, সিপিএম-সিপিআই-ফরোয়ার্ড ব্লক-আরএসপি ছাড়া আর কোনও দল আসন ভাগাভাগিতে নেই। অতি সম্প্রতি বিহারের ভোটে সিপিআই (এমএল) লিবারেশন বামজোটে থেকেই আরজেডি-কংগ্রেসের সঙ্গে আসন সমঝোতা করে এবং বড়ো সাফল্য পায়। কিন্তু এবারে সেইসব বাম দল নিয়ে কোনও সাড়াশব্দ নেই।

লালুপ্রসাদের আরজেডি অনেক আগে থেকেই এই রাজ্যে বামেদের সঙ্গী। যেমন কেরলে বাম মন্ত্রীসভায় আছে সরোদ পাওয়ারের এনসিপি। বিমান বসু নাকি এই দুই দলের জন্য তিনটি করে আসন রেখেছিলেন। শোনা যাচ্ছে, ওই দুই দল এখন তৃণমূলের সঙ্গে রফায় ব্যস্ত। তেজস্বী যাদব বাম সমাবেশের দিন রাজ্যে থেকেও সভায় যাননি। পরেরদিন তিনি নবান্নে গিয়ে মমতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিভিন্ন আন্দোলনে এসইউসি দল একসঙ্গে পথে নামলেও বামফ্রন্টের সঙ্গে আসন রফায় যায়নি। বিমানবাবুও বাকি বামপার্টিগুলিকে আসন দেবার বিষয়ে কোনও উচ্চবাচ্য করছেন না।

বামের ব্রিগেডে কংগ্রেস ও ভাইজান

তারপরেও বাম-কংগ্রেস জোট ভোটের লড়াইয়ে একটি নতুন দলকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছে, যার নাম সদ্যজাত ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (আইএসএফ)। তার নেতা হলেন ফুরফুরা শরিফের পিরজাদা আব্বাস সিদ্দিকি। ব্রিগেডের সভায় তাঁর অনুগামীদের সোচ্চার উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। তবে ময়দানের প্রথম সভায় তিনি তালভঙ্গ ঘটিয়েছেন। সেটাও আবার তিন দফায়। সূর্যকান্ত মিশ্রের ভাষণের সময় তাঁর কয়েকজন অনুগামী মঞ্চে ওঠেন এবং সঙ্গে সঙ্গে একটা শোরগোল পড়ে যায়। সূর্যবাবু সেক্যুলার ফ্রন্ট নেতারা মঞ্চে হাজির হয়েছেন বলে বিষয়টা সামলে নেন। আব্বাস সিদ্দিকি নিজে মঞ্চে ওঠেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর ভাষণের ঠিক মাঝামাঝি সময়ে। তাতে সমাবেশের মধ্যে যে অস্থিরতা তৈরি হয়, তার জন্য অধীরবাবু ভাষণ শেষ করে দিতে চান। সিদ্দিকি সাহেবের তৃতীয় ধাক্কাটা আরও প্রবল। যিনি কংগ্রেসকে কটাক্ষ করেই বলেন, “আমরা কারোর দয়া চাই না, আমরা ভাগিদারি চাই।”

যৌথ জনসভায় এমন অপ্রীতিকর অবস্থা হলে কাউকে না কাউকে তা সামাল দিতে হয়। যেমন ১৯৭৪ সালে জয়প্রকাশ নারায়ণ প্যারেড গ্রাউন্ডে সভা করেন। স্থির হয় সেখানে মূল প্রস্তাব পাঠ করবেন অর্থনীতিবিদ অশোক মিত্র এবং বক্তা হবেন একমাত্র জয়প্রকাশ। মঞ্চে প্রফুল্ল সেন, জ্যোতি বসু-সহ অনেক নেতাই উপস্থিত ছিলেন। একটা সময়ে জনতার একাংশ “জ্যোতি বসু – জ্যোতি বসু” বলে চিৎকার শুরু করে। জয়প্রকাশ নারায়ণ বক্তার পৃথক ডায়াসে জ্যোতি বসুকে ডেকে নেন। সভা অচিরেই শান্ত হয়ে যায়। অধীরবাবু এমনটা করলেই ভালো হত।

হয়তো রাজনীতিতে অপটু বলেই আব্বাস সিদ্দিকি এই পথে হেঁটেছেন। কিন্তু তাঁকে কয়েকটি বিষয় মনে রাখতে অনুরোধ করা দরকার। কংগ্রেস দলের সঙ্গে এখনও তাঁর আসন রফা হয়নি ঠিকই। কিন্তু ২০১১ এবং ২০১৬ সালে বিধানসভা ভোটে উত্তরবঙ্গের মুসলমানরা তৃণমূলের সমর্থক ছিল না – ছিল কংগ্রেসের সঙ্গে। ২০১১-তে কংগ্রেস তৃণমূলের সঙ্গে জোট বেঁধেছিল। ফুরফুরা শরিফেও তখন তৃণমূলী আনুগত্যই ছিল মূল কথা। ব্যবস্থাপনায় ছিলেন ফিরহাদ হাকিম।

ব্রিগেডের জনতা

তার থেকেও একটা বড়ো কথা হল, এই রাজ্যের সিদ্দিকি সাহেব মুসলমান-সহ অন্যান্য দলিত এবং সংখ্যালঘুদের নিয়ে একটি মঞ্চ গড়তে চাইছেন। সেই সময় তাঁর জানা দরকার, পশ্চিমবঙ্গের মুসলমানরা আগে এমন কোনও মঞ্চ তৈরি করেননি। তাঁরা মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গেই মিলেমিশে ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানে গোড়ায় মুসলিম লিগ থাকলেও ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বা ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে ফজলুল হক-সতীন সেনের যুক্তফ্রন্টের কাছে তাঁদের অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়ে। এই বাংলায় হাসানুজ্জামানের মুসলিম লিগ একটি আসনে জিতলেও কোনও দাগ কাটতে পারেনি। তার বাইরে সৈয়দ নওসের আলি, সৈয়দ বদরুদ্দজাও সেক্যুলার রাজনীতি করে গেছেন।

এই অতীত মনে রাখার জন্যই আব্বাস সিদ্দিকিকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।

Developed by DXDasia