বাঁশের মিনিয়েচার মডেল বানিয়ে বাংলা তথা দেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণ করছেন গণেশ ভট্টাচার্য্য

একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে তাঁর শিল্পকর্ম

য়া সংসদভবন থেকে কেদারনাথ মন্দির, ভারতের WAM 4 & WDP 4 D লকোমোটিভ বৈদ্যুতিক এবং ডিজেল ইঞ্জিন দিল্লির লালকেল্লা থেকে কলকাতার সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল, হাইকোর্ট, ডবল-ডেকার বাস, ঐতিহ্যবাহী ট্রাম, ১৯২১ সালে চন্দননগরে নির্মিত ঐতিহাসিক দুর্গাচরণ রক্ষিত ঘাট অথবা চুঁচুড়ার বিখ্যাত ঘড়ির মোড়ের ‘ঘড়ি’..কী নেই তালিকায়! দেখতে অবিকল এক কিন্তু আকারে ছোটো। ইংরেজিতে একে বলে ‘মিনিয়েচার মডেল’। বাঁশের সাহায্যে দীর্ঘ উনিশ বছর যাবৎ এই মিনিয়েচার মডেল বানানোর কাজ করে চলেছেন চন্দননগরের গণেশ ভট্টাচার্য্য। তাঁর কথায়, “একটা বাঁশ দিয়ে যে এত কিছু হতে পারে, সেটা নিজেও কোনওদিন ভেবে উঠতে পারিনি। এখনও যখন কাজগুলো করি, তখন ভাবি সত্যিই আমি বানাচ্ছি এগুলো! আমার বাড়ির লোকেরাও অবাক হয়ে যায়। যাঁরা কাজ দেখতে আসে, তাঁরাও অবাক হয়ে যায়। জিজ্ঞাসা করে, বাঁশ দিয়ে এত কিছু হয়?”

বাঁশ দিয়ে তৈরি ভারতের WAM4 ইঞ্জিন বর্তমান ভিলাই

নয়া সংসদভবন থেকে কেদারনাথ মন্দির, দিল্লির লালকেল্লা থেকে কলকাতার সেন্ট পলস ক্যাথিড্রাল, হাইকোর্ট, ডবল-ডেকার বাস, ঐতিহ্যবাহী ট্রাম, নানান বিখ্যাত ট্রেন…কী নেই তালিকায়! দেখতে অবিকল এক!

অদ্যাবধি প্রায় দু’হাজারের বেশি মিনিয়েচার মডেল নিজে হাতে গড়েছেন বছর চল্লিশের এই শিল্পী। ব্যবহার করেন আসামের বাঁশ। তা দিয়েই ফুটিয়ে তোলেন নানান বিখ্যাত স্থাপত্যের ক্ষুদ্র সংস্করণ, নানা ঐতিহ্যবাহী যানবাহনের মডেল। খেলার প্রতি অগাধ আগ্রহ ছিল। ক্রিকেট, ফুটবল খেলতেন ছোটোবেলায়। পায়ে সংক্রমণের জেরে ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নপূরণ হয়নি। প্রাথমিক স্কুলে কর্মশিক্ষার ক্লাসে শেখা ‘হাতের কাজ’ হয়ে ওঠে তাঁর নেশা। আজ যা হয়ে উঠেছে জীবিকা। আত্মবিশ্বাসী গণেশ বলছিলেন, “আমি ‘ব্যাকবেঞ্চার’ হয়েও উনিশ বছরের চেষ্টায় যা করেছি, তাতে ভারতবর্ষের প্রায় সবাই আমায় চেনে। যাঁরা আমার কাজ দেখেছেন, সবাই আমার কাজকে গ্রহণ করেছেন।”

চন্দননগর-চুঁচুঁড়ার ঐতিহাসিক নিদর্শন

গণেশবাবু আলাদা পথের পথিক হতে চেয়েছিলেন। সেই ভাবনা থেকেই ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্রের মিনিয়েচার মডেল বানানো শুরু। হাতের সূক্ষতায় গড়ে তোলেন কলকাতার শতাব্দীপ্রাচীন টানা রিকশা, দেশের বিখ্যাত পুরাকীর্তি, স্থাপত্য। গণেশ বলছিলেন, “মেলায় গিয়ে দেখবেন ফুলদানি, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি এসব বানানো হচ্ছে। সব সময় এগুলোই দেখতে পাবেন। কিন্তু যেটা দেখতে পাবেন না, সেটা হল আমি যে ধরনের কাজগুলো করি। আমার ভাবনা হল সর্বসত্তা অনুকরণ। যাহা দেখিব তাহাই করিব। আমি নিজে পথ বানিয়ে হাঁটতে ভালোবাসি। আমি নিজেই নিজের প্রতিযোগী।” 

মক্কা মসজিদ,  হায়দ্রাবাদ

ক্রিকেট, ফুটবল খেলতেন ছোটোবেলায়। পায়ে সংক্রমণের জেরে ফুটবলার হয়ে ওঠার স্বপ্নপূরণ হয়নি। প্রাথমিক স্কুলে কর্মশিক্ষার ক্লাসে শেখা ‘হাতের কাজ’ হয়ে ওঠে তাঁর নেশা।

আরও বললেন, “অতীতের অনেক কিছুই হারিয়ে যাচ্ছে। কলকাতার ডবল ডেকার বাস, ট্রাম এমন অনেক কিছুই পরবর্তী প্রজন্ম ছবিতে দেখতে পাবে। এগুলো সম্পর্কে পড়বে। কিন্তু হারানো জিনিস সম্পর্কে সেভাবে আগ্রহ জন্মাবে কি? ছবিতে দেখা আর চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করার মধ্যে অনেক ফারাক।” আসল জিনিসটির অনুকরণে তৈরি মিনিয়েচার মডেল দেখে, তরুণ ও আগামী প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে আগ্রহ জন্মাতে পারে বলে মনে করেন তিনি। জানালেন দেশের ঐতিহ্যকে তুলে ধরতে চান। একমাত্র শিল্পীরাই দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন বলে মত গণেশের। 

 

বাঁশের বিভিন্ন মডেলের দাম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করতে, গণেশ জানান; বিভিন্ন জিনিসের বিভিন্ন দাম। ত্রিশ টাকা থেকে ত্রিশ লক্ষ টাকার কাজও করে থাকেন। শুধু তাই নয়, নিজের কাজের প্রদর্শনীও করেন। বিভিন্ন স্কুল, কলেজ থেকে বাঁশের শিল্পকর্ম শেখানোর জন্য আমন্ত্রণ পান নিয়মিত। তাঁর অনেক কাজই দুর্গাপুজোর সময় কলকাতার বিভিন্ন পুজো মণ্ডপ অলংকৃত করে। তাঁর বানানো সংসদভবন হুগলি জেলায় হাতের কাজ বিভাগে প্রথম হয়েছিল বিগত বছর। বেসরকারি একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে তাঁর হাতে গড়া শিল্পকর্ম। পেয়েছেন, কোহিনূর মেডেল ও গোল্ড মেডেল। 

সেন্ট পল ক্যাথিডাল চার্চ, কলকাতা

এখন তাঁর ব্যস্ততা তুঙ্গে। এবার হরিদেবপুর আদৰ্শ সমিতির দুর্গাপুজোর মণ্ডপ সেজে উঠতে চলেছে তাঁর হাতের তৈরি শিল্পকর্মে। এ জন্য টাকি শহরের পুরোনো স্থাপত্য নিদর্শন যেমন টাকি রাজবাড়ি, জোড়া মন্দির, কূলেশ্বর কালীবাড়ি ইত্যাদি  বানাচ্ছেন তিনি, সবটাই বাঁশের। গত বছর আদৰ্শ সমিতির দুর্গাপুজোতেই, গণেশ দেশের পঞ্চাশটি স্থাপত্য কীর্তির মডেল বানিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। উল্লেখ্য, তাঁর তৈরি মডেলগুলো অন্যান্য মিনিয়েচার শিল্পকর্মের মতো একেবারে ছোটো  নয়। প্রায় তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতার মডেল বানান তিনি। আট ফুট উচ্চতার মডেলও বানিয়েছেন। ফলে শিল্পকর্মগুলোকে আসল স্থাপত্যের বা নিদর্শনের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলা যায়। যাবতীয় কাজ তিনি একা হাতেই করেন। পুজোর পর চন্দননগরের দুই প্রাচীন স্থাপত্যকে বাঁশের মডেলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলবেন গণেশ, যা পাড়ি দেবে সুদূর ফ্রান্সে। 

কলকাতার ঐতিহ্যবাহী ট্রাম, ১৯৯৭ সালের অনুকরনে

এদেশের শিল্পচর্চার নানা প্রতিবন্ধকতার কথা বলছিলেন গণেশ। খানিক অভিমানের সুরেই বলছিলেন, “ভারতবর্ষ শিল্পীদের জন্য অভিশপ্ত দেশ।” কথা বলে মনে হল এই হস্তশিল্পী কর্মে বিশ্বাস করেন। নিজের শিল্প দক্ষতার উপর তাঁর অসীম আত্মবিশ্বাস। সেকারণেই বোধহয় বাঁশের শিল্পকর্ম নির্মাণকে পেশা ও নেশা বানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছেন। কাজের মাধ্যমে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সংরক্ষণের ব্রত চালিয়ে যাবেন বলেই জানাচ্ছেন শিল্পী গণেশ ভট্টাচার্য্য।

Developed by DXDasia